Posted in

জ্বালানি সাশ্রয়ী চুলার কারিগর

:: নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

Untitledbcষাটোর্ধ্ব বয়সে এখনো তিনি নিজ গ্রামের এ-বাড়ি ও-বাড়ির চুলা তৈরি করে বেড়ান। চুলা তৈরি করে দিতে যে-ই ডাকে, কাউকে কখনো তিনি ‘না’ বলেন নি। নিজের গ্রামসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে তার চুলার কদর অনেক।

আমরা নেত্রকোণা জেলার লক্ষ্মীগঞ্জ ইউনিয়নের অন্তর্গত সুলতানগাতী গ্রামে রাহেলা আক্তারের কথা বলছি। রাহেলা আক্তার দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেও বউ নিয়ে ঢাকা থাকে। বাড়িতে তিনি ও তাঁর বৃদ্ধ স্বামী ছাড়া আর কেউ নেই। তাই তাঁর হাতে অফুরন্ত সময়। সকালে সারা দিনের রান্না শেষ করে তিনি বেড়িয়ে পড়েন চুলা তৈরির কাজে। শুধু নিজের গ্রামই নয়, কোন আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে গেলে সেখানেও তিনি চুলা তৈরি করে দিয়ে আসেন।

তাঁর চুলা তৈরি করার কিছু পদ্ধতি রয়েছে। যেমন তিনি চুলার জন্য যে মাটি সংগ্রহ করেন, সেটা পুকুরের মাটি। চৈত্র মাসে যখন পুকুরের পানি শুকিয়ে যায় তখন তিনি তিন (৩) হাত পর্যন্ত গভীর গর্ত করে তার নিচ থেকে মাটি তুলে রাখেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “যত নিচ থেকে মাটি তোলা যায় সেই মাটি তত চিকনা (আঠালো) হয়। চিকনা মাটির চুলা মজবুত হয়, অনেকদিন ব্যবহার করা যায়, এটি ভাঙ্গেও না”। তিনি আরো বলেন, “যহন থেইক্যা কাজ করা শিখছি তহন থেইক্যাই চুলা বানাই। নিজের মনের থেইক্যাও নকশা করি। আবার কারোর কাছে দেখলে সেইডাও বানাইতে পারি”। একই গ্রামের কুলসুমা আক্তার, সাফিয়া আক্তার সহ অনেকেই জানান যে, তারা কেউই রাহেলার মতো চুলা বানাতে পারেন না, তারা রাহেলাকে দিয়েই মূলত তাদের রান্নার চুলা তৈরি করিয়ে নেন।

Untitledঅন্যদের চুলা তৈরি করে দেওয়ার পাশাপাশি অনেককেই তিনি চুলা বানানো শিখিয়েছেন। তাঁর মতো এই গ্রামে আরো দুজন নারী আছেন যারা চুলা তৈরি করতে পারেন, তাঁরাও রাহেলার কাছে শিখেছেন। এই দুজন নারীকে নিয়ে রাহেলা আক্তার সারা গ্রামে চুলা তৈরি করে বেড়ান। রাহেলা আক্তার প্রায় ১৫ ধরণের চুলা বানাতে পারেন। এই চুলার আবার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম ও ব্যবহারের ধরণ। যেমন : চৌহা চুলা, নৌকা চুলা, তিন মূখি চুলা, দ্বিমূখি চুলা, গায়না চুলা, তূষের চুলা, শিকের চুলা, ফাসি চুলা ইত্যাদি। কোন চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করা যায়, কোনটা তূষ বা ভূষি, খড়, পাতা ইত্যাদি।

রাহেলার চুলার কী এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাঁকে দিয়ে মানুষ চুলা বানিয়ে নেন? এর উত্তর তিনি দিয়েছেন এভাবে “আমরার গ্রামে চৌহা চুলার প্রচলন বেশি। প্রায় সকলেই এই চুলায় রানতে পছন্দ করে। এই চুলায় লাকড়ি বা বন দিয়া রান্ধন যায়। ধোঁয়া হয়না, সময় কম লাগে, লাকড়িও কম লাগে। দুই দিকে মুখ থাকার কারণে একদিক দিয়া ছাই বাইর কইরা দেওয়া যায়। এই কারণে চুলায় ময়লা জমে না। আগুনও ভালো জ্বলে। তাছাড়া শীতের দিনে চুলার পাড়ে বইসা বাইরে থাকা আগুন তাপানো যায়। সন্ধ্যার সময় রান্না বসাইলে অনেকেই চুলার পাড়ে বইসা আগুন তাপাই আর গল্প করি”।

জ্বালানি সাশ্রয়ী এ চুলার ব্যবহারের মাধ্যমে রাহেলাসহ অন্য নারীরা বায়ুমন্ডলে কম কার্বন নিঃসরণ করেন। কারণ এ চুলায় ধোঁয়া কম হয় এবং কম জ্বালানি লাগে বলে জ্বালানির ওপরও চাপ কমায়। এছাড়া আগুণের তাপ অপচয় কম হয়। স্বল্প সময়ে রান্না করা যায় এসব চুলায়।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.