Posted in

কেমন আছে আমাদের জলাভূমি?

কাজী সুফিয়া আখ্তার

গতকাল ২ ফেব্রুয়ারি, বিশ্বব্যাপী জলীয় পরিবেশ রক্ষার সম্মিলিত প্রয়াস রামসার সম্মেলনের ৫০ বছর পূর্ণ হল। ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জলাভূমি রক্ষা ও স্থায়িত্বশীল ব্যবহারের লক্ষ্যে ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস্’ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের সুন্দরবন ১৯৯২ সালে রামসার অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০০০ সালে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই হাওর দুই শতাধিক বিরল প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য এবং বিপন্ন দেড় শত প্রজাতির মাছের সমৃদ্ধ ভান্ডার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিরল প্রজাতির পাখি এবং বিপন্ন মাছ রক্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণ ও ব্যবস্হাপনায় স্থানীয় জনগণের ও বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু কিছু সুফলও পাওয়া গেছে। কিন্তু মানুষ কর্তৃক নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে গত এক দশকে হাওর অঞ্চলের ১৫০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৬২ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এইসব মাছের মধ্যে মহাশোল, পাঙাস, সরপুঁটি, নান্দিনা, রিঠা, বাগাড়, বামোশ, পিপলা, তিলা শোল, ঘাউড়া, বাচা, বাটা, শিশর, কুমিরেরখিল, গুইজ্জা, একথুটি, শিলং, গজার, ঢ্যালা, মধু ও কানি পাবদা, গুজি আইড়,পাবদা, কালাবাটা, কালিয়া, ঘইন্না, নেফতানি, শাল বাইম, রানি, ঘোড়া মুইখ্যা, কাশ খাউড়া, রায়েক, চাকা, চিতল, ছেপ চেলা, বিষ তারা প্রধান।

মনে পড়ে, একবার মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে রেখা সাহা আমাদেরকে মহাশোল মাছ রান্না করে খাইয়েছিলেন। এই মাছটি অনেক জেলার মানুষ খায় নাই কখনো। কারণ এই মাছটি নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলের মাছ। আমি খুব উপভোগ করেছিলাম।

মূল কথাতে ফিরে আসি। হাওর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পেশা মূলতঃ কৃষি এবং মাছ ধরা। একবার বারসিক’র অফিসিয়াল কাজে নাগঢড়া গ্রামের কৃষক ও জেলেদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন জানতে পারলাম বংশ পরম্পরায় জেলেরা এখন বড়ো কষ্টে আছে। কারণ হাওর, বাওড় ইজারা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ সময় এই ইজারা সরকারি দলের ব্যবসায়ীরা পেয়ে থাকে। একমাত্র টাঙ্গুয়ার হাওর ছাড়া অন্যসব জলাশয়ে ইজারা দেওয়ার নিয়ম বিদ্যমান। জেলেদের হাতে টাকা নেই বিধায় তারা ইজারা পায় না বললেই চলে। অন্যদিকে, খোলা পানিতে অর্থাৎ জোয়ারের সময় এবং বর্ষাকালে যখন বিভিন্ন জায়গা পানিতে ডুবে যায়, তখনও জেলেদের খোলাপানিতে মাছ ধরতে বাধা দেয়া হয়। ‘ জাল যার জলা তার’ শ্লোগান এখানে চলে না। ফলে ব্যবসার কারণে সব মাছই ধরা হয়ে যায়। অতীতে একটি প্রথা ছিল, যা পাইল প্রথা নামে পরিচিত ছিল। এটি হল তিন বছরে একবার জলাভূমিতে মাছ ধরা। এতে মাছের প্রজনন বাড়তো। মাছ বড়ো হওয়ার সুযোগ পেতো। প্রশ্ন হল জেলেরা কি ডিম পাড়া মাছ জালে ধরা পড়লে ছেড়ে দেয়? এর উত্তর হল- সবসময় হয়তো ছেড়ে দেয় না। আবার সকল জেলে ছেড়েও দেয় না। কিন্তু বংশ পরম্পরায় যারা এই পেশায় আছেন এবং থাকার আগ্রহ আছে, তারা কিন্তু বলেছেন- আমরা ডিম ছাড়বে এমন মাছ জালে ধরা পড়লে জলে ছেড়ে দেই গো দিদি। আমাদের জন্যই ছেড়ে দেই। নাইলে মাছ পাব কনে?

প্রতিবছর শীতে হাজারে হাজারে পরিযায়ী পাখি আসে আমাদের দেশের হাওর অঞ্চলের জলাশয়গুলোতে। অতীতে এই অতিথি পাখির সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এখন অনেক কমে গেছে পরিযায়ী পাখির আসা। তার কারণ পাখিদের মৃত্যু। গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি বালি হাঁস, ভূতি হাঁস মারা পড়েছে হাকালুকি হাওরে। এই হাওরটিকে তৃতীয় রামসার অঞ্চল হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই হাওরটিতে ১৫০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ, ৫২৬ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে।

বাংলাদেশে মোট ৩৭৩টি জলাভূমির আয়তন ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর। অধিকাংশ জলাভূমি সুরক্ষিত নয়। হাওর অঞ্চলে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ দশমিক ৭২০ লাখ হেক্টর। প্রতিবছর ৫০ লাখ টনের বেশি বোরো ধান এখানেই উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ ক অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার স্বার্থে সরকারিভাবে জলাভূমি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ চায় সরকার হাওর অঞ্চলের কৃষক ও জেলেদের স্বার্থ ঠিক রেখে সকল উন্নয়নমূখী কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কৌশলগুলোর উপর জোর দেবে। পরিযায়ী পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সচেষ্ট হবে। চাষের মওসুমে কৃষকদের ও জেলেদের মূলধন ঘাটতি মেটাতে সহজ শর্তে ঋণের প্রদানের ব্যবস্থা করবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.