Posted in

শীতের প্রকৃতিতে ফুলের উৎসব

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ থেকে

শীত মানেই নির্জীব প্রকৃতি আর শুধুই জড়তা নয়। শীতের ফুল প্রকৃতিতে আনে প্রাণের ছোঁয়া; যেন ফুলের উৎসবে ভরে উঠে চারিপাশ। কুয়াশার শুভ্র আবরণ ভেদ করে শত ফুল মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় তাদের সৌন্দর্য্যরে উপস্থিতি। বাগান, আঙিনা, ছাদ আর পথের ধার হয়ে উঠে রঙে আর রূপে বর্ণিল।
শীতের ফুলের মধ্যে অন্যতম হল- গোলাপ, কৃষ্ণকলি, গাঁদা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকা, বোতাম, কারনেশন, জিনিয়া, কসমস, পিটুনিয়া, পর্টুলেখা, হলিহক, এস্টার, সুইটপি, ফ্লকস্, ভার্বেনা ইত্যাদি। আমাদের দেশে জন্মালেও শীতের অধিকাংশ ফুলের জন্মস্থান এদেশে নয়। মূলত শীতপ্রধান দেশ থেকে এনে এদেশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফুলের রাণী গোলাপের দেখা মেলে সারাটি বছর, তবে শীত এলে প্রতিটি বাগান ভরে যায় নানা রঙের গোলাপে। রঙ, গন্ধ ও সৌন্দর্য্যরে জন্য গোলাপ ফুল সবার কাছেই প্রিয়। চিরপরিচিত গোলাপি থেকে শুরু করে লাল, সাদা, খয়েরি, কালো রঙের গোলাপেরও দেখা মেলে নানা স্থানে। পৃথিবীতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ প্রজাতির গোলাপ ফুল রয়েছে। এই সমস্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উপ-প্রজাতি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫০টি আলাদা আলাদা গোলাপের অস্তিত্ব রয়েছে পৃথিবীজুড়ে। সৌন্দর্য্য, ভালোবাসার প্রতীক লাল গোলাপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের ধরণ বদলে গেলেও প্রেম নিবেদনের ভাষা হিসেবে লাল গোলাপের আবেদন চিরন্তন। তাই উপহার হিসেবে গোলাপের চাহিদা সবার উপরে। লাল, হলুদ, সাদা, গোলাপি বিভিন্ন রঙের সঙ্গেই বদলে যায় গোলাপের ভাষা, আবেদন। এর ইংরেজি নাম Rose ও বৈজ্ঞানিক নাম  Rosa sp. আমাদের দেশে নানান রঙ ও জাতের গোলাপ ফুল চাষ করা হয়ে থাকে। যেমন-ক্রিমশন গ্লোরি, পাপা-মাইল্যান্ড, টিপটপ, হানিমুন, সানসিল্ক, রোজিনা, গোল্ডেন ইত্যাদি। জাতভেদে গোলাপ ফুলের রঙ, আকৃতি ও গন্ধ ভিন্ন হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এখন ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গোলাপ ফুল চাষ বেশ লাভজনক একটি খাতে পরিণত হয়েছে।

manikgonj-pic-1
শীতকালে সবচে’ বেশি দেখা যায় গাঁদা ফুল। মানিকগঞ্জের প্রায় বাড়ির আঙিনায় দেখা যায় বিভিন্ন রঙ ও প্রজাতির গাঁদা ফুল। কোনোটা ঝলমলে হলুদ, কোনোটা হলদে কমলায় মেশানো, কোনোটা দেখতে একেবারে কমলা রঙের, আবার হলুদ পাপড়ির থোকার মধ্যে খয়েরি রঙের পাপড়িও কিছু রয়েছে। লাল গাঁদাও চোখে পড়ে কখনও কখনও। গাঁদা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম: Tagetes erecta, এটি Asteraceae পরিবারের উদ্ভিদ। এ ফুলের আদিবাস হল মেক্সিকোর গেন্দামেরি এলাকায়। এর ইংরেজি নাম হল মেরিগোল্ড। আর এসব সৌন্দর্য্যরে পাশাপাশি বহু ভেষজ গুণ রয়েছে। আমাদের শরীরে কেটে বা ছিঁড়ে গেলে গাঁদার পাতা বেটে লাগিয়ে দিলে রক্তপড়া বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও ফুলের পাতার রস কানের ব্যথা, চোখের রোগ ও ফোঁড়া পাঁচড়ায় এই ফুল খুব উপকারী।

শীতের বৈচিত্র্যময় ও নজরকাড়া আরেক ফুল ডালিয়া। বিভিন্ন প্রজাতির ডালিয়া রয়েছে। এদের পাপড়ির সৌন্দর্য্য আর চমৎকার বিন্যাস সহজেই মানুষকে মুগ্ধ করে। ফুলের মঞ্জুরির আকার আকৃতি ভেদে ডালিয়ার কমপক্ষে দশটি শ্রেণী রয়েছে। সবুজ আর নীল রঙ ছাড়া অন্য সব রঙেরই ডালিয়া ফুল রয়েছে। এটি বহুবর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম : Dahlia variabilis, এরা Asteraceae পরিবারের উদ্ভিদ। আমাদের উপমহাদেশে এই ফুল এসেছে ১৮৫৭-৬০ এর দিকে।

মানিকগঞ্জে বর্তমানে বাণিজ্যিকভিত্তিক চাষ হয় “চন্দ্রমল্লিকার”। নাম শুনেই বোঝা যায়, মানুষের মনে এ ফুল কতটা জায়গা করে নিয়েছে। শতাধিক প্রজাতির চন্দ্রমল্লিকা রয়েছে। আর এমন কোনো রঙ নেই যা চন্দ্রমল্লিকার প্রজাতিতে নেই। রঙের দিক থেকে এরা অতুলনীয়। আদিবাস চীনে। বাগানের চেয়ে টবে ভালো জন্মে। বীজ, কলম বা কন্দ সব উপায়ে এদের বংশবিস্তার করা যায়। এটি ক্ষুদ্রাকার ঝোপালো উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম : Chrysenthemum sp. এটি Asteraceae পরিবারের উদ্ভিদ। ২৫ সেমি পর্যন্ত বড় হতে পারে। পাতা উপবৃত্তাকৃতির। পত্রফলকের কিনারা করাতের মতো।

শীত মৌসুমের আরেক ফুল কসমস। আদিনিবাস মেক্সিকোতে। তিন-চার ফুট লম্বা সুদৃশ্য চিকন সরু সরু ফালিযুক্ত পাতা বিশিষ্ট এ ফুল গাছটিতে ধরে একক ফুল। প্রজাতি ভেদে এদের রঙে রয়েছে ভিন্নতা। কসমস বর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক নাম :Cosmos bipinnatus, এটি Asteraceae পরিবারের উদ্ভিদ। কসমস অপূর্ব বাহারী শীতকালীন ফুল। পাতা সবুজ এবং বেশ সরু । সাধারণত গাছ ৯০ থেকে ১২০ সেমি. বড় হয়। ফুল সাদা, লাল ও গোলাপী বর্ণের হয়।

গ্যাজানিয়া সাম্প্রতিক সময়ে শীত মৌসুমের জনপ্রিয় ফুল। ফুলটি বহুবর্ষজীবী বীরুৎ হলেও আমাদের দেশে এটি বর্ষজীবী বীরুৎ হিসেবে জনপ্রিয়। বৈজ্ঞানিক নাম :Gayania nivea , এটি Asteraceae  পরিবারের উদ্ভিদ। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিক এই ফুলের চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গাছ ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। এই ফুল অনেকটা সূর্যমুখীর মতো। সাদা, লাল, কমলা, হলুদ রঙের ফুল হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এর বংশবিস্তার আমাদের দেশে বলে জানা গেছে।

কৃষ্ণকলি হল বাংলাদেশের শীত মৌসুমের নিজস্ব ফুল। হাত দেড়েক উঁচু গাছে ছোট ছোট ফুল ফোটে। কোনোটির রঙ সাদা আবার কোনোটির রঙ গোলাপি। বাংলার নিজস্ব প্রজাতির আরেক ফুল হল দশবাইচন্ডী। নামটা বিদঘুটে হলেও ফুলটি দেখতে খুবই সুন্দর। ছোট ছোট গাছের দেহজুড়ে প্রজাপতির মতো দেখতে এক একটি ফুল ফোটে। ফুলের রঙ সাধারণত নীল। তবে হলুদ ও গোলাপি রঙের ফুলও দেখা যায়। তবে দিন দিন এই ফুলগাছ দু’টির সংখ্যা মানিকগঞ্জে আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে।

ষড়ঋতুর দেশে শীত এসেছে, চারদিক বাহারি রঙের ফুটন্ত ফুলেরা পেখম মেলেছে রঙিন পাপড়িতে। ফুলর স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে সারাদেশের ন্যায় মানিকগঞ্জের প্রকৃতিও হয়ে উঠেছে নান্দনিক। শুধু সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও শখের বশেই নয়, শীতের ফুল চাষ বাণিজ্যিকভাবেও বেশ লাভজনক।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.