সাম্প্রতিক পোস্ট

জলাশয়ে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার: দুর্ভোগে প্রান্তিক মানুষ

রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম, অমৃত কুমার সরকার, শহিদুল ইসলাম শহিদ

ভূমিকা
বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের অবস্থিত বরেন্দ্র অঞ্চল। বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম একটি উপজেলা হচ্ছে তানোর উপজেলা। পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণায় দেখা যায়, এখানে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যই বিরাজমান। একদিকে যেমন অনেক উঁচু যাকে উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যে ফেলা যায়। যেমন বাঁধাইড় ইউপিসহ কিছু এলাকা। যেখানে পানি সংকট দিনে দিনে আরো বেড়ে যাচ্ছে। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, নীচু বরেন্দ্র অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য। যেখানে বিলকুমারী বিলসহ শিবনদী অবস্থিত। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সমস্যা সেই দীর্ঘদিন থেকেই। নিকট অতীতে বর্তমান সময়ের মতো পানির সংকট না হলেও খাবার পানির একটা বড় সমস্যা তখন থেকেই ছিলো তা ইতিহাস পর্যালোচনা এবং প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়। নিকট অতীতে বেশিরভাগ মানুষের পানির উৎস ছিলো প্রাকৃতিক জলাশয়, দিঘি পুকুড় বা পাত কুয়া। একসময় পানির সমস্যা সমাধানে রাজা বাদশারা গ্রামে পুকুড় বা দিঘি খনন করে দিতো। সেই পুকুড় বা জলাশয় গুলোই গ্রামবাসীদের আর্শীবাদ হিসেবে ছিলো। নিত্য প্রযোজনীয় সকল কাজে তারা এই পানি ব্যবহার করতো। সময়ের পরিক্রমায় বরেন্দ্র অঞ্চল নানাদিক থেকেই অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিভিন্নভাবে অবদান রাখছে। সবকিছুই এগিয়ে যাচ্ছে। আবার নানা কারণে আমাদের নানা দূর্যোগ এবং মানুষের অধিকারও সংকোচিত হয়েছে। সেগুলো সমাধানে আবার নানা উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে।

IMG_0378

হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও প্রান্তিক মানুষের জলের অধিকার
পুকুড় জলাশয়ে রাসায়নিক ও কীটনাশকের প্রয়োগ, পানি ব্যবহার ও স্বাস্থ্য পরিবেশ বিষয়ে চলমান সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে দেখা গেছে। বেসরকারী উন্নয়ন গকেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক তানোর এলাকায় প্রাথমিকভাবে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও জনমতামতের ভিত্তিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে মাধ্যমে তা জানা যায়। উক্ত সমস্যা সমাধানে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের অংশগ্রহণে, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পুকুড়সহ জলাধারের সকল উৎসে প্রান্তিক মানুষের নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের দাবিতে সম্প্রতি তানোর উপজেলা মিলনায়তনে জীবন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায়- রাসায়নিক ও কীটনাশকমুক্ত জলাধার শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারী উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও তানোর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় পরিষদের যৌথ উদ্যোগে উক্ত জনসংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তানোর উপজেলার নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বরেন্দ্র উন্নয়ন কতৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রোকৌশলী রবিউল ইসলাম, তানোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন, জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত কৃষক ইউসুফ আলী মোল্লা, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষক নুর মোহাম্মদসহ নিরাপদ পানি অধিকারহীনতায় ভুক্তভোগী বিভিন্ন গ্রামের ৫০ জন নারী ও পুরুষ। জনসংলাপে বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চল সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম জনমতামত এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আলোকে সংলাপ এর পর্যবেক্ষণ ও ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন।

প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও জনসংলাপে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মতামত
জনসংলাপে অংশগ্রহণকারীরা তাদের পানিকেন্দ্রিক অতীত সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরেন। তারা জানান, নিকট অতীতে গ্রামের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ তার গ্রামের আশপাশের পুকুড় বা জলাশয়ের পানি নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সকল কাজে ব্যবহার করতো। ধনী ও গরীব সকলের প্রাপ্যতা ছিলো প্রায় সমান। যেখানে পানি ব্যবহারে কোন বৈষম্য ছিলো না। পানির উৎগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যে সকলে মিলে কার্যকর ভূমিকা পালন করতো। বিভিন্ন লোক বা ধর্মীয় উৎসব পালন করা হতো। পানি সংস্কৃতি বা পানি কেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি ছিলো অন্যতম পবিত্রতার বিষয়। তারা আরও জানান, সময়ের বিবর্তনে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আর ভৌগোলিক কারণসহ নানা কারণেই দিনে দিনে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর নীচের দিকে নেমে যায়। অনেক পুকুর বা জলাধার শুকিয়ে যায়। আবার পানির সহজ প্রাপ্যতার কারণে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো যত্নের অভাবে নষ্ট হতে শুরু করে। পানি সংকট আবার দিনে দিনে বাড়তে থাকে। গ্রামের অবশিষ্ট পুকুর বা জলাশয়গুলোর মালিকানার পরিবর্তন এবং জটিল লিজ প্রথার কারণে নিজ গ্রামের পুকুরের মালিকানা চলে যায় অন্যের হাতে। যার ফলে লাভকেই বেশি প্রাধান্য দেবার কারণে মালিক পক্ষ পুকুরগুলোতে মৎস্য চাষ করেন। রাসায়নিক কীটনাশকসহ এমন কিছু ব্যবহার করা হয় যার ফলে পুকুরের পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যায়। অংশগ্রহণকারীদের মতে, উপায়ন্তর না পেয়ে গরিব বা প্রান্তিক মানুষ নিত্য প্রযোজনীয় কাজে সেই পানি ব্যবহার করে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ পুকুরের পানি ব্যবহার করতে বাধা প্রদান করে থাকে। এই পানি ব্যবহারের ফলে মানুষের নানা রোগবালাই এমনকি পুকুর পাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস বা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মূলত এসব নানাবিধ কারণে আজ বরেন্দ্র এলাকার প্রান্তিক মানুষের পানির অধিকার সংকোচিত হচ্ছে। রোগবালাই বেড়ে যাবার কারণে তার সংসারের খরচ বেড়ে গছে। কর্মক্ষমতা কমে যাচেছ। অনেক সময় বড় বড় রোগের কারণে মৃত্যুবরণ করছে।

IMG_0422

পুকুরে রাসায়নিক, কীটনাশক ব্যবহার ও পরিণতি
পুকুর বা জলাশয়ে যে সকল রাসায়নিক কীটনাশক বা উপকরণ ব্যবহার করা তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো: ইউরিয়া, পটাশ, হাঁস মুরগির মল, ক্ষতিকারক মাছের ফিড, সমিথিন, ডাসব্রাম, সিকুর, কার্বট, হরমোন বিষসহ গ্যাস ট্যাবলেট। এসব রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পুকুরের পানি অতি ঘন ও সবুজ হয়ে যায়, পানিতে ছোট ছোট কিট জাতীয় পোকা বৃদ্ধি পায়, পানি ভাত রান্নাসহ কোন রান্নাতেই ব্যবহার করা যায় না, ওই পানিতে গোসল করলে চুলকানি, খোসপাচড়া হয়, বেশিক্ষণ পানিতে থাকলে শরীরে ছেদলা পরে লোমকুপ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া গরুকে এ পানি খাওয়ানো হলে গরুর পাতলা পায়খানা হয়, এই পানিতে ব্যাঙ, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী বসবাস করতে পারে না। দূষিত এই পানি ব্যবহারের কারণে মানুষের নানান রোগব্যাধি দেখা দেয় বলে এলাকাবাসীরা জানান।

প্রান্তিক মানুষের দাবি ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি

প্রান্তিক মানুষ মনে করেন, গ্রামের ভিতরে পুকুর/জলাশয়গুলোতে মানুষ বা পরিবেশের জন্যে ক্ষতি করে এমন রাসায়নিক কীটনাশক বা এমন কোন উপকরণ ব্যবহার করা না হলে এসব পুকুর বা জলাশয়ের পানি দূষিত হবে না। তাই তারা দাবি করেন যাতে করে পুকুরগুলো গ্রামের মানুষের সমন্বিত উন্নয়নের জন্যে তাদেরকেই লিজ দেবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রযোজন হলে জনগোষ্ঠীর উপকারের জন্যে আইন পরিবর্তন করতে হবে। তারা দাবি করেন পুকুরে/ জলাধারের পানি ব্যবহারে যাতে কেউ কোন ধরনের বাধা প্রদান না করেন। পুকুর বা জলাশয়ে রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করলে কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ভোক্তভোগী মানুষের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করারও দাবি জানান তারা। এছাড়া এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে তারা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। জনসংলাপ এ ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর চাহিদা এবং সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ এবং নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং গরিব মানুষের পানির অধিকার হিসেবে গ্রামের পুকুরে রাসায়নিক, কীটনাশক ব্যবহার একটি মারাত্মক সংকট বয়ে আনছে। আমরা অচিরেই এ বিষয়ে প্রতিটি গ্রামের পুকুরগুলোতে যাতে রাসায়নিক কীটনাশক প্রযোগ না করে সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্তত একটি ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে একটি করে আদর্শ পুকুর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যেখানে সর্বসাধারণ পানি ব্যবহার করতে পারবেন।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: