সাম্প্রতিক পোস্ট

মৌসুম আসে স্বপ্ন সাজায়

রাজশাহী থেকে মো. জাহিদ আলী

মানুষ বাঁচে তার কর্মের মাঝে। প্রবাদ আছে ‘জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো’। কর্ম মানুষের পরিচয় বহন করে। হোক সেটা জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ। পুরুষ শাসিত সমাজে নি¤œমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমকে যথাযথভাবে মর্যাদা না পেলেও আদিবাসী সম্প্রদায়ে নারীর শ্রম অবধারিত একটি বিষয়। এটা যেন চিরন্তন সত্য হয়ে গেছে, নারী বিয়ের আগে বাবার বাড়িতে এবং বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে শ্রম বিক্রি করতে হবে। এই প্রেক্ষাপট আদিবাসী পরিবারগুলোতে নারীর নিয়তিতে পরিণত হয়েছে।

সমতল আদিবাসীর একটি বড় অংশের বসবাস রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর, দেওপাড়া ও গোগ্রাম ইউনিয়নে। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি সহজলতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিকাংশ জমি কৃষি আবাদের আওতায় আসে। কৃষি শ্রম হিসাবে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমকে গৃহস্থ কৃষকরা বেশি প্রাধান্য দেয়। কারণ হিসাবে জানা যায়, নারী শ্রম পুরুষের তুলনায় কম মুল্যে পাওয়া যায়। ভুমি গঠনের ভিন্নতার কারণে আমন মৌসুমে ধান ও বোরো মৌসুমে রবি শস্যের পাশাপাশি টমেটো চাষ এই এলাকায় বেশি হয়। আমন ও বোরোর ধান এবং টমেটুর পরিচর্যার জন্য নারী শ্রমিকের কদর এই এলাকায় বেশি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রান্তিক পরিবারগুলোতে নারী শ্রমিকরা আমন ও বোরো মৌসুমে ধান লাগানো, কাটা ও মাড়াই বাবদ বছরের প্রায় ৬ মাস ব্যস্ত সময় পার করেন। টানাপোড়নের সংসারে বাড়তি আয় নারীদের বাড়তি স্বপ্ন দেখতে শেখায়। কেউ টাকা যোগাড় করে ঘর ঠিক করে, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য আবার কারো টাকা ব্যয় হয় সারাবছর ঋণের পরিশোধ দিতে। আমরা তিনজন নারী স্বপ্নের কথা জানব। যারা চলতি আমন মৌসুমে নিরন্তর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাদের স্বপ্নগুলোকে সার্থক করার জন্য।

১.
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গুনিগ্রামে নামক গ্রামে বসবাস শ্রমিক নমিতা বারোয়ারের। বছর খানেক আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। সংসারে রয়েছে দুটি ছেলে একটি ৮ম শ্রেণীতে ও অন্যজন ৫ম শ্রেণীতে লেখাপড়া করে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল ছেলে ২টিকে ভালোভাবে লেখাপড়া শেখাবেন। সেই স্বপ্নের কারিগর হিসাবে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন নমিতা। আমন মৌসুমে ধানের আবাদ বেশি হয়। দম ফেলার সময় নেই নমিতার। তিনি বলেন, “বৈশাখ মাসে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, ঘরের নতুন টিন কিনেছি, বড় ছেলেটার জেএসসি পরিক্ষার ফিস দিছি, এখন প্রতিদিন কাজ না করলে লোন শোধ দিব কি করে।”

38834092_10209385569996595_1918156171332550656_o

২.
কৃষাণী রুমেলা টপ্প’র সংসারের সদস্য সংখ্যা ৬জন, স¦ামী-স্ত্রী তিন ছেলেমেয়ে ও শাশুড়ী। স্বামী গ্রোগাম ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ। স্বামীর যা আয় তা দিয়ে ৬ জনের সংসারে টানাপোড়ন লেগেই থাকে। অগত্যা তাকে অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। বছরব্যাপি অনের জমিতে কাজ করলেও আমন মৌসুমে পারিশ্রমিক একটু বেশি পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হয়। বৃষ্টিরপাতের পরিমাণ বেশি হলে গৃহস্থরা ধান লাগানোর চাহিদা বাড়ে সেই সাথে বাড়ে শ্রমের মূল্য। বছরের অন্য সময় ২২০ থেকে ২৫০ এর মধ্যে পারিশ্রমিক থাকলেও এই সময় ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে রুমেলা বলেন, “বর্ষার আগে বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। ধার কর্য করে বাড়ি মেরামত করেছি। এখন একটি দিনও বেকার বসে থাকলে চলবে না। তাই এই মৌসুমে যত বেশি কাজ পাওয়া যায় সংসারের জন্য তত ভালো হবে।”

DSC05477

৩.
“স্বামীর বাড়ির সম্পত্তি বলতে কিছুই পাইনি। বিয়ের পর থেকেই মায়ের বাড়িতে আছি। আশা আছে এইবার ১ কাঠা জমি কিনব। এনজিও থেকে ঋণও নিয়েছি। নিজের বাড়ি হবে এই আশায় স্বামী স্ত্রী দুজনেই কাজ করে যাচ্ছি।” এভাবেই মনের ভিতর লুকায়িত স্বপ্নের কথাগুলো বলছিলেন এক সন্তানের জননী চিনতি কুজুর। গুনিগ্রাম গ্রামে বসবাসকারী এই দম্পতির একটি দুই বছরের মেয়ে আছে। চিনতি তার বাবার বাড়িতে থাকতে চান না। তাদের নিজেদের একটি বাড়ি হবে। সেই লক্ষ্যে কিছু কিছু করে টাকা জমিয়ে ছিলেন। এইবার নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখছেন চিনতি দম্পতি।

DSC05488
নমিতা, রুমেলা ও চিনতি’র মত আদিবাসী পরিবারগুলোর অধিকাংশ নারী বছরব্যাপি কৃষি কাজের সাথে যুক্ত থাকেন। সংসারের টানাপোড়ন ও একটু ভালো থাকার প্রচেষ্টায় এ সকল নারী মৌসুমভিত্তিক সময়গুলো কাজে লাগিয়ে তাদের কল্পিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দান করেন। আমরা এই সকল খাদ্য যোদ্ধাদের স্যালুট জানায়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: