সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রামীণ নারীর লোকায়ত জ্ঞানের চর্চা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত হোক

মানিকগঞ্জ থেকে রাশেদা আক্তার

‘গ্রামীণ নারীর লোকায়ত জ্ঞানের চর্চা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত হোক” শ্লোগানকে সামনে রেখে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনুষ্ঠিত হলো পিঠা উৎসব। আলোর পথিক নারী সংগঠনের আয়োজনে এবং বারসিক এর সহযোগিতায় সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চরমত্ত গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গনে পিঠা উৎসবের আয়োজন করে। পিঠা উৎসবে ৪২ জন নারী তাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন রকম ৫১ ধরণের পিঠা প্রদর্শন করেন। নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গ্রামীণ নারীর লোকায়ত জ্ঞানের চর্চা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

51298956_2182062928503853_1958630676114702336_n

পিঠা উৎসবে নারীরা যেসব পিঠা প্রদর্শন করেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পাটি শাপটা, চিতই পিঠা, চুড়ি পিঠা, কাঁঠাল পাতা পিঠা, তেল পিঠা, বিস্কুট পিঠা, ছিটরুটি পিঠা, ডিম পিঠা, সমুচা পিঠা, মোহন বাঁশি পিঠা, মাছের কাঁটা পিঠা, রুটি পিঠা, তিল পুলি, শামুক পিঠা, দুধ পুলি, গোল পিঠা, ফুল পিঠা, জানালা পিঠা, সেমাই পিঠা, লাভ পিঠা, সিরিঞ্জ পিঠা, মোরক সংশা, পাকন, মুঠা পিঠা, সাজ পিঠা, ভাপা পিঠা, গুলি পিঠা, চিরুনী পিঠা, সিম পিঠা, তারা পিঠা, মোরগ পাখি, পুতুল পিঠা, চুকুই পিঠা, কামরাঙ্গা পিঠা, বাদাম পিঠা, মুখশলা, ভাজা পুলি, কাচি পিঠা, দইলা পিঠা, চাটি পিঠা, দুধচিতই, সেমাই পিঠা, বড়া, নারিকেল পিঠা, তালের পিঠা, জামাই পিঠা, তিল পুলি, লবনাঙ্গ লতিকা, জবদানা, ভাপা পুলি, সিদ্ধ পুলি, নিমকী, পাতা পিঠা ইত্যাদি। ৪১ রকমের পিঠা প্রদশূন করে প্রথম স্থান অধিকার করেন কল্পনা বেগম, নুরুন্নাহার বেগম ২৭ রকম পিঠা প্রদর্শন করে ২য় এবং রাজেদা বেগম ২১ রকম পিঠা প্রদর্শন করে ৩য় স্থান অধিকার করেন।

মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি হানিফ মিয়ার সভাপতিত্বে পিঠা উৎসবেরআলোচনা সভার শুরুতেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ নিয়ে আলোচনা করেন বারসিক’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায়। সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন সরদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিপ্লব হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলফাজ আলী, বাসুদেবপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আরশেদ আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: হানিফ আলীসহ শিক্ষার্থী ও নারীসহ ১৫০ জন উপস্থিত ছিলেন।

51325189_552778801799010_1564608984810258432_n
প্রধান অতিথি তার বক্তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রামীণ পরিবেশে এমন একটি আয়োজন করার জন্য বারসিককে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার শত ব্যস্ততার মাঝেও পিঠা উৎসব হবে শুনে আমি না বলতে পারিনি। আমার মনে হয়েছে এমন প্রোগ্রামে যাওয়া উচিত। এগুলো আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য যা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আপনারা আপনাদের সন্তানদের এসব পিঠার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন। তাদের পিঠা বানাতে শিখাবেন তাহলে আমাদের এই সংস্কৃতি টিকে থাকবে।’

মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি হানিফ মিয়া, ‘এমন গ্রামে এই ধরণের আয়োজন দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেছি। আমি ভাবতেই পারিনি এতজন নারী এখানে পিঠা নিয়ে আসবে। এমন একটি আয়োজন করার জন্য বারসিককে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সাথে আগামী বছর পৌষ সংক্রান্তিতে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও বারসিক যৌথভাবে দিনব্যাপি এই পিঠা উৎসব ও বিভিন্ন খেলাধূলার আয়োজন করার আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’

51377804_345902739593276_4388435804519661568_n
পিঠা উৎসবে প্রথম স্থান অধিকারকারী কল্পনা বেগম বলেন, ‘আমি আমার মা, শ্বাশুরীকে দেখেছি পিঠা বানাতে। তাদের কাছেই শিখেছি কিভাবে পিঠা বানাতে হয়। আগের দিনে মানুষ যত ধরণের পিঠা খাইতো এখন মানুষ পিঠা বানানোও কষ্ট মনে করে বানাতে চায়না। আমাদের গ্রামে এই ধরণের অনুষ্ঠান এটাই প্রথম। আমরা অনেক আনন্দ পেয়েছি।’

পিঠা উৎসবে আগত শিক্ষার্থী মো. শরীফ হোসেন বলেন, ‘এখনকার বাচ্চারা ফাস্টফুড খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এই ধরণের পিঠা বাড়িতে তৈরি করে বাচ্চাদের দিলে বাচ্চারা খেয়ে আনন্দিত হবে আবার ভালো খাবারও খেতে পারবে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরণের পিঠার সাথে আজ পরিচিত হলো। আমার এখানে এসে এত ধরণের পিঠা দেখে খুব ভালো লাগছে।’

51689169_399149264173765_8111253211186200576_n
গ্রামীণ নারীরা তাদের জন্ম লগ্ন থেকেই লোকায়ত জ্ঞান চর্চার ধারক ও বাহক। গ্রামীণ নারীর হাতে তৈরি বিভিন্ন রকম পিঠা-পুলি যুগ যুগ ধরে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও ভূমিকা রাখছে। নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গ্রামীণ নারীর লোকায়ত জ্ঞানের চর্চা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: