সাম্প্রতিক পোস্ট

শ্রমজীবী নারীদের জীবন সংগ্রাম

শ্রমজীবী নারীদের জীবন সংগ্রাম

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

মাজেদা খাতুনের বয়স ৫৫ বছর। স্বামী নবীর উদ্দিন মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর পূর্বে। বাড়ি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার অষ্টমনিষা গ্রামে। এক ছেলে তার। নাম রফিকুল ইসলাম। কৃষি কাজ করেন। রফিকুলের এক ছেলে এক মেয়ে। মোট পাঁচ জনের সংসারের ঘানি টানতে রফিকুলকে অনেক বেগ পেতে হয়। তাই একটু ভালোভাবে চলতে পড়তে খেতে বৃদ্ধ বয়সেও ইটের ভাটায় কাজ করতে হচ্ছে মাজেদা খাতুনকে।

৫০ বছর বয়ষ্ক আসমা খাতুনের স্বামীর নাম আতার আলী। বাড়ি ভাঙ্গুড়ার অষ্টমনিষা গ্রামে। বৃদ্ধ স্বামী আতার আলী কাজ কর্ম করতে পারেন না। ছাইদুল নামক এক ছেলে ছিল আসমার। সেও কয়েক বছর আগে মারা গেছে। ছাইদুলের বিধবা স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়েসহ পাঁচজনের পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব এখন আসমার কাঁধে। তাই কাজ না করে তো উপায় নেই।

nari-1

ভাঙ্গুড়া উপজেলার শাহানগর গ্রামের দুলি খাতুনের বয়স ৪৮ বছর। স্বামী ওসমান আলী খাল বিলে মাছ ধরেন। দুই মেয়ে এক ছেলে দুলি খাতুনের। এর মধ্যে এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অপর মেয়ে, ছেলে ও তারা স্বামী স্ত্রী মিলে চারজন। এ ছাড়া তার মা অবিবাহিত এক বোন ও স্বামী পরিত্যক্ত অপর বোন এ তিন জন ও দুলি খাতুন ও তার স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল। মোট ৭ জনের সংসারের ভার বইতে স্বামীকে খুবই কষ্ট করতে হয় বলে দুলি খাতুন নিজে ও ইটের ভাটায় শ্রমিকের কাজ করছেন।

ছয় বছর যাবত ইটের ভাটায় কাজ করেন শাহানগরের ইয়াকুব আলীর স্ত্রী আনোয়ারা খাতুন (৪৭)। স্বামী কৃষি শ্রমিক। বড় মেয়েকে কাশিনাথপুরে বিয়ে দেন তিনি। স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে জামাই পলায়ন করে। মেয়েকে দেখাশুনা করার মত মেয়ের খরচ জোগাবার মতো আর কেউ না থাকায় মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন আনোয়ারা। ছেলে আশিক অষ্টমনিষা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র। স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়ে স্কুল পড়–য়া ছেলে ও তারা স্বামী স্ত্রী এ চারজন এক অন্নে বসবাস করছেন। স্বামীর বয়স হয়েছে। হারিয়ে ফেলেছে কর্মশক্তি। সব সময় কাজ পান না। বসে থাকলে তো কেউ খেতে পরতে দেয় না। ছেলের স্কুলের খরচ রয়েছে। সব কিছু কিনতে হয়। বাধ্য হয়ে তাই আনোয়ারাকে কাজ করতে হয় ইটের ভাটায়।

nari-2

অষ্টমনিষা গ্রামের বাচ্চু শেখের স্ত্রী আনেছা খাতুনের বয়স ৪৫ বছর। দুই বছর ধরে কাজ করেন ইটের ভাটায়। কোন জমা জমি নেই। সরকারি ৫ শতক খাস জমি পেয়েছেন। স্বামী লিভার জন্ডিসে আক্রান্ত। আনেছা নিজেও প্যারালাইসিসে ভূগেছেন অনেক দিন। এখন একটু ভালো। সংসার চালানোর জন্য তাই তাকে কাজে আসতে হয় প্রতিদিন।

একই গ্রামের মৃত ছবু মোল্লার মেয়ে আনোয়ারা (২) এর বয়স চল্লিশের কোঠায়। আগে ধানের মিল চাতালে কাজ করলেও গত ৭ বছর ধরে কাজ করছেন ইটের ভাটায়। পাশর্^বর্তী হরিহরপুর গ্রামে বাস করতেন স্বামী আব্দুল কুদ্দুসকে নিয়ে। হঠাৎ ঝড় আসে জীবনে। সামান্য জমি ছিল স্বামীর। তা বিক্রি করে স্বামী কুদ্দুস জমি বিক্রির ১০ লাখ টাকা নিয়ে সাত-আট বছর আগে বিউটি নামক এক মহিলাকে দ্বিতীয় বিবাহ করে চাটমোহরের গুনাইগাছা এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এখনো তাকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। বাধ্য হয়ে নিজের পেটের ভাত কাপড়ের জন্যই ইটের ভাটায় কাজ করতে হয় আনোয়ারা (২) কে।

সালেহার বয়স ৩৫ বছর। স্বামী আহম্মদ আলী পেশায় একজন ভ্যান চালক। পাশাপাশি কৃষি শ্রমিকও। ৫ কাঠা বসতবাড়ি ছাড়া অন্য কোন জায়গা জমি নেই। ২ মেয়ে তাদের। স্বামীর পক্ষে একা পরিবারের ৪ জনের ভরণ পোষণ কষ্টদায়ক হওয়ায় স্বামীকে সহায়তা করতে ভাটা শ্রমিকের কাজ করছেন তিনি।

অষ্টমনিষার বৃদ্ধ আবুল হোসেনের স্ত্রী ফিরোজা। স্বামী কাজ করতে পারে না। ছেলে ফিরোজ শাহনূর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরে। ছেলে ও স্বামীর ভরণ পোষণের দায়িত্ব এখন ফিরোজার কাঁধে। তাই নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁকে কাজ করতে হয় ইটের ভাটায়।

nari 3

চাটমোহরের চরপাড়া গ্রামের সাহালম সরকারের স্ত্রী নাজমা খাতুনের বয়স (৩৫)। স্বামী ভ্যান চালক। তিন মেয়ে সন্তানের এ জননী বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুটি মেয়ে ও স্বামী এ চার জনের পরিবারের ভরণ পোষণে স্বামীকে সহায়তা করতে ভাটা শ্রমিকের কাজ পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন নাজমা। একটু ভালোভাবে চলতে তার এ প্রচেষ্টা বলে জানান তিনি।

এটি নারী শ্রমের একটি খন্ড চিত্র। এরা সকলেই পাবনার চাটমোহরের ভাঙ্গুড়া উপজেলার শাহানগর ও অষ্টমনিষা গ্রামের মধ্যবর্তী একটি ইটের ভাটায় কাজ করেন। প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। বাড়ির রান্না বান্না করে বেরিয়ে পড়েন কর্মক্ষেত্রে। সাড়ে ৬ টায় কাজ শুরু করে প্রায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করতে হয় এদের। ভাগ্যের চাকা জীবনের চাকা সচল রাখতে পরিবারকে সহায়তা করতে কেউ নিজের পেটের ভাতের চিন্তায় বাধ্য হন কাজ করতে। কয়লা ভাঙানো, রাবিস ফেলা, মাটিসহ ভাটার পরিত্যক্ত অন্যান্য জিনিসপত্র বহন করতে হয় এদের। বিনিময়ে দৈনিকের পারিশ্রমিক জোটে ১শ’ ৫০ টাকা। পুরুষ শ্রমিক একই সময় কাজ করে প্রায় তাদের দ্বিগুণ টাকা পান। এতেও কোন প্রতিবাদ নেই তাদের। জীবনের চাকা সচল রাখতে এমন হাজারো নারীর শ্রম ঘামের সাথে যুক্ত ইটের তৈরি ঘর বাড়িতে বসবাস করি আমরা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: