সাম্প্রতিক পোস্ট

উপকূলীয় অঞ্চলের মিঠা পানির সংকট (পর্ব-১)

ঢাকা থেকে বাহাউদ্দীন বাহার
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের অর্ন্তগত শ্যামনগর উপজেলার পানির প্রাকৃতিক উৎস এবং তার স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ২ ধরনের পানির সন্ধান পাওয়া যায়। যথা-ক) লবণ পানি এবং খ) মিঠা পানি। দুই ধরনের পানিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যাপক ও বিস্তৃত স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা। তবে মিঠা পানি ব্যবস্থাপনা কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে লবণ পানি ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে। এই দুই ধরনের পানির ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে পানির উৎসও ভিন্ন হয়। মিঠা পানির উৎস থেকে এলাকার অধিবাসী মিঠা পানি সংগ্রহ করে আর লবণ পানির উৎস থেকে লবণ পানির চিংড়ি মাছ চাষ  করে।

পানির প্রকৃতিক উৎস বলতে সাধারণত বৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ উৎসকে বোঝায়। বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন বিভিন্ন উৎসে যেমন- নদী, খাল-বিল, পুকুর-দীঘিতে ধরে রেখে তাদের চাহিদা মেটায় (পরিবেশ পরিচিতি বিজ্ঞান-পঞ্চম শ্রেণী পাঠ্যপুস্তক, অধ্যায়-৯, পৃষ্ঠা-৬৮)। মানব সভ্যতার বিকাশ বহুলাংশ পানির উৎস্য সমূহের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল (আহমেদ, শা (২০০৪), সভ্যতার ইতিহাস)। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার জনবসতি ক্ষেত্রে পানির সমস্যার অতীত ইতিহাসের গভীরতা সম্পর্কে সঠিক আলোকপাত করতে পারে না এলাকার প্রবীণ অধিবাসীরাও। শ্যামনগর উপজেলা থেকে সংগৃহীত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, এলাকার আর্দ্র আবহাওয়া, বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কিংবা বৃষ্টিপাতের সময়কাল উভয়ই স্বল্প হওয়া এবং প্রাকৃতিক নদী ও জলাভূমির আধিক্যের কারণে পানির সমস্যার সাথে স্থানীয় অধিবাসীদের সহাবস্থান সূদূর অতীত থেকে। তাই কৃত্রিমভাবে পানির উৎস তৈরি এবং ব্যবস্থাপনার জ্ঞান গড়ে উঠেছে। এখানে কৃত্রিমভাবে বলতে বোঝানো হয়েছে যে, স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের শ্রমে যেসব পানির উৎস তৈরি করেছে। স্বাভাবিকভাবে এলাকায় কৃত্রিমভাবে খননকৃত দীঘি ও পুকুরের আধিক্যের দেখা মেলে। তবে একই সমান্তরালে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসকে কাজে লাগানো হয়েছে। খাবার পানির জন্য আলাদা ভাবে গড়ে উঠেছিল কুয়া বা পাত কুয়া। এসমস্ত কুয়া থেকে স্থানীয় অধিবাসীরা সারা বছরের খারার পানির চাহিদা মেটাতো। এলাকার প্রবীণ অধিবাসীরা তাদের স্মৃতি হাতড়ে বলেন যে, তারা পুকুরের পানি সেচ, গোসলসহ খবার পানি হিসেবে দৈনন্দিন নানাকাজে ব্যবহার করে এসেছেন। খাবার পানি হিসেবে স্মৃতির শেষসীমা থেকে স্থানীয় জনগণ পুকুরের পানি ব্যবহার করে এসেছেন। পুকুরের পানির গুণগতমান এবং পরিমাণ নিয়ে অধিবাসীদের কোন ধরনের অস্বস্তি ছিল না। নতুন করে পুকুর খনন না করা এবং পুরাতন পুকুরগুলো সংরক্ষণ এবং সংস্কার না করার ফলে খাবার পানির সমস্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

water Crisis
এই সমস্যার প্রেক্ষিতে নলকূপের প্রচলন শুরু হয়। স্থানীয় জনগনের মতে, এই এলাকায় ৮০’র দশকে প্রথম নলকূপ স্থাপন হয়। নলকূপ ব্যবহারে সুবিধা, সাশ্রয়ী, উপকারভোগীর হার বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঐতিহ্যবাহী খাবার পানির উৎসগুলোর (পুকুর) স্থান দখল করে নেয় সমসাময়িক আধুনিক প্রযুক্তির নলকূপ। কিন্তু নলকূপ স্থাপনের সমান্তরালে পুকুরগুলোর প্রতি মনোযোগ কমতে শুরু করে। পুকুরগুলোর পানির উপর নির্ভরশীলতা কমতে থাকে সমান্তরালভাবে।

ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ এবং মাত্রাতিরিক্ত আয়রণ এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে নলকূপের নিরাপদ পানি হুমকির মুখে পড়ে। একই সাথে সাধারণ পুকুরগুলোও অব্যবহৃত অবস্থায় থাকে। পিএসএফ’র কারণে পানি খওয়ার পুকুরগুলো কমতে থাকে। অন্যদিকে, পিএসএফগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো পতিত হয়ে যায় একই সাথে পুকুরগুলোও ব্যবহারের অনুপোযগী হয়ে পড়ে।

এই এলাকার মানুষ সুপেয় পানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রচন্ড সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে গত ২-৩ দশক ধরে। ভূগর্ভস্থ এবং ভূপৃষ্ঠের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা, সুপেয় পানির জলাধারের অভাব, কঠিন পাথুরে মাটি ও বালির অস্তিত্বের কারণে গভীর নলকূপের মাধ্যমে গভীর জলাধার থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। অল্প কিছু পুকুরের পানি এবং বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি হচ্ছে এই এলাকার সুপেয় পানির উল্লেখযোগ্য উৎস। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় পানির বিশলতা থাকলেও মিঠা পানির উৎস এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে সংকট সবসবময়ই ছিল। আর শ্যামনগর উপজেলা সুন্দরবন এবং সমুদ্র সংলগ্ন হওয়ায় মিঠা পানির সমস্যা তুলনামূলক বেশি। (চলবে)

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: