সাম্প্রতিক পোস্ট

বনশ্রী রানী: একজন সংগ্রামী নারী থেকে জনপ্রতিনিধি


শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল
বনশ্রী রানী মন্ডল। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কালমেঘা গ্রামের একজন সংগ্রামী দরিদ্র ও কর্মঠ নারী। ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াপশুনার পর কালমেঘা গ্রামের পরিতোষ মন্ডলের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পর থেকে দারিদ্র্যতার সাথে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়। স্বামীর জমি জমা বলতে ২ বিঘা জমি যার মধ্যে ১০ কাঠা বসতভিটা। সংসারে স্বামী, স্ত্রী, তিন সন্তান, শ্বশুরসহ মোট ৬ জন সদস্য। ৬ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারে দৈনন্দিন বিভিন্ন চাহিদা মেটানোর জন্য বনশ্রী রাণীকে সংগ্রাম করতে হয়। সংসারের কথা বলতে বনশ্রী রাণী বলেন, ‘সংসারে অবস্থা খুবই খারাপ। নুন আন্তে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। আমার স্বামী একজন কাঠ মিস্ত্রি ও দিনমজুর। স্বামীর একার আয়ে কোন রকমে দিন আনা দিন খাওয়ার মতো সংসার চলতে থাকে।’

সংসারের চাকাকে সচল করার জন্য তিনি স্বামীর সাথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে শুরু করেন। আর এ কাজের মধ্যে ছিলো পাতার চাতর তৈরি, ধান রোপণ, ধান মাড়াই, বসতভিটায় সবজি চাষ ও গবাদিপশু পালন ও পরিচর্যা। আর এ কাজ তিনি ছোটবেলা থেকে বাপ-মা-ঠাকুরদা-ঠাকুরমার কাছ থেকে অর্জন করেন।স্বামী ,স্ত্রী ও শ^শুর মিলে বছরব্যাপি বসতভিটায় বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ ও হাঁস- মুরগি-গরু ও ছাগল পালন করতে শুরু করেন। বসতভিটায় মৌসুমভিত্তিক আলু, টমেটো, বীটকপি, মুলা, গাজর, লালশাক, পালংশাক, ওলকপি, পুইশাক, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, ঢেড়স, চালকুমড়া, উস্তে, শসা, ঝিঙা, তরুল, শিম, পেপে, কচুরমুখী, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ ও সরিষা ইত্যাদি সবজি চাষ করেন। বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করে বনশ্রী রাণী ধীরে ধীরে সংসারে সচ্ছলতা আনতে সক্ষম হন।


সংসারের এবং তার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও পরিবর্তন সম্পর্কে বনশ্রী রানী বলেন, ‘আমি বসতভিটায় সবজি চাষের পাশাপাশি, গবাদি পশু পালন এবং দর্জি কাজ করে থাকি, যা দিয়ে পরিবারের বড় একটি অংশ আয় হয়। এছাড়াও ২০১১ সালের দিকে বারসিক’র সাথে আমার পরিচয় হয়। তখন আমি আমাদের গ্রামের কালমেঘা মানব কল্যাণ কৃষক সংগঠনের একজন সদস্য ছিলাম। বাড়িতে তখন কম বেশি সবজি চাষ করতাম। এরপর ২০১২ সালের দিকে আমার সবজি চাষের আগ্রহ দেখে আমার কাজকে আরো গতিশীল করার জন্য বারসিক থেকে বসতভিটায সবজি চাষের জন্য মাচার উপকরণ সহায়তা পাই, যা দিয়ে আমার সবজি চাষের আগ্রহ উদ্দীপনা আরো বেড়ে যায় এবং আরো বেশি করে সবজি চাষ শুরু করলাম। সেখান থেকেই ভালোই লাভবান হতে থাকি। এ সহায়তা আমার দারিদ্রতা দুর করতে অনেকটা সহায়ক হয়।”


বনশ্রী রানী জানান, ‘আমি কালমেঘা মানব কল্যাণ কৃষক সংগঠনের সদস্য থাকায় বারসিক’র বিভিন্ন সভা, মেলা, প্রশিক্ষণ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ তৈরি ও সেবা আদায়ে গ্রাম ও সংগঠনের সদস্যদের সহায়তা করে থাকি। এতে করে গ্রাম ও সংগঠনের মাঝে আমার গ্রহনযোগ্যতা বাড়তে থাকে যার প্রেক্ষিতে গত বার ২০১৭ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। সেখানে মাত্র ১৩ ভোটে পরাজিত হয়। আর সেখান থেকে আরো বেশি করে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। আর মনে প্রাণে বিশ^াস করা শুরু করি যে কোন একসময় আমার এ ইচ্ছাও পূরণ হবে।’
তিনি জানান, তাদের কৃষক সংগঠনের মেয়াদ ৫ বছর পরে গ্রামের নারীদের নিয়ে আলাদা একটি নারী সংগঠন তৈরির ইচ্ছা আগ্রহ প্রকাশ করেন। সংগঠন তৈরির জন্য বারসিক’র নিকট সহায়তা চান। সেক্ষেত্রে বারসিক থেকে সব রকমের সহায়তা পেয়েছেন বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়িটি একটি শত বাড়ি হিসাবে পরিচিত। সবকিছু মিলে একপর্যায় নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে আগ্রহী, নারীদের আয়বর্ধনমূলক কাজে নিজেদের যুক্ততা বাড়ানোর জন্য ২০১৮ সালের ২১ জন নারীর অংশগ্রহণে সমন্বিতভাবে একটি সংগঠন তৈরির প্রস্তাব করা হয়। সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘কালমেঘা কৃষি নারী সংগঠন’। ”
সংগঠন তৈরির সাথে সাথে এলাকার জন্য কি কি কাজ করা যায় তা সকল সদস্যরা মিলে নির্ধারণ করেন এবং তা পরিকল্পনায় তা যুক্ত করি। সংগঠন তৈরির পর তারা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন এলাকার সম সাময়িক সমস্যা নিয়ে আলোচনা, অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আলোচনা, পাড়া মেলা, সঞ্চয় সম্প্রসারণ, নিজেদের ব্যাংক হিসাব খোলা, জৈব বালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহারে প্রশিক্ষণ, চুলা ও হাজোল তৈরিতে প্রশিক্ষণ, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা আদায়ে যোগাযোগ, সুপেয় পানির পুকুর সংরক্ষণ, বসতভিটায় সবজি চাষ, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর, প্রাণী সম্পদের ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্প আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন ও বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে বনশ্রী রানী বলেন, ‘সংগঠন ও শতবাড়ি তৈরির পর থেকে যেমন গ্রাম ও এলাকার মানুষের পাশে থেকে বিভিন্ন সেবা করার চেষ্টা করছি। নিজের বাড়ি থেকে যেমন বিভিন্ন সবজি ও বীজ সহায়তা করছি অন্যদের। সাথে সরকারি-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা পেতে সহায়তা করছি। এলাকার সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছি। এতে করে ধীরে ধীরে গ্রাম, সংগঠন ও এলাকায় আমার গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ৫ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৩ নং শ্যামনগর সদর ইউনিয়নের ১,২,৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বর পদে কালমেঘা কৃষি নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে জয়লাভ করি। আর এ জয় আমার একার নয় এজয় আমার সংগঠনের সকলের। তারা পাশে না থাকলে আমি কিছুই করতে পারতাম না। এছাড়াও বারসিক থেকে আমি সব সময় সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’
প্রতিটি মানুষের নিজের আত্মবিশ^াস ও মনোবল দৃড় থাকলে সকল প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। তেমনি একজন সংগ্রামী ও বদলে যাওয়া নারী বনশ্রী রানী। তার যে ভূমিকা এবং তার যে বদলে যাওয়া কথা তা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: