Posted in

সাপ খেলা দেখবানি গো, সাপ খেলা..

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
মাথায় একটি বাঁশের তৈরি বাক্স, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে গ্রামের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়। আর মুখে থাকে ‘সাপ খেলা দেখবানিগো, সাপ খেলা।’ গ্রামের বৌ ঝিয়েরা যদি রাজি থাকে তবেই কারো বাড়িতে ঢুকবে আর বাক্স থেকে বের করা হবে সাপ। তবে সেই সাপ বা খেলা দেখানোর ছবি তোলা বারণ। যে ছবি তুলতে চাইবে তার বাড়িতে খেলা দেখানো হবেনা। উপরোন্তু তাঁদের নিজস্ব ভাষায় দেয়া হবে গালি। ধান তোলার মৌসুমে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ানো এক শ্রেণির নারীদের বলা হয় বেদেনি। তাঁরা বাংলাদেশেরই মানুষ। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। সাপ খেলা দেখিয়ে আর তাবিজ কবচ বিক্রি করে সংসার চালায়।


এমনই একজন নারী কাজলী বেগম এর সাথে একদিন আলাপ। বাড়ি সিলেট জেলায়। এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে তাঁর। মেয়েটি বড় আর ছেলেটির বয়স ৭/৮ মাস হবে। স্বামীকে বাড়িতে রেখে তিনি চলে এসেছেন বহরে। মেয়েটিকেও সাথে এনেছেন। তবে অন্যদের সাথে বহরে রেখে এসেছেন। ছেলেটি ছোট বলে তাকে কোলে নিয়েই বেরিয়ে পড়েছেন খেলা দেখাতে।


কথা বলে জানা যায়, তাদের কোনো জমি জমা নেই। থাকার জায়গাও নির্দিষ্ট নয়। সিলেট শহরে প্রবাসী এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রিত থাকেন। বছরের যে সময়ে উজানের দিকে ধান তোলা হয় সে সময় তাঁরা ঐ সমস্ত এলাকায় গিয়ে সাপ খেলা দেখিয়ে কিছু রোজগার করেন। স্বামী কোনো কাজ করেনা। বেদে সম্প্রদায়ের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হচ্ছেন নারী।


অনেকটা যাযাবরের মতোন তাঁদের জীবন। আগে যখন নদীতে পানির অভাব ছিলোনা তখন নৌকাতেই থাকতো তাঁরা। নৌকাতেই ছিল সংসার। কিন্তু এখনকার সময়ে বেশিরভাগ নদী থাকে শুষ্ক। তাই স্থলভাগই ভরসা। উপযুক্ত কোনো জায়গা বেছে নিয়ে প্লাস্টিকের কাগজ, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে তৈরী করে নেয় থাকার জায়গা। তবে বেশিদিন এক জায়গায় থাকেনা। যখন কাজলীর সাথে কথা হয় তখন তাঁদের বহর ছিল মদনপুর মাজারের পাশে খোলা জমিতে।


প্রতিদিন সকালে রান্না খাওয়া শেষ করে কোলে বাচ্চা আর সাপ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। ৩০ টাকার বিনিময়ে সাপ খেলা দেখান তিনি। একেক দিন একেক গ্রামে আর বাজারে ঘুরে খেলা দেখায়। ঝোলায় থাকে বিভিন্ন গাছের শেঁকড় আর ছাল। কিছু চালাকির আশ্রয় নিয়ে অনেকের সাথে ধোকাবাজিও করে সে। সংসারে অশান্তি, সামনে বিপদ এ সমস্ত কথা বলে মানুষের মন দুর্বল করে দেয়। চিকিৎসা হিসেবে মোটা টাকার বিনিময়ে গাছের শেঁকড় আর ছাল পুটুলিতে বেঁধে ঔষধ দেয়। শর্ত থাকে যে ৪৫ দিনের আগে খোলা যাবে না। রোগ বুঝে চিকিৎসা। বিভিন্ন পুটুলির দাম বিভিন্ন ধরণের।


সাপের খেলা দেখানোতেও থাকে চালাকি। মানুষের মন দুর্বল করার জন্য বলা হয় যার সামনে বিপদ আছে তার হাতে সাপ যাবে। এভাবে কয়েকজনকে পাশে বসিয়ে গান গেয়ে সাপটিকে হাতে রেখে নিচের দিকে নামিয়ে দেয়া হয়। তবে সাপটি যখন নিচের দিকে নামতে থাকে তখন এর পেটে আস্তে করে চাপ দিলে সাপ আবার উপরের দিকে উঠে যায়। আবার কাজলীর যাকে দেখে মনে হবে সে একটু ভীতু স্বভাবের তার বেলায় সাপের পেটে চাপ দেয়না। ফলে সাপ সরাসরি তার হাতে চলে যায়। তখন সেই ব্যক্তিটিকে অসুস্থ বলে তাঁর চিকিৎসা শুরু করে। যার কাছ থেকে যেমন আদায় করতে পারে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।


অনেকে অষুধ নেয়ার পরও টাকা দিতে চায়না। তখন গোল বেঁধে যায়। শুরু হয় উভয় পক্ষের ঝগড়া আর বেদেনীর অভিশাপ দেয়া। এছাড়া যে তাঁদের কোনো উপায়ও নেই। পেট চালাতে হবে তো! ভয় পেয়ে অনেকেই টাকা দিয়ে বিদায় করে দেয়।


আমাদের দেশের নারীদের কাজ করার ক্ষমতা থাকলেও সুযোগ কম। নেই উপযুক্ত বিচরণক্ষেত্র। বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। পুরনো পেশা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অন্য কোনো পেশাতেও তারা যেতে পারছেনা। একদিকে যেমন থাকার জন্য নিজস্ব জায়গার অভাব তেমনি অন্যদিকে সমাজে তাঁদের অবহেলার চোখে দেখা হয়। অস্পৃশ্য জ্ঞানে ঘৃণা করা হয়।
পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে সাপ ধরে এর বিষদাঁত ভেঙে ফেলে দিয়ে খেলা দেখানো যায়। কিন্তু সমাজের বিষদাঁত ভাঙার সাধ্য কাজলীদের নেই।


আমাদের দেশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের নারীদের একটি ঘর থাকে। দরিদ্র বা দলিত হলেও স্বামী সন্তানকে নিয়ে সংসার করতে পারে। কাজলীরা তা পারেনা। সমাজ থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন। অন্যান্য শ্রেণির মানুষ তাঁদের সহজভাবে গ্রহণ করেনা। ছোট নজরেই দেখা হয় তাঁদের।
নারী বলেই নেই তাদের নিরাপত্তা। সাপ খেলা দেখাতে গিয়ে কত ধরণের মানুষের সাথে তাঁদের কথা বলতে হয়। অনেকে বাজে মন্তব্যও করে। শুধুমাত্র পেটের দায়ে সে সব শুনতে হয়। অনেক সময় হেনস্তার শিকার হতে হয়। তখন সাপের ভয় দেখিয়ে বিপদ কাটাতে হয়। তবে তাঁরা খেলা দেখাতে কখনো একা বের হয়না। ৪/৫ জনের একটি দলে বের হয়। একজনের বিপদ দেখলে অন্যজন এগিয়ে আসে।


দিনের পর দিন সমাজ সংসারের চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে কাজলীরা জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে। ডিজিটালাইজেশনের যুগে কাজলীদের চালাকি আর ভোজভাজির খেলা এখন সবারই জানা। তাই সহজে আর মানুষ ঠকাতে পারেনা। অনেকে খেলা দেখতেও চায়না। কোনো দিন ভালো রোজগার হয় কোনোদিন আবার খালি হাতেই বহরে ফিরে যেতে হয়। তবুও প্রতিদিনের রোজগার থেকে কিছু জমিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে হবে। যাতে বছরের অন্যান্য সময়ে খরচ করা যায়।


এভাবেই চলছে বেদেনীদের জীবন। গল্প, কবিতা আর উপন্যাসের শেষের দিকে ধনীর ঘরের সন্তান বা রাজকুমারের সাথে বেদের কন্যার বিয়ে হলেও সত্যিকার জীবনে তাঁরা ঘুটে কুড়ানির দাসী হয়েই থেকে যায়।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.