সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় এগিয়ে আসি

প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় এগিয়ে আসি

মানিকগঞ্জ থেকে বিমল চন্দ্র রায়

গ্রামাঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস ও প্রাণ সম্পদের একটি নিরাপদস্থল হলো বট, পাকুড় ও অশ্বত্থ। এই বহুবর্ষজীবী বৃক্ষরাজিসমূহ বাংলাভাষা অঞ্চলের আদিমতম বৃক্ষ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, মায়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া চীনসহ এশিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে রাস্তার ধারে, বাজারে, হাটে, খোলা স্থানে দেখা যায় এসব বৃক্ষ। তাছাড়া বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই বৃক্ষসমূহ দেখা যায়। বটবৃক্ষের পাতা গজানোর পাশাপাশি ডাল হতে ঝুরি নেমে আসে। এই ঝুরিসমূহ মাটিতে গেঁথে গিয়ে কান্ডে পরিণত হয়। ফলে অনেক বড় বটবৃক্ষের মূলকান্ড কোনটি বুঝতে পারা যায় না।


পাকুড় ও অশ্বত্থ বৃক্ষ আকারে বটের মতো তবে পাকুড় বৃক্ষের ঝুরি পড়ে তবে বটের মতো অত নয় এবং অশ্বত্থ বৃক্ষের ঝুরি কদাচিত পড়ে। বটের পাতা পুরু, পাকুড়, অশ্বত্থ পাতা পাতলা। প্রায় একই ধরনের আর ফল পাকার পর ভিন্ন ভিন্ন রঙের হয়। অশ্বত্থ ও পাকুড় বৃক্ষকে তাই আলাদাভাবে গ্রামীণ জনপদে বিবেচিত হয় না। অশ্বত্থ ও পাকুড় বটের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে। শ্রীলংকায় ২২৫০ বছরের বেশি বয়সী অশ্বত্থ বৃক্ষের কথা বিভিন্ন মাধ্যমে বলা আছে। গ্রামীণ জনপদে প্রাচীনতম বৃক্ষ বট, পাকুড় ও অশ্বত্থ নিয়ে নানান জনশ্রুতি প্রচলিত। জনশ্রুতি পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রথা প্রচলিত। ভগবান গৌতম বুদ্ধ যে অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে বসে ধ্যান করে বোধি লাভ করেছিলেন সেই অশ্বত্থ বৃক্ষ ও তার বংশধরবৃক্ষকে বোধিবৃক্ষ বলা হয়। হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীগণ অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে বসে ধ্যান করে সিদ্ধি লাভ করেন। অনেক মন্দির গড়ে উঠেছে অশ্বত্থ, পাকুড় ও বটবৃক্ষ তলদেশে। জৈন ধর্ম বিশ্বাসীগণ অশ্বত্থসহ অন্যান্য বৃক্ষের প্রতি সমান সন্মান প্রদর্শণ করে। খাজা বাবার ওরস বট, পাকুড় গাছকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। গ্রামীণ মেলা ও নিসকান্দা পুজা বট, পাকুড় বা অশ্বত্থ বৃক্ষকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। অশ্বত্থ, বট, পাকুড় বৃক্ষ বৃক্ষের রাজা বা দেবতা হিসেবে মান্য করা হয়। বাংলাদেশের হাট, বাজারসমুহে বট পাকুড় বা অশ্বত্থ বৃক্ষ একত্রে বা আলাদা আলাদা বেড়ে উঠে শীতল ছায়া দিয়ে খুচরা বিক্রেতা ও হাটুরেদের ক্লান্তি ও ক্লেশ দূর করে। চৈত্রের গরমে শীতল ছায়ার তলে মানুষসহ নানান প্রাণের আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রাকৃতিক অক্সিজেন খনি বিশেষ ভুমিকা রাখে। বট পাকুড়, অশ্বত্থ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্বাসের আলোকে বট বৃক্ষকে পুরুষ (বর) ও পাকুড় বা অশ্বত্থ বৃক্ষকে মহিলা(কনে) বিবেচনা করে সামাজিক অনুষ্ঠান করে আড়ম্বরের সহিত বিয়ে দেন।


এ বিষয়ে ঘিওর উপজেলার কেল্লাই গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল কাশেম (৭০) বলেন, ‘আমি প্রথম একটি বট গাছ লাগাই যাতে বাজারে ছায়া ও দূর থেকে বাজার চিহ্নিত হয় সেই উদ্দেশে তবে বছর খানেক পর বাজারের দোকানদার হালিম মোল্লা পাকুড় এনে বট গাছের কাছাকাছি বোনেন এবং দুজনে মিলে বট পাকুড় গাছের বিয়ে দিয়ে যতœ করে বাঁচিয়ে বড় করে তোলেন।’ এ রকম ঘটনা হাট বাজারে, রাস্তার ধারে, মন্দিরে, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বা খোলা স্থানে বট পাকুড় বা অশ্বত্থ বৃক্ষের ইতিহাসের আছে। বট বা পাকুড়, অশ্বত্থ বৃক্ষে ভুত পেতনি বা ডাইনি থাকে এই ধরনের কথা আমরা ঠাকুরমা বা দিদিমাদের, ছোটদের কার্টুনের বই বা সিডিতে গল্প আকারে শুনে থাকি। বিশ্বাসের কারণে এই বৃক্ষরাজির কম কাটা হয় এবং পবিত্রতার সাথে সংরক্ষিত হয়। জ্বালানি বা কাঠ কোনভাবেই তেমন ব্যবহার নেই।


আমার লেখার বিষয় এই বৃক্ষের বৈচিত্র্য বা বিশ্বাসের গুনাগুন নিয়ে নয়, এই ধরনের বৃক্ষের অনেক বেশি জায়গা লাগে বা অন্য গাছকে গিলে খায় বা দালান কোঠার কার্ণিশে বা ফাটলে অংকুরিত হয় আশ্রয়কে গ্রাস করে, তলদেশে কোন গাছ জন্মে না, আগ্রাসী এ সব বিষয়ে নয়। কারণ এই বৃক্ষসমূহের ব্যাপক কার্বন গ্রহণ করে প্রচুর অক্সিজেন দিয়ে প্রাণিকূলকে সতেজ রাখে। ছায়া দিয়ে, বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে এগিয়ে নেয়। লাল পিপড়া, কালো পিপড়া, ডায়া, বাদুর শকুন, কানা কুহু, কাক, শালিকসহ নানান প্রজাতির প্রাণির নিরাপদ আবাস ও খাদ্যের যোগানদাতা এই গাছগুলো। এই সকল পাখি পাকা ফল খেয়ে বিষ্ঠা হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দিয়ে থাকে। সেই বিষ্ঠায় বীজ থাকে। পরে তা থেকে গাছ অংকুরিত হয়। বট পাকুড় বা অশ্বত্থ বৃক্ষের এই নির্মল পরিবেশবন্ধু হিসেবে যে উপকার করে আসছে তার অবদানকে তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আবার যারা নানান বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বিভিন্ন স্থানে এই গাছ লাগিয়ে যতœ করে বড় করে তাদের অবদানসমূহকে স্মরণ করা হয়। কারণ সেই গাছগুলোই পরবর্তীতে অক্সিজেনের খনিতে পরিণত হয়।

বারসিক মানিকগঞ্জ টিম চেষ্টা করছে অন্যান্য বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বট, পাকুড় বা অশ্বত্থ রোপণের। অনেক স্থানে টিকে আছে আবার অনেক স্থানের রোপিত বৃক্ষ নেই। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে গাছটি স্থানীয় কোন ব্যক্তির উদ্যোগে রোপিত হয় তার যতœ অনেক বেশি এবং তা টিকে থাকে। মানিকগঞ্জ শহরস্থ বিজয় মেলার মাঠসংলগ্ন রাস্তার ধারে অশ্বত্থ বৃক্ষ ছিল রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কারণে গাছটি কাটা হয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় কয়েকমাস পর রাস্তা প্রশস্তকরণ অংশের পাশে কোন একজন বটপ্রেমিক নাগরিক দুইটি গাছ লাগিয়েছেন। অনেক চা বিক্রেতা তার দোকান সংলগ্ন খাল বা রাস্তার ধারে এই ধরনের গাছ লাগিয়ে যতœ করে বড় করেন। এ রকম আরো উদাহরণ আছে। ধন্যবাদ এই ধরনের বৃক্ষপ্রেমিকদের। তাদের কারণেই যেখানে মোট ভূমি ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা সেখানে মাত্র ৯/১০ ভাগ বৃক্ষরাজি থাকার পরও অক্সিজেনের সংকট আমরা অনুভব করি না। বট, পাকুড় বা অশ্বত্থবৃক্ষের মিথসমূহ টিকে থাক, আমরা নিরাপদ নির্মল বায়ু গ্রহণ করি, অসংখ্য প্রাণের খাদ্য নিরাপত্তা ও আবাসস্থল সংরক্ষিত হউক।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: