Posted in

কান্না ছাড়াই রান্না

রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম শহিদ

‘কান্না ছাড়াই রান্না হয়’ এমনই কথা জানান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল গ্রামের নারী মর্জিনা বেগম (৪০)। বাইশ বছর ধরে সাধারণ চুলায় রান্না করে পরিবারের খাবার তৈরি করে আসছেন তিনি। চুলা ধরানোর সময় প্রথমেই চোখে ধোঁয়া লেগে চোখ বন্ধ হয়ে আসে ও পানি ঝরে। চুলা নিভে গেলে মুখের ফু দিয়েই পুনরায় চুলা ধরানোর জন্য চেষ্টা করেন। তখন নাকে মুখে ধোঁয়া লেগে কাশিসহ চোখে পানি আসে। এ কাজটি হরহামেশা সকল নারীদেরকেই করতে হয়। তাই এই সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য নিজে শিখেছেন পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরির কাজ। সাধারণ চুলার পরিবর্তে নিজেই তৈরি করেছেন পরিবেশবান্ধব চুলা। ফলে এখন তাঁর কান্না ছাড়াই রান্না হয় ।

IMG_20180313_111106
প্রতিদিন ২-৩ বার চুলাতে যেতেই হয়। গ্রামের সকল নারীর ক্ষেত্রে ইচ্ছে না থাকলেও এ কাজটি নিরবে করে যেতে হয় তাদের। কারণ আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা এ কাজটি ভাগ করে নারীর উপর অর্পিত করেছে। আর সেই কারণে যুগ যুগ ধরে নারীরা রান্নার কাজটি স্বযত্নে করে যাচ্ছেন। নারীরা সাধারণ চুলায় রান্না করলো, নাকি পরিবেশবান্ধব চুলাতে রান্না করলো, জ্বালানি ভেজা নাকি শুকনা, তা যেন আমাদের পুরুষদের অনেক সময় দেখার প্রয়োজন মনে করিনা। একদিনের রান্না করতে আমার মা, স্ত্রী ও বোনের চোখের কতটুকু অশ্রুজল ঝরাতে হলো তা পরিমাপ করার প্রয়োজনবোধ আমরা কম করে থাকি। তাদের কাছে শুধু চাই তিন বেলা সময় মত খাবার যেন প্লেটে আসে। প্রতিদিন যাদের আগুন নিয়ে খেলা তাই বাড়িতে অগ্নিকান্ড ঘটলে অধিকাংশ দায় পড়ে নারীর উপরেই।

IMG_20180318_112315
রিশিকুল গ্রামের লাভলি বেগম বলেন, “সাধারণ চুলা ব্যবহারে শুধু চোখের পানি ঝরেনা। তার সাথে বাড়ি নোংরা হয়। হাড়িপাতিলে কালি লাগে, বাড়ি ঘরে আগুন লাগার ভয় বেশি থাকে, আমাদের পরনের কাপড় ময়লা হয়। এতে করে সাবানও বেশি ব্যবহার করতে হয়। ফলে সাবানের জন্য খরচ করতে হয় বাড়তি টাকা। আমি পাইব চুলার কথা শুনেছিলাম কিন্তু আমাদের এলাকায় প্রচলন না থাকায় আমার ইচ্ছা পূরুণ করতে পারিনি এতদিন। আজ আমার গ্রামের ‘স্বপ্নের ভেলা’ সংগঠনের তরুণরা আমার সেই ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করলেন।”

IMG_20180409_140416
‘রিশিকুল স্বপ্নের ভেলা’ সংগঠনটির সভাপতি সোহেল আরমান বলেন, “রিশিকুল গ্রামে আমাদের সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে ২০১টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করি। তথ্যে দেখা গেছে, সেখানে ৩টি পরিবার সিমেন্টের তৈরি ও একটি পরিবার মাটির তৈরি পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার করেন। সিমেন্ট বালির চুলা গুলো আগে থেকেই তৈরি করাই ছিল, তাই পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী ছোট বড় করার কোন সুযোগ নেই। অনেকের পরিবারে সদস্য সংখ্যা কম তার প্রয়োজন হয় একটু ছোট চুলা।” তিনি আরও বলেন, “আবার অনেক পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি তাদের চুলাটি বড় প্রয়োজন। কিন্তু সেই চাহিদা নারীদের অপুরণীয় থেকে যায়। নারীদের এই প্রত্যাশা থেকেই আমরা বারসিক‘এর সাথে আলোচনার মাধ্যমে এক সময় পরিবেশবান্ধব চুলা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করি। কর্মশালায় তানোর উপজেলার জয়ীতাপ্রাপ্ত নারী কবুলজান সহায়তা করেছিলেন। যার ফলে নারীরা নিজে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি শিখে নিজের পরিবারের প্রয়োজন মত ছোট বড় চুলা তৈরি করার পথ বের করেন।”

IMG_20180411_115958
সাধারণ চুলাতে তুলনামূলকভাবে বেশি ধোঁয়া ছড়ায়। সেই ধোঁয়া জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে প্রতিনিয়ত। নারীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে রিশিকুল গ্রামকে শতভাগ পরিবেশবান্ধব চুলা গ্রাম করতে চায় সংগঠনটি। যার মাধ্যমে কিছুটা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে বলে সংগঠনটি মনে করে।

সহায়তা আদান প্রদানের মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ও যেতে চাই। পৃথিবী, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার আমার নয়, আমাদের। তাই রক্ষা করা আর ভালো রাখার দায়িত্ব সকলের।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.