সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রামবাসীদের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনেছে একটি সমন্বিত উদ্যোগ

সাতক্ষীরা থেকে সাইদুর রহমান

যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। অথৈই পানি খেলা করছে চারিদিকে। কে বলবে দু’এক বছর আগেও এখান থেকে উঠত সোনালি ধান। “এ মাঠে আগে প্রচুর ধান হত। ২০১৩ সাল থেকে আর ধান হয় না। বর্ষার শুরুতে পানি বাড়তি থাকে। আগে কৃষি জমিতে কাজ করতাম এখন ঘেরে থাকি।” কথাগুলো বলছিলেন দামার পোতা গ্রামের দিন মজুর আবুল কাশেম।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৮নং ধূলিহর ইউনিয়নের দামার পোতা গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বেতনা নদী। গ্রামের প্রধান বিলটি এ নদীর পাশেই অবস্থিত। গত ৭-৮ বছর ধরে নদীতে জমতে শুরু করেছে পলি। যার ফলে উচু হয়ে গেছে নদীর তলদেশ। নদীতে এখন আর আগের মত পানি সরে না। তাছাড়া সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন ধরনের পানি এসে জমা হয় এ বিলটিতে। হঠাৎ করে জলাবদ্ধতা সন্মূখীন হয়ে থমকে যায় এলাকার জনজীবন। তাছাড়া আমন ধান না হওয়ার কারণে কৃষি শ্রমিকরা হয়ে পড়েন বেকার। বিপাকে পড়ে যায় গ্রাম বাসীর। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না গ্রামবাসীরা!

sayed-pic-2

গ্রামের মনিরুজ্জামান মোল্লা, রবিউল ইসলাম (মিন্টু), আতাউর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়তি এই পানিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করার! রবিউল ইসলাম মিন্টু এবং মনিরুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে ২০১৫ সালে বর্ষার শুরুতে গ্রামের সকল কৃষকদের নিয়ে বসলেন। তাঁরা চিন্তা করলেন গ্রামের সবাইকে নিয়ে সমবায়ের ভিত্তিতে পুরা বিলে গড়ে তুলবেন মৎস্য খামার। গ্রামবাসীদের সাথে আলোচনায় জানানো হয় গ্রামের প্রত্যেকেই তাদের জমির অনুপাতে বিলের মৎস্য খামারের ভাগ পাবেন এবং যারা ভাগ নিতে চান না তারা জমির অনুপাতে টাকা পাবেন।

সিদ্ধান্তের আলোকে তারা ওই বছরই পুরা বিলে জমির অনুপাতে শেয়ারের ভিত্তিতে গড়ে তোলেন মাছের খামার। যেটি এখন ‘গণঘের’ নামে পরিচিত। গ্রামের আবুল কাসেম, আবু জাফর ও ইবাদুল ইসলামসহ আরো অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে এই মৎস্য খামারে। এই প্রসঙ্গে ইবাদুল ইসলাম বলেন, “আগে এ সময় কোন কাজ থাকত না। এখন গণঘেরে কাজ করতেছি। ৪০০০ টাকা বেতন পাই। এ দিয়ে সংসার চলতেছে।” একই সাথে ঘেরের কাটাশেওলা পরিষ্কার এবং খাদ্য দেওয়ায় কাজে খন্ড কালীন কাজের সুযোগ হয়েছে এলাকার অনেক নারী-পুরুষের। স্থানীয় বাসিন্দা সাজেদা বেগম বলেন, “ঘেরে কাজ করি। এখান থেকে আয় হয়। মাঝে মাঝে শামুক তুলি যা হাসের খাবার হয়।”
এ ঘেরে চাষ করা হচ্ছে রুই, কাতলা, কার্প, তেলাপিয়া, মৃগেল, বাগদা, ছাটি, চিংড়িসহ আরো অনেক প্রজাতির মাছের। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ মাছ বিক্রয় করা হয় সাতক্ষীরার আড়ৎগুলোতে। এ ছাড়াও মাছ ধরার মৌসুমে এখানে কাজ করছেন অসংখ্য নারী পুরুষের।

sayed-pic-1

একসময় জলাবদ্ধতায় পানি আবদ্ধ থাকার কারণে এলাকাটিতে দূষণ প্রকট আকার ধারণের উপক্রম ছিলো। দূষণের কারণে গ্রামবাসীরা নানান রোগে আক্রান্ত হতেন। তবে জন উদ্যোগের মাধ্যমে জলাবদ্ধতাকে (বাড়তি পানি) উৎপাদনশীল কাজে লাগানোর পর থেকে এ দূষণ কমেছে, বেড়েছে কর্মসংস্থান। এভাবে দুই বছর আগেও যে পানি ছিল গ্রামাবাসীদের জন্য আপদ, সেই আপদকে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে পরিণত করেছেন মনিরুজ্জামান ও রবিউলরা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইচ্ছাশক্তি ও উদ্যম থাকলে মানুষ যেকোন সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে পারেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: