সাম্প্রতিক পোস্ট

বরেন্দ্র অঞ্চলে শুরু হলো ‘প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমী আগামীর বিজ্ঞানী’ শীর্ষক স্কুল প্রচারাভিযান

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে শহিদুল ইসলাম

ভূমিকা
উন্নয়নে বিজ্ঞান, প্রকৃতি ও পরিবেশ সমসাময়িক সময়ের অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি এর সাথে যুক্ত হয়েছে সংস্কৃতি। কারণ বিজ্ঞানের আর্শীবাদে যেমন আমাদের সভ্যতা উন্নত হয়েছে তেমনি বিজ্ঞানের অবদানে বা বিজ্ঞান সৃষ্ট উপকরণের সঠিক ব্যবহার বা ভূল প্রয়োগে আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ ধ্বংসসহ নিজস্ব সংস্কৃতিও বিলীন হচ্ছে। তাই উন্নয়নে বিজ্ঞান যেমন বিশেষ অবদান রাখছে তেমনি পরিবেশ বিধ্বংসী বিজ্ঞান এই উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এর ফলে আগামীতে স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নে মধ্যে দিয়ে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন উদ্যোগের ফলে কিছু কিছু সেক্টর লাভবান হলেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। উদাহরণ হিসাবে ষাটের দশকে কাপ্তাই হ্রদে পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে বাঁধ নির্মাণ করা। এর ফলে বেশ কিছু পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভবপর হয়; কিন্তু পরিণামে পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক যে ক্ষতি শিকার করতে হয় তা অপরিসীম। আবার বিভিন্ন রাসায়নিক ও কীটনাশকের যে ব্যবহার তার ফলেও প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস বা নষ্ট হচ্ছে। তাই চলমান সময়ে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন সুদৃঢ় করতে বিজ্ঞানের সতর্কতামূলক চর্চা ও বিজ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশবান্ধব দিকগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন বলতে ঐ ধরণের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও নিশ্চিত হয় আবার প্রকৃতি-পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমে কোন বাজে প্রভাব না পড়ে। একই সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক দিকগুলোও সুদৃঢ়করণ হবে।

IMG_20190209_142321

নবীন বা তরুণরা জীবনের শুরুতেই সমাজে, দেশে বা পৃথিবীতে যা দেখে তাই শিখে। সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। বিজ্ঞান যেমন আর্শীবাদ হয়ে আসছে তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিশাপ রূপেও দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামের ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চা বা বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিকের প্রভাবগুলো সম্পর্কেও ধারণা কম। অন্যদিকে বিজ্ঞান ভীতি ও অনেক সময় তাদের মধ্যে কাজ করে। তাই বিজ্ঞান সৃষ্ট বিভিন্ন দিকগুলো কিভাবে প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করছে সে দিকগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা দরকার। যাতে তারা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের ভালো মন্দ দিকগুলো বিবেচনা করে কর্মজীবনসহ নিজ জীবনে উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সাথে পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি নিতে পারে।

প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমী আগামীর বিজ্ঞানী শীর্ষক স্কুল প্রচারাভিযানের শুভ উদ্বোধন
গতকাল রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমী আগামীর বিজ্ঞানী’ শীর্ষক স্কুল প্রচারাভিযানের শুভ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রাজশাহীর শহর তরুণ সংগঠন বিআইইএস তাদের বিশেষজ্ঞ দল স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন (এ্যাক্সপেরিমেন্ট) পরীক্ষণগুলো তুলে ধরেন। মোট ছয়টি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষণের মাধ্যমে তারা দেখানের চেষ্টা করেন কিভাবে আমাদের জলজ উদ্ভিদ বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশকের প্রভাবে ধ্বংস হযে যাচ্ছে, আবার কিভাবে অধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিও ফলে জলবাযু পরিবর্তনকে প্রভাবিত করছে।

51575804_2122590274469337_213912280696356864_n

একই সাথে তারা প্রাকৃতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপকার এবং বিভিন্ন দিকগুলো জানানোর চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে তরুণ সংগঠন বিআইইএস এর সভাপতি মো. জয়নুল আবেদিন বলেন, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একদল অভিজ্ঞ তরুণদের নিয়ে এই দলটি গঠন করেছি, আমাদের সাথে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাদের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মহোদয় আমাদের সহায়তা করছেন।” তিনি আরো বলেন, ‘বারসিকের প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা নবীণ শিক্ষার্থীদের জানতে চাচ্ছি কিভাবে আমরা আমাদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য নিজেরাই ধ্বংস করছি। এতে করে তাদের মধ্যে প্রকৃতি, পরিবেশ সুরক্ষায় দিকগুলো কাজ করবে। একই সাথে তাদের মধ্যে নেতৃত্বের দিকগুলোও উন্নত হবে। উক্ত প্রচারভিযানের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানের স্কুলটির ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।’

প্রচারাভিযান বা ক্যাম্পেইন এর লক্ষ্য
প্রকৃতি-পরিবেশ বিনষ্ট, জনস্বাস্থ্যহানিসহ সকল প্রাণের বিলোপ ও ক্ষতির কারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিশুদের হাতে-কলমে পরীক্ষামূলক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) দেখানোর মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমী প্রজন্ম সুষ্টিই মূল লক্ষ্য। যাতে ভবিষ্যতে এই প্রজন্ম বয়সের পরিণত পর্যায়ে বিজ্ঞানের প্রায়োগিক সকল কিছুতে পরিবেশবান্ধব বিষয়টি সচেতনতার সাথে নিতে শেখে।

প্রচারাভিযান বা ক্যাম্পেইন এর উদ্দেশ্য
১. হাতে-কলমে প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমী শিক্ষা/বিজ্ঞান ফলাফল দেখানো/প্রদানের ফলে শিক্ষার্থী নিজেরা প্রত্যক্ষভাবে জানবে কিভাবে প্রাণ-প্রকৃতি বিনষ্ট নষ্ট হচ্ছে।
২. শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ভীতি দূর হবে ফলে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশসহ প্রকৃতিবান্ধব বিজ্ঞান সৃষ্টিতে আগ্রহী হবে।

IMG_20190209_142235
৩. নেতৃত্বের বিকাশ, টিম ওয়ার্ক এবং সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য এবং চ্যালেঞ্জিং শিক্ষার্থী তৈরির মাধ্যমে আগামীর সবুজ বাংলাদেশ বির্নিমাণে অবদান রাখবে।
৪. এসডিজি গোল এর ৪,৭, ১১, ১৩, ১৪, ১৫ নং গোল এর বাস্তবায়নে শিক্ষণীয় পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতা প্রদান।
৫. এসডিজি গোলগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন ঘটছে, কেন ঘটছে এর ফলাফল কি, কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, সমাধানের উপায় কি ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হবে।
৬. শিক্ষা পদ্ধতিতে নতুন ধারার প্রবর্তন হবে।

প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণের নিয়ম
আগ্রহী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলে এই প্রচারাভিযানের আয়োজন করা হবে। মোট দুটি ক্যাটাগরিতে এই প্রচারভিযানের জন্যে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে রাখা হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অংশগ্রহণ। ক্যাটাগরি অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষতার দিকগুলো বিবেচনায় এ্যাক্সপেরিমেন্ট (পরীক্ষণ) গুলো উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। যাতে প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। স্কুল এবং কলেজভিত্তিক এই প্রচারভিযান প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আয়াজন করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি এবং আগ্রহের সম্মতিপত্র নিয়ে আবেদন করলে প্রচারাভিযানের আয়াজন করা হবে। এ বিষয়ে বারসিক রাজশাহী রিসোর্স সেন্টার এবং বিআইইএস এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

প্রচারভিযানের সম্ভাব্য ফলাফল
০১. নবীন শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের বিরূপ প্রভাবে পরিবেশ প্রতিবেশসহ প্রাণ-প্রকৃতির ধ্বংসের দিকগুলো জানবে।
০২. নিজেরা প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ সুরক্ষাসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণও বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
০৩. ভবিষ্যতে যখন বাস্তব জীবনে নেতৃত্ব দিবে এই অভিজ্ঞতা বা শিক্ষণীয় দিকগুলো ভূমিকা পালন করতে পারে।
০৪. শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ভিতি দুর হয়ে সত্যিকারে প্রাণ প্রকৃতিবান্ধব বিজ্ঞানের অনুভূতি সৃষ্টি হবে।

উপসংহার
এই দেশ, এই বিশ্ব যেমন বিজ্ঞানের অবদানেই এগিয়ে যাচ্ছে। তেমনি আবার বিজ্ঞানের বিরূপ প্রভাবগুলোও আমাদের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন তথা প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংসের জন্যে চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। তাই আগামীতে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠুক যাদের মাধ্যমে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার দিকগুলো মাথায় রেখেই উন্নত বিজ্ঞানের আবিষ্কার তৈরি হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: