Posted in

শতবাড়ি প্রতিবেশিদের সাথে আন্তঃসম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখে

শ্যামনগর সাতক্ষীরা থেকে মফিজুর রহমান
মাটি কেবল মাটি নয়, মাটি কৃষকের প্রাণ। লবণাক্ত পরিবেশে কৃষিকাজ করে বেঁচে থাকার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকেরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের গ্রাম কামালকাটি। গ্রামজুড়ে রয়েছে অসংখ্য চিংড়ি ঘের আর চারিধারে লবণ পানি। কৃষি জমির মাটিও হয়ে পড়েছে লবণাক্ত। চাষের জন্য মিষ্টি পানির অভাবে কৃষকেরা কৃষি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এর মাঝেও কেউ কেউ লবণ পানি ও মাটিতে টিকে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এমনই একজন কৃষক শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকাটি গ্রামের রেজাউল ইসলাম। মারাত্মক লবণাক্ত মাটি-পানি ও পরিবেশ মোকাবেলা করে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে তিনি বসতভিটায় সারাবছর সবজি চাষ করছেন।


বিগত সময়ে বারসিক’র ধারাবাহিক কাজের অংশ হিসেবে পুষ্টি ব্যাংক বা শতবাড়ি তৈরির লক্ষ্যে শ্যামনগর উপজেলার সবগুলো ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শতবাড়ি নির্বাচন করা হয়। তার মধ্যে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের কামালকাটি গ্রামের রেজাউল ইসলামের বাড়ি একটি। রেজাউল ইসলামের বাড়িটি শতবাড়ি হওয়াতে এবং বারসিক থেকে সহায়তা দেওয়ার পর তার জীবনযাত্রায় কি ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বাড়িটি শতবাড়ি তৈরি হওয়ার আগে থেকেই আমি সবজি চাষ করতাম। বাড়ির সামনে ডোবা ছিল। সেটি বালি দিয়ে পূরণ করে সবজি চাষ শুরু করি। বারসিক থেকে ঘেরার উপকরণ নেট, সিমেন্টের পিলার ও বাঁশ সহায়তা করা হয়। এছাড়া দূর থেকে কলসে করে পানি এনে সবজি ক্ষেতে দিতে হতো। বারসিক’র সহায়তায় একটি গভীর নলকূপ বসিয়েছি। আগে সবজি করতাম কিন্তু তার পরিমাণ ছিল কম। নলকূপটি বসানোর ফলে সারাবছর আরো বেশি সবজি চাষ করতে পারছি। শতবাড়ি তৈরি ও সহায়তা পাওয়ার পর কিছুটা হলেও আমার পরিবর্তন বুঝতে পারছি।’


তিনি আরো বলেন, ‘এ সহায়তা আমার কাজের গতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রায় সময় আমার ক্ষেতে সবজি থাকে। সবজি বিক্রি করে যেমন লাভবান হচ্ছি তেমনি পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছি। এবছর শীত মৌসুমে বেগুন, ডাটাশাক, লালশাক, বিটকপি, পালংশাক, ওলকপি, মৌরী, অম্বলমধু, পুঁইশাক, লাউ, শশা, কলা, মিষ্টি আলু, ঝাল, সিম, আলু চাষ করেছিলাম। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৪৫০০ টাকার সবজি বিক্রি করেছি। তাছাড়া ১৫০০ টাকার ঘাস বিক্রি করেছি এবং আমার বাড়িতে পোষা ৪টি ছাগলের সারাবছরের খাবার এই ক্ষেত থেকে পেয়েছি। আমার বসতভিটায় বারসিক’র সহায়তায় আম, কলা, খই, নারকেল, নীম, বেল, কদবেল, ধঞ্চে, পেঁপুল, খুদ, বাবলা, মেহগনি, শিশু, জামরুল, বেদানা, তেঁতুল, আমলকি, পেয়ারা, জাম, অর্জুন গাছের চারা লাগিয়েছি।’


রেজাউল ইসলাম জানান, বর্তমানে তিনি বীজ সংরক্ষণ করেন। তাঁর সবজি ক্ষেত থেকে ২০ জনকে সবজি ক্ষেতে দিয়েছেন। বর্ষাকালীন ৭ জনকে আমের মধু, কুমড়া, ধঞ্চে, পুঁইশাক, লালশাক, ডাটাশাক, ঢেঁড়ষ, কুশি বীজ সহায়তা করেছেন। এটি শতবাড়ি হওয়াতে এখানে সবজি চাষ, বীজ সংরক্ষণ, করোনার সচেতনতা, জৈব বালাইনাশক তৈরি বিষয়ে আলোচনা হয় এবং ট্রায়কো ডার্মা সার তৈরির প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষামূলক সার তৈরি করা হয়। অনেক লোকজন তাঁর সবজি ক্ষেত দেখতে আসে এবং ফসল চাষ সম্পর্কে তারা পরামর্শ চায়। তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে প্রতিবেশিদের সাথে এক ধরনের সুসম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছেন বলে তিনি জানান। তাঁর ক্ষেতে বর্ষাকালীন সবজি লাগিয়েছিলেন কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। পুনরাই আবার সবজি ক্ষেতে সবজি বীজ লাগিয়েছেন।


পুষ্টিভিত্তিক কৃষির মাধ্যমে তৈরিকৃত ‘পুষ্টি ব্যাংক’ বা শত বাড়িটি পরিবারের পুষ্টি চাহিদা যেমন পূরণ করতে পারছে তেমনি পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারছে। তাছাড়া সবজি চাষে পরামর্শ,বীজ বিতরণ এবং সবজি বিনামূল্যে বিতরণ করায় পাড়া- প্রতিবেশীদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। প্রতিবেশিদের সাথে এক ধরনের আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। শতবাড়ির কার্যক্রম বাংলাদেশের উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলের স্থানীয় কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জীবনযাত্রা পুনঃগঠনে স্থানীয় মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি-সাহস ও সংগ্রামকে আরো বেশি শক্তিশালী ও উদ্যোগী করে তুলবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.