Posted in

আর কতো সইবো

সাতক্ষীরার , শ্যামনগর থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

আমরা মানুষ। আমাদের মন আছে আমাদের অনুভুতি আছে। অনেক কিছু তৈরি করার জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-দক্ষতা আছে।যাকে পুঁজি করে আমরা হরহামেশেই কত কিছু না তৈরি করতে পারি। আবার ধ্বংসও করতে পারি। ঠিক তেমনি প্রকৃতির অনেক ধরনের সম্পদ আছে যা প্রকৃতির নিয়মে হয়ে থাকে আবার প্রকৃতির নিযমে ধ্ববংসও হয। সেখানে আমরা মানুষেরা সেটাকে লালনপালন করে থাকি। হঠাৎই এই সুন্দর প্রকৃতি আবার কখোনা তার বৈরীরূপ দেখিয়ে সব কিছু তছনছ করে দেয়। তার মধ্যে সেখানে অনেক কিছু পুনরায় আবার প্রকৃতির নিয়মে তা পূরণ হযে যায। আবার কিছু ক্ষেত্রে আমরা মানুষেরা সেটাকে সংস্কার করে নিয়ে সাজাতে থাকি। যা আমাদের বসবাস উপযোগী পৃথিবী গড়ে তোলার কাজে লাগে খুবই ভুমিকা রাখে। কিন্তু এই বসবাস উপযোগী পৃথিবী শুধুই আমরা মানুষেরা গড়ে যাবো প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে।আবার কখনই প্রকৃতির নিয়মে বিলীন হবে এ যেন প্রকৃতির সাথে আমাদের এক খেলা। এখেলার নেই কোন শেষ।

গত ২০ মের প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় আমফান পরবর্তী সময়ে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পোড়াকাঠলা, দূর্গাবাটি, ভামিয়া ও দাতিনাখালী গ্রামে মাঠ পর্য়বেক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের ক্ষয়ক্ষতি এবং আশংকা জানতে চাওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেখানে দুর্গাবাটি গ্রামের প্রবীণ খোকন মন্ডল বলেন, ‘আমরা যেহেতু উপকূলীয় এলাকায় বাস করি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করে আমাদের টিকে থাকতে হয়। কিন্তু এভাবে টিকতে টিকতে তো আর আমাদের কোন জায়গা থাকবে না। আগেও ঝড় বৃষ্টি, ঘুর্ণিঝড় হতো কিন্তু মনে হয় এতো না। এখন তো দেখি প্রতিবছর ছোট বড় নানান ধরনের দুর্য়োগ লেগে আছে। নিজেদের ঘর বাড়ি বসতভিটা সংস্কার করতে না করতেই যদি আবার আঘাত হানে তাহলে কিভাবে টিকে থাকবো আমরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তো টিকে থাকার সব কৌশল ও অবলম্বন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর অনেক বড় বড় ঘুর্ণিঝড় হযেছে আমাদের এই উপকূলের উপর দিয়ে বিশেষ করে আমাদের শ্যামনগর উপজেলার উপর দিয়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি একটু পিছনের দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে পারবো। যে ২০০৯ সালের আইলা হলো আর আইলাতে আমাদের যা ক্ষতি করেছে তা হয়তোবা ২০ বছরে পূরণ হওয়ার নয়। তার পরে নিজেরো চেষ্টা করে আবার কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে ছিলাম কিন্তু তাতেও বাধা। আইলার পরে যে ঘুর্ণিঝড়গুলো হযেছে তা আমাদের ঘরবাড়ি, কৃষি ক্ষেত খামার, ধান-সবজি, আসবাবপত্র, ও মাছ চাষে ক্ষতি করেছে। আইলার পরে বাঁধ ভেঙে আর লবণ পানি উঠেনি। কিন্তু এই আমফান ঝড়ে আবার আমাদের সেই আইলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো। সবেমাত্র আমরা নিজ নিজ বসত ভিটায় নানান ধরনরে গাছ-গাছালি দিয়ে সবুজ করার চেষ্টা করছি।’ খোকন মন্ডল বলেন, ‘বসত ভিটাগুলোতে কৃষি কাজে ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠছে। আবার নানান ধরনের স্থানীয় মাছ সংরক্ষণ ও চাষাবাদ হচ্ছিল। অনেকে নিজের বাড়ি ভিটা উচু করে ঘর বেঁধেছে।আবার অনেকেই ঘর বানাতে পারেনি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কোন রকম মাথা গোজার ঠাঁই করতে পেরেছিলো। কিন্তু এই আমফানের কারণে আবার সবকিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে। একদিকে এই ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি আর তার সাথে তো যুক্ত আছে করোনা ভাইরাস। সবকিছু মিলিয়ে যেন এক বিভীষিকাময় জীবনযাপন আমাদের।’

ঘূর্ণিঝড় আমফানের ক্ষতিগ্রস্ত পোড়াকাঠলা ও দাঁতিনাখালী গ্রামের কৃষ্ণপদ মন্ডল, অশোক মন্ডলরা ও শেফালী বেগমরা জানান, গত ২০ নভেম্বর ২০২০ রাত ১১টার দিকে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পূর্ব দুর্গাবাটি গ্রামের ২ জায়গায় এবং দাতিনাখালী গ্রামের এক জায়গার নদীর বাঁধ ভেঙে ভামিয়া, পোড়াকাঠলা, পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, নীলডুমুর, মাছুদ মোড়, জলিল মোড়, রঘুনাথবাড়ি, ঘোরামী বাড়িসহ দাতিনাখালী গ্রামে লবণ পানিতে প্লাবিত হয়। এতে হাজার হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের, শত শত পুকুর, বসতভিটা, সবজি ক্ষেত, বিভিন্ন ধরনের গাছ গাছালি, সুপেয় পানির পুকুর ও পিএসএফ, লেট্রিন, ঘর বাড়িতে লবণ পানি ঢুকে পড়ে। অনেকের ঘর ও ভেঙে গেছে। তারা আরও জানান, কয়েকদিন ধরে নদীর লবণ পানির জোয়ার ভাটা বইতে শুরু করেছে। এতে করে আইলার পরের ১১ বছর ধরে যা যা মানুষ তৈরি করেছিলো সেগুলো আবার নষ্ট হযে গেলো। এবার হয়তোবা আইলার মতো এতটা বিস্তৃত নয়। শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি, গাবুরা, পদ্মপুকুর, মুন্সিগঞ্জ, কৈথালী ও বুড়িযোয়ালিনী ইউনিয়নের কিছু কিছু গ্রামে আঘাত করলেও এর মাত্রা কম। যদিবা খুবই দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়ে উঠবে তারপরও ক্ষতির মাত্রাও কম নয়। কারণ যে সব গ্রামে লবণ পানির জোয়ার ভাটা প্রবাহিত হয়েছে সেখানে পুনরায় আবার কিছু করতে গেলে খুব বেগ পেতে হবে। বছরের পর বছর যদি এভাবে ঘুরে ঘুরে নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসতে থাকে তাহলে তো বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এভাবে তো আর টিকে থাকা যায় না কতোইবা উপকূলীয় মানুষগুলো এভাবে সইবেন?

তারা আক্ষেপ করে  বলেন, ‘আমাদেরর ওয়াপদা রাস্তাগুলোর যে দুর্দশা তাতে তো যেনতেন কোন দৃর্যোগ হলে রাস্তা ভেঙে এলাকায় পানি ঢুকবে। কিছু কিছু রাস্তা এক থেকে তিন হাত কোথাও আবার দেড় হাত আবার কোথাও যে কোন রাস্তা আছে তা চোখে পড়ে না। এর থেকে আমরা যারা ঘের করি সেসব রাস্তাগুলো মনে হয় অনেক বড়।কোন মহলের কোন নজরদারি নেই আমাদের এই ভেড়িবাঁধের রাস্তার উপর। আমাদের এসকল রাস্তা মজবুত করতে হলে স্থানীয় মানুষের পরামর্শ নিযে করলে ভালো হবে। এখানকার রাস্তাগুলো কমপক্ষে ৫০-৭০ ফুট উচু করা, প্রস্থ ৩০ ফুট এবং রাস্তার বাইরে ৫০ ফুট মাটি রেখে রাস্তা করলে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে অনাথায় নয়। বছরের পর বছর আমাদের এভাবে লবণ পানিতে ডুবতে হবে।’

বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্যোগ ঝুঁকিপুর্ণ হলো উপকূলীয় অঞ্চল। এ উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলাএর একটি উপজেলা হচ্ছে শ্যামনগর। প্রতিবছর নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই এলাকাতে কম বেশি আঘাত হানছে এবং ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ততার শিকার হতে হয়েছে এ এলাকার মানুষকে। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে একদিন হয়তোবা এই এলাকার মানুষকে এলাকা ছেড়ে অনত্র আশ্রয় নিতে হবে। কারণ প্রতিবছর শত শত বিঘা জমি নদীর মধ্যে চলে যাচ্ছে। এ জন্য উপকূলীয় এলাকার জন্য জনউন্নয়ন ও জনপরিকল্পনা তৈরি করে বাঁধগুলোকে আরো মজবুত করা দরকার। তাহলে হয়তোবা প্রাকৃতিক নানান ধরনের দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় মানুষ কিছুটা হলেও রেহায় পাবেন। বেঁচে যাবে তাদের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আশ্রয়স্থল!

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.