সাম্প্রতিক পোস্ট

আদর্শের বুলি দিয়ে পেট চলে না..!

সিংগাইর, মানিকগঞ্জ থেকে শিমুল বিশ্বাস

‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা, দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।’ আবার দেশের সরকার ও বলে ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’ কিন্তু বর্তমান সময়ের কৃষক অন্যসুরে কথা বলছেন। তারা মনে করছেন, ‘আজ যারা কৃষক তারাই শুধূ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

সম্প্রতি মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায় বায়রা ইউনিয়ন কৃষক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে এমন কথাই শোনা গেল কৃষক নেতা রোকেয়া বেগমের মুখে। সম্মেলনের আলোচনা সভায় তিনি আরো তুলে ধরেন যে, আজ ফসলের দাম নাই, সার, ঔষধ কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি নষ্ট হচ্ছে, সংকট দেখা দিয়েছে নিরাপদ খাদ্যের। অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে পানির ধারাবাহিক প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ায় কৃষি জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ব্যাহত হচ্ছে ফসলের প্রকৃত উৎপাদন। তাই তিনি সকল কৃষক ভাইদের কাছে জৈব কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করে বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের সুপারিশ করেন। সেই সাথে স্থানীয় সরকার ও সরকারি প্রশাসনের নিকট কালভার্ট স্থাপন, স্থানীয় পর্যায়ে ফসলের স্থায়ী ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন ও ভুমিহীন কৃষকদের পেনশন স্কীম নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

IMG_20190912_121209
শুধু রোকেয়া বেগম নয় কৃষি ও প্রতিবেশ রক্ষার দাবি জানান নয়াবাড়ি গ্রামের প্রকৃতি প্রেমিক কৃষক ইব্রাহিম মিয়া, স্থানীয় বৈচিত্র্যময় ধান জাত গবেষক কৃষক মোজাম্মেল হক, বায়রা ইউনিয়ন কৃষি উন্নয়ন কমিটির কোষাধ্যক্ষ ইমান আলী। আলোচনায় কৃষক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ‘কৃষকের অলসতার কারণে কৃষক আজ ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ অধিকাংশ কৃষক আজ বাজার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অথচ একটু কষ্টকরে নিজের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আমরা বীজ সংরক্ষণ, সার ও জৈব বালাইনাশক তৈরি করতে পারি, যা ফসলের উৎপাদন খরচ কমাতে সহায়তা করবে।’ অন্যদিকে কৃষক ইমান আলী উল্লেখ করেন যে “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে” এ আদর্শের বুলি দিয়ে পেট চলে না। তাই তিনি বাংলার কৃষককে বাাঁচাতে ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান।

কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একাত্মতা প্রকাশ করে বায়রা কৃষি উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক আয়োজিত কৃষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন সিংগাইর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শান্তা ইসলাম, বায়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আ: হালিম, বারসিক’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায়, প্রোগ্রাম অফিসার শিমুল বিশ্বাস এবং সহযোগি কর্মসূচি কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান, বিউটি সরকার, শারমিন আক্তার, গাজী শাহাদাৎ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা বৃন্দ।

IMG_20190912_123341
আ: হালিম দেশের জন্য কৃষকের অবদানের কথা স্বীকার করেন এবং কৃষকরে উন্নয়নে বিনা সুদে কৃষি ঋণের সুপারিশ করেন। কৃষকের অবদানের কথা স্বীকার করেন অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মেহেরুন্নেছা। তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকার কৃষকের উন্নয়নে যথেষ্ট আন্তরিক। তবে অপর্যাপ্ত বরাদ্দের কারণে অনেক সময় কৃষক অষন্তোষ প্রকাশ করে। তাই কৃষি উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বারসিক দীর্ঘদিন ধরে সিংগাইর তথা মানিকগঞ্জ এলাকার প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়কের ভুমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে কর্ম এলাকায় প্রান্তিক কৃষককে একত্রিত করে তাদের সাংগাঠনিক জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়ন, বিভিন্ন সেবা সহযোগিতা প্রাপ্তিতে অভিগম্যতাসহ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের সহায়তা প্রদানে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছে। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গড়ে তুলতে সহায়তা করা হয়েছে গ্রাম সংগঠন, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা কৃষি উন্নয়ন কমিটিসহ ৪ স্তরের এ্যাডভোকেসী প্লাটফর্ম। যে প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের অধিকারের ভাষা মাঠ পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার নিয়মিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বিভিন্ন দাবি।

IMG_20190912_130152

ইতিমধ্যে সংগঠিত কৃষকের দাবিতে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, ধলেশ্বরী নদীতে অবৈধ্য স্থাপনা বন্ধকরণ, প্রকৃত কৃষকের নিকট থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয়সহ বেশ কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া এলাকায় সংগঠিত কৃষক ইতিমধ্যে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন। সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে জৈব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে। তবে বায়রা ইউনিয়ন কৃষি উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ফরহাদ হোসেনের মন্তব্য অবহেলিত কৃষকরে সমস্যা দূর করতে কৃষকদের আরো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে নিজেদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ। মাঠ থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত গড়ে তুলতে হবে জোড়ালো আন্দোলন। মূলত সংগঠিত কৃষকই পারবে তাদের নিজস্ব সমস্যা নিরসন করতে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: