নিজেদের অধিকার আদায়ে সংঘবদ্ধ নারী সংগঠন

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

photo-4১৬১০ শতকের সময়ে রাজা প্রতাপ আদিত্যের প্রাচীন রাজধানী ধুমঘাট গ্রামের কৃষাণী অল্পনা রাণীর বুদ্ধিমত্তা, আগ্রহ ও নেতৃত্ব বিকাশের মধ্য দিয়ে ধুমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষিপদক প্রাপ্ত কৃষাণী অল্পনা রাণী বিভিন্ন কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ, স্থানীয় জনসংগঠনের উন্নয়নমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নসহ উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কেন্দ্র এর সমন্বিত উদ্যোগে পথচলা প্রভৃতি দেখে নিজ এলাকায় একটি স্থানীয় কৃষি সংগঠন গড়ে তোলার আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেজন্য নিজ এলাকার কৃষক-কৃষাণীদের সাথে সংগঠন গড়ার লক্ষ্যে একক ও দলীয়ভাবে আলোচনাসহ আভ্যন্তরীণ পারস্পারিক মতবিনিময় করেন। অল্পনা রাণীর সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রামের কৃষক-কৃষাণী অনুধাবন করতে পেরেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতে নিজেদের টিকে থাকা তথা এলাকার সামগ্রিক সমস্যা সমাধান ও নিজেদের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নে একটি ঐক্য দরকার। ফলশ্রুতিতে তারা একটি স্থানীয় জনসংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এলাকার হিন্দু মুসলিমসহ সকল পেশার মানুষদের নিয়ে একটি সমন্বিত সভা করেন, যে সভার মধ্য দিয়ে নতুন সংগঠন হিসেবে ২০১৪ সালের ২৭ আগষ্ট ধূমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠন এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।

shaym

শুরু থেকে ধূমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠনটি বিভিন্ন দিবস পালন, আলোচনা, প্রশিক্ষণ, সঞ্চয় জমা, স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদ্ধতিতে বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় সবজি চাষাবাদ, বীজ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, সব ধরনের ঔষধি গাছের বনায়ন, ব্যবহার ও সংরক্ষণ, প্রাণী সম্পদ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, জৈব ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহার, অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং হাজল ও পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলার ব্যবহার ও প্রশিক্ষণে সহায়তা, দুর্যোগকালীন খাদ্য সংকট নিরসনে শুটকি সংরক্ষণ, ব্যবহার ও স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধকরণ, পুকুরে স্থানীয় জাতের মৎস্য চাষ ও সংরক্ষণসহ নানা ধরনের জন উন্নয়নমূখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে।

‘প্রাণ প্রকৃতি সুরক্ষায় সমন্বিত পথচলা’ এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে সমসাময়িক নানারকম উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নকারী সংগঠনের সদস্যবৃন্দ নিজেদের একটি নিদিষ্ট জায়গা ও সংগঠনের নিজস্ব ঘর তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। শুরুতে ঘর নির্মাণের জন্য বারসিক থেকে আংশিক উপকরণ সহযোগিতা নিয়ে নিজেদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ঘর তৈরি করে। পর্যায়ক্রমে সংগঠনের কার্যক্রম ও পরিচিতি বাড়তে থাকে। নিজ এলাকার নারীদের উন্নয়ন তথা সুযোগ সুবিধা ও অধিকার আদায়ে আরো বেশি অগ্রসর হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি পরিসেবা আদায়ে বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ বাড়তে থাকে।
photo-2
সংগঠনের সদস্যবৃন্দ দর্জি কাজ আরিজুরি ও বাটিক-বুটিকসহ কুঠির শিল্পের কাজের প্রশিক্ষণ, সোলার, সংগঠনের ঘরের সংস্কার কাজ ও নিবন্ধন প্রাপ্তি এর জন্য স্থানীয় সংগঠন নকসিকাঁথা, উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা, ইউনিয়ন পরিষদসহ উপজেলা প্রশাসনের সাথে ধারাবাহিক যোগাযোগ, আলোচনা, পরামর্শ ও আবেদন করেন। নিজেদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৮নং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ২টি সেলাই মেশিন ও সিট কাপড়সহ দর্জি কাজের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার বিষয়ে চেয়ারম্যান মহোদয় আশ্বস্ত করেছেন। শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকে সংগঠনে একটি সোলার সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সম্প্রীতি ইউনিয়ন পরিষদ এর মাধ্যমে শ্যামনগর উপজেলা থেকে এডিপির বাজেট হতে ধূমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠন ৫০,০০০/=(পঞ্চাশ হাজার টাকা) টাকা বরাদ্দ পায়। শ্যামনগর উপজেলা প্রকৌশলী অধিদপ্তর এর ইঞ্জিনিয়ার আলতাফ হোসেনে এর সার্বক্ষণিক তদারকির মাধ্যমে উক্ত বরাদ্দের অর্থ দিয়ে সংগঠনের ঘরের চারপাশ ও মেঝে পাকা করা হয়। সংগঠনের ঘরটি পাকা করার পরে জানতে চাইলে, সংগঠনের সভানেত্রী অল্পনা রানী মিস্ত্রী, ও প্রধান উপদেষ্টা শামসুর রহমান বলেন, “আমরা নারী সংগঠন হিসেবে আমাদের বসার জন্য স্থায়ী ঘর তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের অধিকার আদায়ে আমরা এগিয়ে চলেছি।”

সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সকল ক্ষেত্রে সমাজের নারীরা আজ আর পিছিয়ে নেই। সংগঠিত হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে নারী জাতি। সুযোগ, সুবিধা, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নারীদের শক্তি সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নারী উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। তবেই একটি সমৃদ্ধশীল সমাজ ও জাতি প্রতিষ্ঠা পাবে।

happy wheels 2