Posted in

পাহাড়: আদিবাসীদের অচাষকৃত শাকসবজির উৎস

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে গুঞ্জন রেমা

কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ভারত সীমানা ঘেঁষা গ্রাম কালাপানি। এই গ্রামে বাস করেন গারো আদিবাসী জনগোষ্ঠী। গারো আদিবাসীদের জীবনাচার, ভাষা, সংষ্কৃতি, ধর্ম যেমন অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে আলাদা ঠিক তেমনি খাদ্যাভাসেও ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়। এই আদিবসাীরা বেশিরভাগই কুড়িয়ে পাওয়া শাকসব্জির উপর নির্ভরশীল। কুড়িয়ে পাওয়া শাকসব্জি যে কত প্রকার তা একমাত্র জানা যায় তাদের সাথে কথা বলে। এই গ্রামের গারো আদিবাসীদের অচাষকৃত শাকসব্জি বৈচিত্র্যতা সম্পর্কে জানার জন্য একটি অচাষকৃত শাকসব্জির প্রর্দশনী অনুষ্ঠান করা হয় কালাপানি গ্রামে। প্রদর্শনীতে যেসব অচাষকৃত শাকসব্জিগুলো প্রদর্শিত হয়েছে সেটি খুবই দুর্লভ ও বিরলপ্রজাতির। প্রদর্শিত শাকসব্জিগুলোর নামও বেশিরভাগই গারো ভাষায়! কয়েকটি ছাড়া বাদবাকি শাকসব্জির বাংলা নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যেমন, চংগি, মাৎচক মেন্ডা, পেন্টা পাতা, বাগওয়া, বিসরণ, গ্যারাডেক, দাওখুমাই, পার্লিংমা শাক, অওয়াংগা, তাকিতুফা পাল, দখুমী, সিরিংখি, স্থেং, গংমিনথ্রি, মিবিচ্রি, মিগং, কেরিনাক, ডুমবান্দা, দিগ্গি আদা, দজাগুপ্পি, গাগাকজাফা, রংবাং, ওয়াকফানথ্রা, প্রভৃতি। এইসব শাকসব্জি তারা সংগ্রহ করেছেন তাদের গ্রামের পাশের পাহাড় থেকে। এইসব পাহাড়গুলোই তাদের অচাষকৃত শাকসব্জির খাদ্য ভান্ডার।

kol-1

অচাষকৃত শাকসব্জির প্রদর্শনীতে শাকসব্জি ছাড়াও প্রদর্শীত হয়েছে ১৮ জাতের বনজ ঔষধি। একেকটা গাছের একেকটা গুণের কথা জানান ওই এলাকার বাসিন্দা কণিকা দ্রং। এই ১৮ জাতের বনজ ঔষধির সবগুলোর নাম কনিকা দ্রং বলতে না পারলেও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে ভালো জানেন বলে জানান। তিনি কোন ঔষধি গাছের কি গুণাবলি আছে তা সবার মাঝে তুলে ধরেন। পাশাপাশি সংরক্ষণের কথাও বলেন। তিনি এও জানান যে, এখন আর আগের মত এই সব ঔষধি গাছগুলো পাহাড়ে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগে ঔষধ বানাতে গেলে তেমন খোঁজাখুঁজি করতে হতো না কিন্তু এখন অনেক খুঁজতে হয় বলে তিনি জানান। তাঁর ভাষ্যমতে, কিছু কিছু গাছগাছালি আছে যেগুলো আর খুঁজেও পাওয়া যায় না। হারিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি পাহাড়ে বিভিন্ন দেশি বিদেশী গাছ গাছালির বাগান করাকে দায়ি করেন।

kol

শাকসব্জিগুলির নাম ও খাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে ভালো জানেন জরিনা রিছিল ও কোহিনূর নকরেক। এই দু’জন আদিবাসী নারী একে একে সবগুলো সব্জির নাম, স্বাদ, রান্না পদ্ধতি ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরেন। এই ৫০টি জাতের শাকসব্জির মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি শাকসব্জি। যা সমতলে পাওয়া যায় না। অচাষকৃত বা কুড়িয়ে পাওয়া শাকসব্জির এক বিশাল ভান্ডার থাকার জন্যই এখানকার আদিবাসীরা নিজেরা তেমন সব্জি চাষ করেন না এমনটিও শোনা গেছে। এই গ্রামের অনেকেই এই অচাষকৃত সব্জির উপর নির্ভরশীল। অচাষকৃত সব্জির গুণের কথা বলতে গিয়ে জরিনা রিছিল বলেন, “আমরা বাজার থেকে যেসব সব্জি কিনে খায় সেগুলো সার বিষ দিয়ে ফলানো হয়। কিন্ত আমরা যে শাকসব্জিগুলো পাহাড় থেকে কুড়িয়ে খায় সেখানে কেউ কোনদিন কোন প্রকার সার, বিষ দেয়নি। যার কারণে অচাষকৃত সব্জির যেটুকু ভিটামিন থাকার কথা তাই আমরা পাচ্ছি।”

kol-2

অচাষকৃত শাকসব্জির যেমন সুবিধা বা ভালো দিক আছে তেমনি আবার অসুবিধাও আছে। কারণ এগুলো কোন নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না। এগুলো সংগ্রহ করতে হয় বিভিন্ন স্থান থেকে। তারপর সব সময় পাহাড়ে যাওয়াও সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখন পাহাড়ে বিভিন্ন প্রকার কাঠের ও ফলের বাগান করা হচ্ছে। যার জন্যই এগুলোকে অপ্রয়োজনীয় আগাছা ভেবে কেটে ফেলা হচ্ছে। আবার অনেকে এই অচাষকৃত সবজির গুরুত্ব বা ব্যবহার না জানায় এগুলোর সংরক্ষণে আগ্রহী হয় না। পাহাড়ে এসব অচাষকৃত শাকসব্জির স্বল্পতার কারণে এখন অনেক গারো আদিবাসী সবজির জন্য বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার অনেকে নিজে শাকসব্জি চাষ করার চেষ্টা করছেন। এছাড়াও এই সব কুড়িয়ে পাওয়া শাকসব্জি ও বনজ ঔষধি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মদের কোন ধারণা নেই বিধায় এগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজন মনে করছেন না।

পাহাড় কেটে বসতভিটা তৈরি, বিভিন্ন ফল ও কাঠের বৃক্ষ রোপণ, সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অসচেতন এমন বহুবিধ কারণে এই অচাষকৃত সবজিগুলো কালাপানিসহ অন্যান্য গ্রামেও দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। অচাষকৃত শাকসব্জি হলো নিরাপদ খাদ্যভান্ডার অথচ এগুলো ধ্বংস করে দিনদিন মানুষ বাজারনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। বাজারের যে সব্জি রাসায়নিকের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় সেগুলোর প্রতি আমরা আকৃষ্ট হচ্ছি। তবে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমাদের জৈব পদ্ধতিতে শাকসব্জি উৎপাদন যেমন করতে হবে তেমনিভাবে অচাষকৃত এসব শাকসব্জিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.