Posted in

নারীর ক্ষমতায়নে মানবতার উন্নয়ন

:: ঢাকা থেকে ফেরদৌসি রিতা::

দৃশ্যপট-১

‘বাংলাদেশের বিমান বাহিনীতে এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিমান নিয়ে আকাশে উড়েছেন দুজন নারী বিমান-সেনা পাইলট নাইমা হক আর তামান্না ই লুতফী।’ ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ হয়েছে সাবিনা খাতুনের। মালদ্বীপের পথে এখন সাতক্ষীরার মেয়ে সাবিনা খাতুন।’ ‘ব্রাভো, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াস করে দিলো বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল।’ ‘বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিডব্লিউসিসিআই)-এর বর্তমান সভাপতি সঙ্গীতা আহমেদ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।’ ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রি নেয়া কামরুন আহমেদ একেবারেই নিজের আগ্রহে গড়ে তুলেছেন একটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান।’ ‘নিশাত মজুমদার যিনি প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন। নিশাত মজুমদার সর্বোচ্চ ৭২০০ মিটার আরোহণের মাইল ফলক স্থাপন করেছেন। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের আরো একজন নারী ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করলেন ।’ এই সংবাদগুলো সবই প্রকাশিত এবং বাংলাদেশের বুকে হাজারো নারীর মেধা, দক্ষতা, জ্ঞান, উদ্ভাবন, সম্ভাবনাকে প্রতিফলিত করে। আমরা এমনই এক সম্ভাবনাময় দেশের নারীরা……

দৃশ্যপট-২

দৃশ্যপট-এক ঘুরে আমরা দেখলাম আমাদের দেশের মেয়েরা তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশের নামটি উজ্জ্ল করে তুলছে বিশ্বের মাটিতে। এখানে আরো অনেকের নাম আছে যারা অবদান রেখে যাচ্ছে উন্নয়নে। নারীর ক্ষমতায়নের ভেতর দিয়ে আমরা মানবতার উন্নয়ন দেখার স্বপ্ন দেখি। এই স্বপ্নকে ধারণ করেই লড়াই সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো। সেই লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আজ ‘আন্তর্জাতিক মহল মানবতার উন্নয়নেই যে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব সেই কথাটি উপলব্ধি করতে পারছে।

ক্ষমতায়ন শব্দটির আপেক্ষিক অর্থ ব্যক্তির অবস্থান। যখন কোনো ব্যক্তির অবস্থানের পরিবর্তন হয় তখন বোঝা যায় তিনি ক্ষমতায়িত হয়েছেন। কিন্তু যে সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা প্রবাহিত হচ্ছি সে সময়ে গোটা বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। নারীর পণ্যায়ন, ভোগবাদ, বেকারত্ব, শ্রমিক ছাটাই, কৃষকের আত্মহত্যা, খুন-ছিনতাই নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

পৃথিবীর বেশিরভাগ সম্পদের মালিক হচ্ছে এক ভাগ মানুষ যারা গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই দৈন্যদশার মধ্য দিয়ে আমাদের ৮০ ভাগ বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্ট শ্রমিকদের সিংহভাগ নারী। যদিও এখানে তারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ তাদের নেই ন্যুনতম মজুরি, নেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নেই মাতৃত্বকালীন ছুটি। প্রায় ২০ লাখের বেশি শ্রমিক গৃহকর্মে ১২-১৬ ঘন্টা শ্রম দেয়। চা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকদেরও একই অবস্থা। সম্পত্তিতে নারীদের সমঅধিকার নিশ্চিত হয়নি এখনো। গার্হস্থ্য শ্রম এখনো পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত নয়। নারী নির্যাতন-পাচার, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌতুকের কারণে হত্যা, অশ্লীল ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে ব্ল্যাকমেইল এরূপ অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিদিন। প্রতিবছর এদেশ থেকে ৪০/৫০ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে।

নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নারী বিশ্বের দরবারে তার কাজের ছাপ ফেলছে অপরদিকে সে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। এ থেকে মুক্তির পথ কি? নারী দিবসের চেতনার মধ্যে নিহিত রয়েছে নারীর সকল ধরণের শোষণ নিপীড়ন হতে মুক্তির পথ। নারীরা সেদিন শ্রমঘন্টা কমানো, কর্মপরিবেশ তৈরি, ন্যায্য মজুরি, ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। এই সকল স্বপ্ন পূরণ হবে সমাজ পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। কারণ কিছু দাবি পূরণ হলেই নারীরা সত্যিকার অর্থে মুক্তির স্বাদ পাবে না। ৮ মার্চের স্বপ্ন আজোও তাই অপূরণীয় হয়ে আছে। সমাজতান্ত্রিক নেত্রী আলেকজান্দ্রা কেলোনতাই এর ভাষায়, ‘আইনের মাধ্যমে মা ও শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য শুধুমাত্র সাংবিধানিক লড়ায়ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হলো সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন। আজ যারা ক্ষমতায়নের নামে বিভিন্নভাবে নারীকে উপস্থাপনে ব্যবহার করছে তাদের কাছে ক্ষমতায়নের থেকেও নারীর পণ্যায়িত উপস্থাপনে আগ্রহ বেশি। সেকারণেই নারীকে তার নিজস্ব যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এই এগিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন ঘটবে দৃশ্যপট একের মতোন করে। আমরা আশাবাদী নারী ক্ষমতায়িত হবে তার নিজস্ব কর্মদক্ষতায়-মেধায়। আর এর মধ্য দিয়ে প্রজ্জ্বলিত হবে মানবিকতার বিজয় নিশান।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.