Posted in

দৃঢ়তা ও ঐক্যের বন্ধন তৈরিতে কালাসোনা চর তরুণ নাট্যদল

:: গাইবান্ধা থেকে আমিরন নেছা ও শহিদুল ইসলাম

Untitlfbded“এ পর্যন্ত তিনবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছি, আমার সাথে আরো যারা আছেন তারা কেউ কেউ এর থেকেও বেশি নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। জমা-জমি হারিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন খানে বসত গড়েছি। তবুও আমরা খুব পাশাপাশি আছি, বিভিন্ন উৎসব আর সমস্যায় আমরা একত্রিত হই। আমাদের সংগঠনের (কালাসোনা কৃষক সংগঠন) কোন সভা বা কোন যৌথ কাজ থাকলে আমরা একত্রিত হই, নিজেদের সম্পর্ক এবং সহায়তা অটুট রেখেছে আমাদের সংগঠনটি। এর মাধ্যমেই আমরা হাটি হাটি পা পা করে তৈরি করেছি কালাসোনাচর নাট্য দলটি। কাবিলপুর চর, কালাসেনার চর, উড়িয়ার কিছু তরুণদের নিয়ে আমরা একটি নাট্য দল তৈরি করেছি, শত সংকট আর সমস্যার মধ্যেও আমরা এই নাটকের মধ্যে দিয়ে নানা ধরনের সচেনতামূলক বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি।” কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনা চর কৃষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও চর যুব গ্রুপের আহবায়ক মো. শফি আলম।

২০১০ সালের কথা, সেসময় কালাসোনার চরে প্রচুর পটলের চাষ হতো। একই সাথে নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করতো কৃষকরা। মাটির গুণাগুণের কারণেই যে ভূমির নামকরণ হয়েছিলো কালাসোনা, সেখানে তো ভালো ফসল ফলারই কথা। কিন্তু দালালদের কারণে কৃষকরা তাদের কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য পেতো না। ফসলের ন্যায্য মূল্য আদায়ের জন্য কৃষকরা নিজেরা দলবদ্ধ হয়ে শহর এবং রাজধানীতে পটলসহ নানা কৃষিপণ্য বাজারজাতের সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে নিজেদের কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠন সংগঠন তৈরি হয় কালাসোনার চরে। চরের মাটি এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে চর উপযোগী শস্য ফসল রক্ষা ও বীজ সমস্যা সমাধানে তাঁরা বেসরকারী উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক’র সহায়ক ভূমিকায় ২০১৩ সালে একটি চর বীজ ব্যাংক স্থাপন করেন।
নিজেদের পণ্য বেচাকেনার লক্ষ্যে সংগঠনটি তৈরি হলেও দিনে দিনে তারা সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চরের কৃষকসহ তরুণ, শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষের সমন্বয়ে সংগঠনটি পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এভাবে তরুণদের মাধ্যমে একটি চর স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপও গড়ে ওঠে। চর যুব স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপটি চরের মানুষের নানা সমস্যা সমাধানে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। একই সাথে সামাজিক অসংগতি, অধিকার, নারীর অধিকার, বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে নানা ধরনের সচেনতামূলক কাজ করে থাকেন। এরই অংশ হিসেবে কালাসোনাচর, কাবিলপুর চর এবং উড়িয়া চরের যুবকসহ সকলের সমন্বয়ে একটি চর নাট্য দল গঠন করেন তরুণরা।

Untitlfbddfedনাট্যদল গঠন সম্পর্কে নাট্যদলের কর্ণধার এবং কৃষক সংগঠনের মো. শফি আলম বলেন, “দিনে দিনে চরের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, চরে কাশবন না থাকার কারণে চরগুলো বেশি দিন টিকেও থাকছে না, সহজেই ভাঙনের শিকার হচ্ছে। চর যেমন দিনে দিনে আরো ক্ষণস্থায়ী হচ্ছে তেমনি চর নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচিও ক্ষণস্থায়ী হচ্ছে। বার বার চরে ভেঙে যাবার কারণে এখানে মানুষগুলো বেশি দিন সংগঠিত হতে পাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, “তাই আমরা ভেবে দেখেছি এমন কিছু করা দরকার যার মাধ্যমে আমরা যেন অন্তত একত্রিত হয়ে থাকতে পারি। হয়তো এ চর বা আরেক চরে থাকবো কিন্তু সেটাকে লক্ষ্য করেই যেন আমরা এক হতে পারি। এর ফলেই আমরা ভেবে-চিন্তে কালাসোনার চর নাট্য দলটি আরো শক্তিশালী করেছি, একই সাথে আমরা বিভিন্ন চরে স্থান্তরিত হলেও বীজের জন্যে আমরা বীজ ব্যাংকে এসে বীজ সংগ্রহ করি, নিজেদের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা পরামর্শ করে থাকি।”

নাট্যদলের পরিবেশনা নিয়ে দলটির নারী সদস্য কামরুন্নাহার বলেন, “আমাদের নাটক দেখে অনেকে পছন্দ করে এখন আমাদের ভাড়া করে নিয়ে যায় বিভিন্ন জায়গায় নাটক প্রদর্শন করার জন্যে। এর ফলে আমরা আরো নিজেরা সমৃদ্ধ হয়েছি ও সম্মানও পাচ্ছি। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনও আমাদেরকে নাটক প্রদর্শনের জন্যে নিয়ে যায়।” আরেক সদস্য শফি আলম বলেন, “আমরা এ পর্যন্ত গাইবান্ধার চরগুলো ছাড়াও কুড়িগ্রামেরচরসহ মোট ২৩টি চরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে, ইউনিয়ন পরিষদের সেবা পরিসেবাসহ সরকারি-বেসরকারি সেবা এবং নিজেদের জৈব কৃষির সচেনতামূলক নাটক প্রদর্শন করেছি। নিজেদের আয়ের টাকা দিয়ে আমরা বাদ্যযন্ত্র কিনেছি। নাট্যদলের নারী সদস্য কাবিলপুর চরের কামরুন্নাহার (৩৫) বলেন, “চরে নারীদের প্রতি যেরকম কঠোর শাসন তারপরও আমি এই চরের সকলের সহায়তা পেয়েছি বলেই নাটকে অভিনয় করতে পারি। আমার পরিবার কখনো আমাকে মানা করে না, আমাকে সবটাতে সহযোগিতা করেন।” অন্যদিকে নাট্যদলের কারণে তরুণদের ভেতরে সচেতনতা ও জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে আরেক তরুণ সদস্য মো. সাকোয়াত হোসেন বলেন, “লেখাপড়ার পাশাপাশি আমিও এর সাথে থাকতে পেরে অনেক কিছু জানতে পারছি। পাশাপাশি বিভিন্ন চরে যাতায়াতের কারণে চরের সমস্যা সম্পর্কে আরও জানছি। আগামীতে চরের উন্নয়নে আমরা আরো নাটক রচনা করতে পারবো। চরের এই নাটকের দলটি যেন আমরা জাতীয় পর্যায়ে তুলতে ধরতে পারি এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করি আমরা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.