হরিরামপুর চরাঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে কাউন চাষ

হরিরামপুর, মনিকগঞ্জ থেকে মুকতার হোসেন
মানিকগঞ্জ হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ চরাঞ্চলে নটাখোলা গ্রামে বাড়ি কৃষক এরশাদ আলী বয়স ৫৫ বছর। তার বাড়ির পাশে ৮ শতক জমিতে কাউন চাষ করেন। কাউনের ফলন বেশ ভালো দেখা যাচ্ছে। বাতাসে কাউনের শিশগুলো দোল খাচ্ছে। নটাখোলা, পাটগ্রামচর, গঙ্গাধরদি কবিরপুর, বালিয়াচর বিভিন্ন গ্রাম থেকে কৃষকরা যাওয়ার আসার সময় তার কাউন ক্ষেতটি এক নজর দেখে যান। কৃষক এরশাদ আলী বলেন, ‘আজ থেকে ৮-১০ আগে আমোদের চরাঞ্চলে অনেক কাউন চাষ হত। কিন্তু এখন কাউন চাষ কমে গেছে। কাউনের চাল করা কষ্টকর। আগে বাড়িতে বাড়িতে ঢেকি ছিল, কিন্তু এখন আর কারো বাড়িতে ঢেকি নাই। তাই অনেকে কাউন চাষ বাদ দিছে। তাছাড়া এলাকায় নদীভাঙনের ফলে কাউনের চাষের অনেক জমি হারিয়ে গেছে। বন্যার হওয়ার কারণে বীজের সংকট ও ভুট্ট,া তিল, বাদাম ও সরিষা অন্যান্য ফসল করার কারণে কাউন চাষ দিনদিন চরাঞ্চল থেকে কমে যাচ্ছে।’


তিনি আরো বলেন, ‘বিগত দুই বছর ধরে চরাঞ্চলে কাউন চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পদ্মার জেগে উঠা চরে নদীর কোলের জমিগুলোতে আমরা কাউন চাষ করছি। বর্তমানে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের নটাখোলা বালিয়াচক হরিহরদিয়া চরে কিছু কৃষক কাউন চাষ করছে। অনেক কৃষক তিলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে কাউন চাষ করে থাকেন।’
অন্যদিকে নটাখোলা গ্রামের তরুণ কৃষক আল-আমিন হোসেন বলেন, ‘যদি আমরা স্থানীয় জাতের তিল, কাউন, বাদাম, সরিষা, গম পায়রা চাষ, মাসকালাই খেসারি কালাই এসব ফসল চাষের আওতায় না রাখি তাহলে আমাদের কাজ এলাকার এই বীজগুলো হারিয়ে যাবে। এই সকল দেশি জাতের ফসল রক্ষা করে আমরা চরকে একটি বৈচিত্র্য ফসলের সমাহার গড়ে তুলতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, তরুণ যুবকদের সাথে বীজ সংরক্ষণ চাষ পদ্ধতি অভিজ্ঞ কৃষকদের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে যুবকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তা না হলে মানুষ নির্ভর হয়ে পড়বে হাট বাজারের বীজের উপর এবং বিভিন্ন কেম্পানির বীজের উপর। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। রাসায়নিক সার বিষের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। নিরাপদ খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে।’


এলাকার কৃষকরা জানান, কাউন দিয়ে ভাপা পিঠা, চেতু পিঠা, পায়েশ, খির, খিচুরী জাউ রান্না করে খাওয়া যায়। সাধারণত অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে কাউন বপন করলে ভালো ফলন আশা করা যায়। অনেক কৃষক ফাল্গুন মাসে বপন করেন। বেলে দোআঁশ মাটিতে কাউন ভালো হয়। ৩৩ শতক জমিতে এক কেজি বীজ বপন করতে লাগে। প্রতিবিঘা জমিতে ভালো ফলন হলে ৬/৭ মণ কাউন হয়। প্রতি মণ কাউনের বর্তমান বাজারমূল্য ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। এলাকার কৃষকরা জানান, যেসব এলাকায় সেচের ব্যবস্থা নাই, সেখানে কাউন, গম, পায়রা, অন্যান্য রবিশষ্য পাশাপাশি কাউন চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।


সম্প্রতি হরিরামপুর চরাঞ্চলে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে নটাখোলা গ্রামে কাউন চাষ সম্প্রসারণে মাঠ দিবসের অনুষ্ঠিত হয়। মাঠ দিবসে এলাকার ৩০ জন কৃষক অংশগ্রহণ করেন। মাঠ দিবসে অভিজ্ঞ কৃষক কাউন চাষি এরশাদ আলী কাউন চাষের পদ্ধতি, বীজ সংরক্ষণ এবং খাবার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা করেন। যাতে আগামী মৌসুমে কৃষক কাউন চাষ হরিরামপুর চরাঞ্চলে আরো সম্প্রসারিত হয় । নিজ গ্রাম এবং আশে পাশের গ্রামের কৃষকদের কাউনের বীজ দিয়ে সহযোগিতা করবেন। আলোচনা শেষে মাঠে গিয়ে সরাসরি কৃষক অভিজ্ঞতা নেন। এ সময় বারসিক কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান ও মুকতার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।


বারসিক হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলে বৈত্র্যিময় কৃষি ফসল চাষ কৃষখ পর্যায়ে সম্প্রাসারণে স্থানীয় জাতের তিল, কাউন, গম পায়রা, সরিষা, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে। কৃষক-কৃষাণী, ছাত্র-যুবক ও অভিজ্ঞ কৃষকদের নিয়ে গ্রাম পর্যায়ে আলোচনা, তথ্য আদান-প্রদান, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর, খাদ্য উৎসব, বীজ মেলার আয়োজনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা করে যাচ্ছে।

happy wheels 2

Comments