সাম্প্রতিক পোস্ট

নিরাপদ ফসলের জন্য ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন

ঢাকা থেকে এবিএম তৌহিদুল আলম

প্রক্রিয়াজাত করণের পর ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার

ট্রাইকোডার্মা
Trichoderma harzianum ট্রাইকোডার্মা হার্জেনিয়াম ইংরেজি হচ্ছে মাটিতে মুক্তভাবে বসবাসকারি উপকারি ছত্রাক-যা উদ্ভিদের শিকড়স্থ মাটি, পচা আবর্জনা ও কম্পোস্ট ইত্যাদিতে অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়। এটি মাটিতে বসবাসকারি উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও নেমাটোডকে মেরে ফেলে। ট্রাইকোডার্মা এমনই একটি অণুজীব যা জৈবিক পদ্ধতিতে উদ্ভিদের রোগ দমনে ব্যবহার করা যায়।

ট্রাইকোডার্মা বায়োপেস্টিসাইডটি প্রথম আবিষ্কার করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো.বাহাদুর মিয়া যা ২০১৩ সালে আরডিএ, বগুড়া ল্যাবরেটরিতে গবেষণার মাধ্যমে কৃষকদের ব্যবহার উপযোগি করে তোলা হয়।

ট্রাইকো কম্পোস্ট
ট্রাইকো কম্পোস্ট হলো এক ধরনের জৈব সার যার মূল উপাদান হলো ট্রাইকো ডার্মা নামক এক ধরনের উপকারী ছত্রাক। বিভিন্ন জৈব উপাদান যেমন গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, সব্জির উচ্ছিষ্টাংশ, কচুরিপানা, কাঠের গুড়া, ভুট্টার ব্রান, চিটাগুড়, ছাই, নিমপাতা ও ট্রাইকোডার্মা ছত্রাকের অণুজীব নির্দিষ্ট অনুপাতে একত্রে মিশিয়ে বা বিশেষ উপায়ে রেখে পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কম্পোস্ট তৈরি করা হয় তাই ট্রাইকো কম্পোস্ট।

হাউজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার

ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সারের উপকারিতা
 টাইকো কম্পোস্ট জৈবসার মাটিতে বসবাসকারী ট্রাইকোডার্মা ও অন্যান্য উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়িয়ে অনুর্বর মাটিকে দ্রুত উর্বরতা দান করে, মাটিবাহিত রোগ এবং ক্ষতিকর ছত্রাককে ধ্বংস করে।
 মাটির অম্লতা, লবণাক্ততা, বিষক্রিয়া প্রভৃতি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে ফসলের ফলন বাড়ায়।
 পানির অপচয় রোধ ও সেচ খরচ কম হওয়ায় ফলে কৃষকের আর্থিক সাশ্রয় হয়।
 মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়।
 মাটি ও ফসলের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার ফলে পরিবেশের উন্নতি ঘটে এবং বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন করার সুযোগ তৈরি হয়।
 টাইকো কম্পোস্ট জৈবসার গাছের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদানের বেশিরভাগের উপস্থিতির কারণে কমপক্ষে ৩০ রাসায়নিক সার কম লাগে বলে উৎপাদন খরচ হয়।
 ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে
 এটি পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী কারণ টাইকো কম্পোস্ট অন্য যে কোনো জৈব সারের চেয়ে দামে সস্তা ও অধিক কার্যকরী।

ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরির পদ্ধতি
ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার তৈরির জন্য প্রয়োজন ট্রাইকোডার্মা। ট্রাইকোডার্মা ট্রাইকো-সাসপেনশন, পাউডার এবং পেস্ট আকারে পাওয়া যায়।
পচা আবর্জনায় ‘ট্রাইকো-সাসপেনশন’-বা ট্রাইকো পাউডার এর জলীয় দ্রবণ নিয়মানুযায়ী স্প্রে করে বা মিশিয়ে দ্রুত সময়ে ট্রাইকো-কম্পোস্ট জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। ভার্মি কম্পোস্টও ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরির প্রক্রিয়া প্রায় একই। ভার্মিকম্পোস্ট থেকে শুধু জৈব সার পাওয়া যায়, অন্যদিকে ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে জৈবসার ও বালাইনাশক দুটোই পাওয়া যায়। যে কারণে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

ট্রাইকো কম্পোস্ট বসতবাড়িতেই তৈরি করা যায় এবং তেমন কোনো খরচও নেই। বিভিন্নভাবেই এই সার তৈরি করা যায়। তবে খুব সহজ পদ্ধতি হলো মাটিতে গর্ত করে বা ইট-সিমেন্টের রিং বা হাউজ বানিয়ে নিচে পলিথিন বিছিয়ে ট্রাইকো কম্পোস্টের উপকরণগুলো পরপর বেড়ের মতো করে সাজাতে হয়। আর উপকরণ হিসাবে যা লাগে সেগুলিও হলো এক মণ গোবর, ১০-১৫ কেজি পচনশীল উপকরণের টুকরা যেমন কচুরিপানা টুকরা, লতাপাতা টুকরা, এরসাথে কাঠের গুঁড়া, মুরগির বিষ্ঠা, ছাই, নিমপাতা, এক কেজি চটাগুড়, এক কেজি ভুট্টা ভাঙা দিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হয়। এরপর ৪০ গ্রাম ট্রাইকো পাউডার এক লিটার পানিতে গুলিয়ে নিয়ে উপকরণের কিছু অংশ বেড়ের মতো করে গর্তে বা হাউজে বিছিয়ে এর উপর স্প্রে করতে হবে। এভাবে একটি স্তর হয়ে গেলে আবার ট্রাইকোডার্মা পাউডার মিশানো পানি স্প্রে করতে হবে। প্রতিটি স্তরের উপর স্প্রে করে তা ভিজিয়ে দিতে হবে। এরপর হাউজটি একটি টিনের চালা দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। মিশ্রণটি চার-পাঁচদিন পরপর ভালোভাবে নেড়ে দিতে হবে। তা না হলে গ্যাসের চাপে সিমেন্টের রিং বা হাউজ ফেটে যেতে পারে। ৪০-৪৫ দিনের মধ্যেই সার তৈরি হয়ে ব্যবহারের উপযোগী হয়। উপকরণগুলো তখন আর চেনা যাবে না এবং গন্ধহীন ঝুরঝুরে কালো বর্ণের ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি হবে।

বারসিক’র কারিগরী সহায়তায় পরীক্ষামূলক ভাবে কৃষক পর্যায়ে সর্বপ্রথম উৎপাদিত ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সার, গ্রাম: খড়িবোনা, ইউনিয়ন: কসবা, উপজেলা: নাচোল জেলা: চাপাইনবাবগঞ্জ

ব্যবহার বিধি
জমির উর্বরতা ও ফসলভেদে ব্যবহারের মাত্রা কমবেশি হলে সাধারণত প্রতি একর জমির জন্য ৫০০-৭০০ কেজি ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করতে হয়। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায়, শতাংশ প্রতি ৫-৭ কেজি পরিমণ ট্রাইকো কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ফসল যেমন আলু, পেঁপে, বেগুন, পটল, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ডাটা, শসা, ইত্যাদিতে আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেছে। সবজি ছাড়া পেয়ারা, বড়ই, পেপে, কলা, আম ইত্যাদি ফল চাষেও ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহার করা যায়। অধিক ফলন পেতে ট্রাইকোডার্মা জৈব সার (প্রতি শতকে) আলুর জন্য ৭ কেজি, সবজির জন্য ৫ কেজি, ভূট্টার জন্য ৮ কেজি ও ধানের জন্য ৭ কেজি হারে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ট্রাইকো কম্পোস্ট প্রয়োগকৃত জমিতে অনুমোদিত রাসায়নিক সারের ৩০% কম প্রয়োগেও ফসলের ফলনের কোনো পার্থক্য হয় না।

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে মোটামুটি স্বয়ং সম্পূর্ণ হলেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এখন ও আমাদের কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাইকো কম্পোস্ট ব্যবহারে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যতিরেকে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফসলের উৎপাদন অধিক পরিমাণে করা সম্ভব। এক কথায় ট্রাইকো কম্পোস্ট সার প্রয়োগে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন সন্তোষজনকভাবে বাড়ে অন্যদিকে মাটির উর্বরতা ও বাড়ে এবং রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়।

পৃথিবীর অনেক দেশের ন্যায় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে ট্রাইকোডার্মা ও ট্রাইকো-কম্পোস্ট এর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের কৃষিবাস্তবতা ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ট্রাইকো কম্পোস্ট জৈব সাবের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই, প্রাণবৈচিত্র্য-পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে কর্মরত বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন বারসিক অন্যান্য কাজের পাশাপাশি কর্মএলাকায় কৃষক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাইকো-কম্পোস্ট জৈব সার উৎপাদন, ব্যবহার, উপকারিতা কৃষক প্রশিক্ষণ সচেনতা বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: