সাম্প্রতিক পোস্ট

চলনবিল: অতীত ও বর্তমান

:: চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

pic-6চলনবিল বলতে চলমান (চলন্ত) বিলকে বোঝায়। অর্থাৎ যে বিল প্রবাহমান। বিল সাধারণত বদ্ধ থাকে; তবে বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো। এ বিলের চলমান পানির অংশের পরিধি সঙ্কোচিত হতে হতে এখন এটা বদ্ধ বিলে পরিণত হয়েছে। এতে বদলে গেছে চলনবিল; দিনের পর দিন এর পরিধিও সঙ্কোচিত হচ্ছে। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্ট মোতাবেক, চলনবিলের আয়তন ছিল এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। উইকিপিডিয়া ও বাংলা পিডিয়ায় এর আয়তন দেখানো হয়েছে ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটার। পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, নাটোরের বড়াইগ্রাম, সিংড়া, গুরুদাসপুর এবং নওগাঁ জেলার আত্রাই রানীনগর চলনবিলের আওতাভুক্ত। ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপন হওয়ায় চলনবিল বিভক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে এ রেল লাইনের উত্তর ও পশ্চিম অংশকে চলনবিল বলা হয়। চলনবিল এলাকায় জমির পরিমাণ রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ৮শ’ ৭ হেক্টর। সমগ্র চলনবিল বিষুবরেখার ২৪ ডিগ্রী ৭মিনিট থেকে ২৪ ডিগ্রী ৩৫ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯ ডিগ্রী ১০ মিনিট থেকে ৮৯ ডিগ্রী ৩৫ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।

চলন বিল এলাকার নদী এবং খাল-বিল
চলনবিল এলাকায় ২২টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদীগুলো হলো আত্রাই, গুমানী, বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, বানগঙ্গা, নারদ, চিকনাই, গোহালা, বারনই, নাগর, করতোয়া, কাটাগাং। আত্রাই নদী আত্রাইয়ে দু’টি ধারায় বিভক্ত হয়ে আত্রাই ও গুড় নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়ে সিংড়ায় আবার মিলিত হয়েছে। নদীটি গুরুদাসপুরে নন্দকুজার সাথে মিলিত হয়ে গুমানী নাম ধারণ করেছে। নদীগুলো বছরের প্রায় ৭ মাস সচল থাকে। বাকি ৫ মাস থাকে পানিশূন্য। আত্রাই নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় শুকিয়ে যায়, বড়াল নদী মৃতাবস্থায় এখনো তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে কালের স্বাক্ষী হিসেবে। গুমানী বড়ালের সাথে মিশে যমুনায় পড়েছে। বানগঙ্গা, করতোয়ার অস্তিত্বও বিলীনের পথে। চিকনাই নদীতে বর্ষাকালে কিছু পানি থাকলেও বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে পানিশুন্য। চাটমোহরের নিমাইচড়া ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে কাটাগাং এবং করতোয়ার একটি ক্ষীণ ধারা রয়েছে, যা বছরের অধিকাংশ সময় শুষ্ক অবস্থায় থাকে। রাজশাহীর চারঘাট থেকে ৪৬ কিঃমিঃ ভাটিতে এসে বাগাতিপাড়ার আটঘরিতে বড়াল নদী দুই ভাগ হয়ে যায়। একভাগ বড়াল নামে আরেক ভাগ নন্দকুজা নামে ভাটিতে চলে আসে। নন্দকুজা নাটোরের গুরুদাসপুরে এসে আত্রাই নদীর সাথে মিশে গুমানী নাম ধারণ করে পাবনার ছাইকোলা হয়ে চাটমোহরে প্রবেশ করে। চরসেন গ্রামের ভাটিতে ত্রিমোহনীতে আবার দুই ভাগ হয়ে যায়। একভাগ ত্রিমোহনীর ২ কিঃমিঃ ভাটিতে এসে নূর-নগর নামক স্থানে বড়ালের সাথে মিশে বড়াল নামে চলে যায় বাঘাবাড়ি পর্যন্ত। বাঘাবাড়ির ভাটিতে করতোয়া ও বড়াল এক হয়ে হুরাসাগর নাম ধারণ করে যমুনায় মিশেছে। ত্রিমোহনী থেকে অপর ভাগ গুমানী নামেই প্রবাহিত হয়ে ফরিদপুরের সোনাহারা এলাকায় বড়ালের সাথে মিশে যায়। গুরুদাসপুর থেকে সোনাহারা পর্যন্ত গুমানী নদীর দৈর্ঘ প্রায় ৪০ কিঃমিঃ।

pic-1অন্যদিকে চলনবিল এলাকায় প্রায় ৯৩টি খাল ও বিলও রয়েছে। খালগুলোর মধ্যে কিনু সরকারের ধর, সাত্তার সাহেবের খাল, জানিগাছার জোলা, কুমার ভাঙ্গা খাল, গাড়াবাড়ি খাল, গোহালখাড়া, বাকইখাড়া, বেহুলার খাড়ি, কিশোরখালির খাল, দোবিলা খাল, সাঙ্গুয়া খাল, উলিপুর খাল, বেশানীর খাল, নিমাইচড়ার খাল উল্লেখযোগ্য। পূর্বে ধানকুনিয়া, কাটেঙ্গা, বাওন বাজার ও ছাইকোলায় পানি প্রবেশের চারটি নালা থাকলেও তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিলগুলোর মধ্যে বড় বিল, খলিশাগাড়ি বিল, ধলাইর বিল, ছয়আনি বিল, বাঁইরার বিল, সাধুগাড়ি বিল, মহিষা হালট, চাকল বিল, বৃগড়িলা বিল, কৈগাড়ি, টেংরাগাড়ি বিল, বিল কুরুলিয়া, জিওলগাড়ি বিল, ডিকশীর বিলসহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য বিল রয়েছে। এসব নদী ও খালের কারণে চলনবিল এলাকায় প্রাণবৈচিত্র্য ভরপুর ছিলো।

চলনবিলের সমৃদ্ধ অতীত
চলনবিল সম্পর্কে বলতে গিয়ে পাবনার চাটমোহর উপজেলার চরসেনগ্রামের শতবর্ষী প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব এনায়েত আলী জানান, যতদূর দৃষ্টি যেত কেবল পানি আর পানি। চারদিকে পানি বেষ্টিত এক একটা গ্রামকে যেন মনে হতো এক একটা দ্বীপ। যোগাযোগের বাহন বলতে নৌকাই ছিল একমাত্র অবলম্বন। বাতাসের ঝাপটা উপেক্ষা করে ছুটে চলতো পাল তোলা নৌকা। প্রাণ ভয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতো মাঝি, মাল্লা, যাত্রীরা। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে নানা প্রজাতির শাপলা ফুল ও জলজ গুল্মলতার উপর দিয়ে ছুটে চলতো নৌকা। রাতের বেলা ডাকাতের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বুক কাঁপতো দূরু দূরু করে। এ এলাকার নামকরা ডাকাতদের মধ্যে অনেকের নাম এখনো শোনা যায় প্রবীণ ব্যক্তিদের মুখে। ডাকাতরা ডাকাতি করে মালামাল লুট করে ভাগ বাটোয়ারা এবং মাঝে মধ্যে অবস্থান করতো চাটমোহরের ধুলাউড়ি গ্রামের পার্শবর্তী বিলের মধ্যে এক উঁচু ভিটায়। পরবর্তিতে সে ভিটাটি ডাকাতের ভিটা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ভিটাটি আজও কালের সাক্ষী বহন করে চলছে। উজান থেকে বিলে আসা পলিমিশ্রিত ঘোলাপানির পলিগুলো বিলে পড়তো। পলিগুলো ভূমিতে নিঃসৃত হবার পর বিলের পানি হতো কাক চক্ষুর মতো স্বচ্ছ। বিলের শুকিয়ে যাওয়া অংশের পলি নিঃসৃত মাটিতে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন হতো। বিলে ছিল মাছের প্রাচুর্য্যও। শৈল, বোয়াল, রুই, কাতলা, গজার, চিতল, কালবাউশ, কই, মাগুর, শিং, স্বরপুটি, পুটি, টেংড়া, ফাতাসী, টাকি, মেনি, কাকলা, মৌসি, চাঁদা, আইড়, রিটা, বৌমাছ, চাপিলা, রায়াক, চেলা, বাঁচা, চিংড়ি, গুজ্যা, বেলে, চ্যাং, পবা, শেলং, গুচি, বাইন, খলিশা, গরুকুয়া, খসল্লা, বাঁশপাতা, ডানকিনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। সে মাছ এ এলাকার মানুষের চাহিদা তো মেটাতোই পাশাপাশি চলে যেত দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে। মানুষ মাছ জিইয়ে রেখে খেত দীর্ঘদিন। যে মাছ জিইয়ে রাখা সম্ভব হতো না সেগুলো শুটকী করা হতো। মাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় মৎস্যজীবীরা মাছ শুটকী করতো। কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে তাই চলনবিলের বাতাসে ভাসতো শুটকী মাছের গন্ধ। শুটকী মাছ পাঠানো হতো নিলফামারী, সৈয়দপুরসহ অন্যান্য জেলায়। মাছে ভাতে বাঙালি প্রবাদটি সে সময় সত্য ছিল। চলনবিল এলাকায় ভালো ফসল উৎপাদন হতো। কৃষকরা চলনবিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমতল ভূমিতে আমন ধান, খেশারি, মশুর, সরিষা, চিনা, গম, যব, ছোলা, কাউন, ভূড়া প্রভৃতির আবাদ করতো।

ক্ষত-বিক্ষত চলনবিল
pic-7চলনবিলের সমৃদ্ধ অতীত আজ আর নেই বললেই চলে। চলনবিলকে ক্ষত-বিক্ষত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আশির দশকে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট, স্লুইসগেট নির্মিত হয় চলনবিলের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে সেটা যাচাই না করেই! ফলশ্রুতিতে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে চলনবিলের পরিধি। একই দশকে যমুনা নদীর তীর থেকে বাঘাবাড়ি, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, হান্ডিয়াল, গুরুদাসপুর, তাড়াশ পর্যন্ত নদীর দুই পাড় দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে বাঁধের ভিতরের অংশের গ্রামগুলোর বাড়ি ঘর ফসলাদি ডুবে ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয় এবং বাঁধের বাইরের অংশের গ্রামগুলোর মানুষ পানির অভাবে ফসল উৎপাদন করতে পারে না। এ বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বিল ঝিলের সংযোগ রক্ষাকারী ছোট ছোট খাল নালার মুখে ছোট বড় মাঝারি স্লুইসগেট দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়ায় বাঁধের ভিতরের অংশের মানুষ এবং বাইরের অংশের মানুষের মনে সৃষ্টি হয় মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। কয়েক দশক আগে চলনবিলের বুকচীরে নির্মিত হয়েছে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক পথ। নদী খাল বিলের মধ্য দিয়ে তৈরি করা এসব সড়ক বদলে দিয়েছে চলনবিল এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা। পানির স্বাভাবিক চলাচল ঠিক রাখতে বর্তমান বওশা ঘাট, দরাপপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় বেশ কিছু উন্মুক্ত ব্রীজ নির্মিত হয়েছে এবং আরও কিছু ব্রীজ এর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কিন্তু নির্মাণাধীন এবং নির্মিত এ ব্রীজগুলো চলনবিল এলাকার পানি প্রবাহকে কতটা স্বাভাবিক রাখতে পারে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। পাশাপাশি আত্রাই নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপন করায় শুষ্ক মৌসুমে কিছু পানি রাবার ড্যামে আটকে যাওয়ায় ভাটির মানুষ পানি সুবিধা, সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। ভাটির নদীগুলো একেবারে শুকিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পরে ফসল ও মৎস্য উৎপাদনে। বন্ধ হয়ে যায় নৌ চলাচলও।

পরিবর্তিত চলনবিল, পরিবর্তিত মানুষের জীবন-জীবিকা-সংস্কৃতি
নানান অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে চলনবিলের সেই সমৃদ্ধ অতীত আজ আর নেই। চলনবিল এলাকার মানুষেরা নিত্যদিনে নানান সমস্যায় জর্জরিত। উপরোন্তু জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সার-বিষের কৃষি চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর। অপরিকল্পত অবকাঠামো ও রাসায়নিক সার ও বিষের কারণে আজ চলনবিল এলাকায় মাছ, শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপ, শিশুক, কুচ্যা, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী কমে যাচ্ছে। মাছবৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবিকাও বিপন্ন হচ্ছে। উপরোন্তু অবশিষ্ট যা মাছ রয়েছে সেগুলোও অমৎস্যজীবীরা ভাগ বসিয়েছে। ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে চলন বিলাঞ্চলে নিবন্ধিত ১০টি মৎসজীবী সমবায় সমিতি ছিল কিন্তু ২০০৯-২০১০ এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮! এর মধ্যে বেশির ভাগই অমৎস্যজীবীদের সমিতি। জেলেদের জীবিকাই শুধু নয়, চলনবিল এলাকায় অসংখ্য বাঁধ, স্লুইসগেট নির্মিত হওয়ায় কোন কোন এলাকায় নৌচলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মাঝি মাল্লারা বেকার হয়ে পড়েছেন; সংসারে দেখা দেয় অভাব-অনটন। এছাড়া নদী খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া এবং বছরের অধিকাংশ সময় নদীগুলো থাকে পানিশূন্য থাকায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে। নৌপথ জৌলুশ হারানোর কারণে নৌকার মাঝি মাল্লারা তো বেকার হয়ে পড়েছেনই উপরোন্তু স্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকার প্রচলন হলে গুন টানা, পাল তোলা নৌকা কমতে শুরু শুরু করে। ইঞ্জিন চালিত নৌকার পরিত্যক্ত ডিজেল, মবিল পানি ও পরিবেশকে দূষণ করছে। চলনবিলের এলাকায় পরিবেশ বিপর্যস্ত হওয়ায় কমে গেছে পাখির সংখ্যাও। অথচ আগেকার দিনে বর্ষা মৌসুমে চলনবিলাঞ্চলের মাছের স্বাদ পেতে শীত প্রধান দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে অতিথি পাখি চলনবিল অঞ্চলে আসতো। মাছ কমে যাওয়া এবং শৌখিনদের শিকারে পরিণত হওয়ায় আজ চলনবিলে শীত মৌসুমে খুব একটা পাখি আসে না।

pic-3শুধু তাই নয়; কালের বিবর্তনে চলনবিল এলাকার কৃষি ব্যবস্থাপনাতে এসেছে পরিবর্তন। অতীতে চলনবিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমতল ভূমিতে আমন ধান, খেশারি, মশুর, সরিষা, চিনা, গম, যব, ছোলা, কাউন, ভূড়া প্রভৃতির আবাদ হতো। তবে বর্তমানে এসব ফসলের মধ্যে চিনা, ছোলা, যব, ভূড়া ও কাউনের আবাদ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তদস্থলে নতুন করে শুরু হয়েছে বোরো ধানের আবাদ। এ ধান আবাদে প্রচুর পরিমাণ পানি ও রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। চাষবাদ ও পেশার পরিবর্তনের সাথে মানুষের সংস্কৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন। চলনবিল এলাকায় লোকায়ত কৃষি চর্চা এবং লোকায়ত কৃষি উপকরণ আজ কেবল স্মৃতি। আধুনিক কৃষি আসার পর থেকে জৈব সার পরিবর্তে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে, লাঙলের পরিবর্তে ট্রাক্টর, সেচের জন্য ডীপ টিউবওয়েল, ডিজেলসহ আরও অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়েছে। ঢেঁকি শব্দটা আজ প্রায় বিলুপ্তই হতে চলেছে চলববিল এলাকায়! অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে যানবাহন বেড়েছে, শহরের ছোঁয়া পড়ায় গ্রামের মানুষেরা আকাশ সংস্কৃতিতে বুঁদ হয়ে যাওয়ায় ভুলে যেতে বসেছেন তাদের লোকায়ত, ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য সংস্কৃতি ও ক্রীড়াকে। এসব পরিবর্তন মধ্যে কোনটা ইতিবাচক হলেও পরিবেশ-প্রকৃতিকে বিনাশ করে পরিবর্তন সূচিত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়েছে প্রাণবৈচিত্র্য, পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যকার একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু মানুষের কল্যাণ করতে গিয়ে যদি পরিবেশকে বিপন্ন করা হয় তাহলে প্রকৃতিতে একটি অভারসাম্য অবস্থা তৈরি হবেই। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান দুর্যোগগুলো আমাদেরকে সেই অভারসাম্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তাই উন্নয়নকে হতে হবে পরিবেশবান্ধব।

উপসংহার
জীবনের পরিপূরক হচ্ছে পানি। জীবনের জন্য, জীবের জন্য, প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অতীব জরুরি। চলনবিলের ঐতিহ্যকে তাই ধরে রাখতে হবে; চলনবিলকে তার মতো করেই চলতে দিতে হবে। প্রাকৃতিক নিয়মে চললেই চলনবিল বেঁচে থাকবে, সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে আমাদের জন্য। চলনবিলকে রক্ষার জন্য ইতিমধ্যে মানুষেরা গড়ে তুলেছেন অরাজনৈতিক সংগঠন চলনবিল রক্ষা কমিটি। চলনবিল রক্ষা কমিটিকে তাদের মতো করে কাজ করতে দেওয়া উচিত। এই রক্ষা কমিটির বিভিন্ন উদ্যোগের সাথে আমরাও শামিল হতে পারি, বাড়াতে পারি সহযোগিতার হাত। এছাড়া চলনবিলের সীমানা নির্ধারণ করে খাল, বিল, নদী দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করার উদ্যোগ নিলে চলনবিলাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমেও পানি ধরে রাখা সম্ভব। নয়তো কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এ বিলও এগিয়ে যাবে মরুকরণের দিকে। আমরা মনে করি, বর্তমান নদীবান্ধব সরকার এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখলে চলনবিল ফিরে পেতে পারে তার হারানো জৌলুশ। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকেও এগিয়ে আসতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: