বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মেলন: পানির অধিকার ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিতসহ কৃষিজমি সুরক্ষার দাবি

রাজশাহী থেকে মো: শহিদুল ইসলাম

খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট সমাধান, পানির অধিকার ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করাসহ কৃষিজমি সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জোর দাবি করেছে তরুণ-যুবসহ নাগরিক সমাজ।
গতকাল বুধবার দিনব্যাপী রাজশাহীর বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক (বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ) এর যৌথ আয়োজনে রাজশাহী নগরীর গণকপাড়ায় অবস্থিত ফ্রেন্ডস পিক কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মেলন ও সম্মাননা ২০২৩ অনুষ্ঠানে তারা এ দাবি জানান।

উক্ত সম্মেলনটির উদ্বোধন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান, নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দীকিসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। সম্মেলনের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মেলন ও সম্মাননা ২০২৩ এর আহবায়ক ও সভাপতি সাবিত্রী হেমব্রম। ধারণাপত্র পাঠ করেন সদস্য সচিব মো: আতিকুর রহমান। বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়নে বারসিক এবং তরুণদের অগ্রযাত্রা বিষয়ে কথা বলেন বারসিক বরেন্দ্র অঞ্চল সমন্বয়কারী ও গবেষক শহিদুল ইসলাম। উদ্বোধনী পর্বের পরেই তরুণরা বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট, পানির অধিকার, জলবায়ু ন্যায্যতাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি জমি সুরক্ষায় নাগরিক মঞ্চের মধ্যে দিয়ে ২৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি জমি সুরক্ষায় নাগরিক মঞ্চের আহবায়ক নারী নেত্রী রহিমা খাতুন এই দাবিগুলো তুলে ধরেন।

এসময় অংশগ্রহণকারিগণ মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের মতামতগুলো তুলে ধরেন। এতে উপস্থিত ছিলেন বরেন্দ্র অঞ্চল কৃষি জমি সুরক্ষা মঞ্চের সদস্য সচিব ও জাতীয় কৃষি পদক প্রাপ্ত কৃষক নুর মোহাম্মদ, কৃষক নেতা জাহেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী নেতা সেকেন্দার আলী, নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান, বারসিক’র পরিচালক ও নৃবিজ্ঞানী সৈয়দ আলী বিশ^াস। বক্তারা ‘ কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন,২০১৫’(খসড়া) দ্রুত চুড়ান্ত আইন হিসেবে গৃহীত এবং জন মতামতের ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়গুলো যুক্ত করে নীতীমালার তৈরির প্রস্তাব করেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চল একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, তাই এর কৃষিজমি সুরক্ষায় দরকার আলাদা নীতিমালা। কারণ দিনে দিনে যে হারে বরেন্দ্র অঞ্চলের উচুঁ নীচু মাটির বৈশিষ্ট্যসহ কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, অদুর ভবিষ্যতে হয়তো এর জন্য মহাসংকটে পড়তে হতে পারে। তাই তারা বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য আলাদা কৃষিজমি সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। এই পর্বে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট এবং পানির সমস্যা সমাধানে করণীয় বিষক গবেষণাপত্র পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনি বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি যেভাবে কমে যাচ্ছে তাতে এই অঞ্চলটি মারাত্মক দুর্যোগের মধ্যে পড়তে পারে। একদিকে পাতালের পানি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে তীব্র দাপদহ, অনাবৃষ্টির কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে, যা মারাত্মক ক্ষতি করবে এই জনপদকে।’

বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে তরুণদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো উপস্থাপন করা হয়, একই সাথে তরুণদের দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। ১৩ দফা দাবিসহ বরেন্দ্র জলবায়ু ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি শাইখ তাসনীম জামাল। এসময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, প্রধান আলোচক হিসেব উপস্থিত ছিলেন নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসান খন্দকার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক অভিজিৎ রায়, নৃবিজ্ঞানী ও বারসিক’র পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ^াস। প্রধান অতিথি বিভাগীয় কমিশনার ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়নে এবং সমস্যাগুলো সমাধানে যে জন দাবিগুলো তুলে ধরা হলো, তা সমাধানে তিনি সহযোগিতা করবো।’ তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলের এরকম সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে সেগুলো সুপারিশ আকারে তুলে ধরার কথা বলেন যাতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সেগুলো উপস্থাপনসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। প্রধান আলোচক নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদেরকে সকল প্রাণ নিয়ে ভাবতে হবে, ছোট ছোট কীটপতঙ্গ এবং মৌমাছিসহ এ প্রজাতির জীবজন্তু যেন প্রকৃতি থেকে বিলীন না হয়ে যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে।’ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক অভিজিৎ রায় বলেন, ‘তরুণদের উদ্যোগ এবং কাজগুলোকে সরকারি বেসরকারি পর্যায় থেকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের অঞ্চল এবং প্রাণ প্রকৃতি সম্পর্কে তরুণদের আরো বেশি বাস্তব জ্ঞান অর্জনের উদ্যোগ নিতে হবে। নৃবিজ্ঞানী ও বারসিক’র পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ^াস বলেন, ‘উন্নয়নে লোকায়ত জ্ঞানগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে, উন্নয়নে স্থানীয় মানুষ এবং তরুণদের যুক্ত করে সেই এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে।’

আলোচনা পর্ব শেষে বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মাননা ২০২৩ প্রদান করা হয়। এবারের শ্রেষ্ঠ সংগঠন সম্মাননা অর্জন করেন রাজশাহীর যুব সংগঠন স্বচ্ছলতা এসোসিয়েশন, শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে যৌথ সম্মাননা পান রাজশাহীর তানোর উপজেলার স্বপ্ন আশার আলো যুব সংগঠনের সভাপতি সবজুল ইসলাম ও স্বপ্নচারী যুব উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি রুবেল হোসেন মিন্টু, শ্রেষ্ঠ যুব হিসেবে যৌথ সম্মাননা অর্জন করেন ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ এর সাধারণ সম্পাদক ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো: আতিকুর রহমান ও সূর্যকিরণ সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তামীম আলী, শ্রেষ্ঠ যুব নারী হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন আদিবাসী ছাত্র পরিষদের সহ-সভাপতি ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হেমব্রম, শ্রেষ্ঠ সংগঠন উদ্যোগ হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের যুব সংগঠন নবজাগরণ ফাউন্ডেশন, শ্রেষ্ঠ কালচারাল একটিভিস্ট হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন বারনই লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি রায়হান কবির জুয়েল।

উল্লেখ্য যে, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম বরেন্দ্র অঞ্চল তথা রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের প্রায় ৫০টি যুব সংগঠনের একটি বৃহৎ ঐক্য। এখানে প্রায় দশ হাজারের বেশি তরুণ-যুবকরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও বৈচিত্র্য সুরক্ষাসহ নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। প্রতিবছর সংগঠনগুলোর উদ্যোগে বরেন্দ্র যুব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে । এ পর্যন্ত আটটি সম্মেলনের আয়োজন করেছে সংগঠনটি। যুব সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবছর তরুণরা তাদের বাৎসরিক অগ্রগতি এবং আগামীর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। একইসাথে বরেন্দ্র এলাকার সমস্যা সম্ভাবনার কথাগুলো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরেন। পাশাপাশি সম্মেলনের ভেতর দিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের অভিজ্ঞজন, শিক্ষক, গবেষকদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নেন।

happy wheels 2

Comments