সাম্প্রতিক পোস্ট

অম্ল মধুর আমড়া

::দেবদাস মজুমদার, বিশেষ প্রতিনিধি,উপকূল অঞ্চল

আমড়া

আমড়া

আমড়া বহু গুণের পুষ্টিকর ফল । ভিটামিন সি  সমৃদ্ধ আমড়া রক্তে কোলেস্টরলের মাত্রা কমায়। মানুষের কোষ্ঠ কাঠিণ্য ও বদহজম দূর করে। প্রচূর আয়রন সমৃদ্ধ এ ফল রক্তস্বল্পতা দূর করে। টক মিষ্টি রসালো আমড়া মুখের রুচি বাড়ায়। সর্বোপরি আমড়া স্বর্দি কাশি উপশম করে। আমড়া আসলে খাদ্যপ্রাণের তালিকায় বিশেষ ফল। ফলে এর বাণিজ্যিক প্রসারতাও কম নয় এবং এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মৌসুমে বাজার ছাড়াও পথে পথে প্রচুর বিক্রি হয় এই আমড়া। এটি একটি অর্থকরী ফল হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে আমড়ার চাষ ও উৎপাদন। বিশেষ করে দেশের যেসব অঞ্চলে এই ফলটি ভালো জন্মায়, সেসব স্থান এর চাষ বেশি হচ্ছে। উপকূলীয় পিরোজপুর অঞ্চলে আমড়ার পরিকল্পিত আবাদ আছে। কৃষকরা আমড়ার আবাদ করে যেমন লাভবান হচ্ছেন তেমনি এর আবাদেও সম্প্রসারণ ঘটছে। এথন আমড়া ফলনের ভরা মৌসুম।

পিরোজপুর জেলার কাউখালী, নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠী উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে আমড়া উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমেও এসব এলাকায় আমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে যা গত ১০ বছরের তুলায় অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন চাষীরা। প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের এই অর্থকারী মৌসুমী ফলের ইংরেজীতে পরিচিতি (Hog Plum), বৈজ্ঞানিক নাম- Spondias pinnaata Kurz বা Spondias mombin । একে আবার Golden Apple -ও বলে।

বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট, বাসে আর রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের সর্বত্রই প্রতিনিয়ত হকারদের ডাক শোনা যায়, “লাগবে স্যার বরিশালের আমড়া?” বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় এর ফলন বেশি বিধায় বরিশালের আমড়া বলেই সকলের কাছে এর পরিচিতি গড়ে উঠেছে। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলায় আমাড়ার আবাদ অনেক বেশি। কাউখালী ও স্বরূপকাঠিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমড়ার আবাদ হয়।

এসব অঞ্চলের এমন কোন কৃষকের বাড়ি পাওয়া যাবে না যে বাড়িতে কম করে হলেও একটি আমড়া গাছ নেই। ছোট-বড় রাস্তার পাশে বাড়ির উঠোনে একটি আমড়া গাছ লাগানো যেন প্রতিটি মানুষের নেশায় পরিণত হয়েছে। বহু মানুষ পতিত জমি কেটে আইল তৈরি করে রোপন করছেন। আবার কেউ কেউ ফসলী জমিতে বড় বড় বাগান সৃষ্টি করেছেন। কোন কোন চাষীর বাগান থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হয়। শ্রাবণ ভাদ্র মাসে পরিপক্ক আমড়া পাওয়া যায়। গ্রামের বেশির ভাগ এলাকায় আমড়া কেনা বেচার বেপারী রয়েছে। তারা ফাল্গুণ চৈত্র মাসে কুড়ি দেখেই আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে ফেলে। আবার অনেক চাষী নিজেরাই ভরা মৌসুমে বিক্রি করেন। আষাঢ় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত গাছ থেকে আমড়া পেড়ে বাজারে নিয়ে বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়। এজন্য বিভিন্ন বাজারে রয়েছে অসংখ্য আমড়ার আড়ৎ। কাউখালী উপজেলার প্রধান বন্দর লঞ্চঘাট, দক্ষিণ বাজার,  চৌরাস্তা পাঙ্গাশিয়াসহ বিভিন্ন বড় বাজারগুলোতে রয়েছে অসংখ্য আমড়ার আড়ৎ। ওইসব আড়তে বেপারীদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, মেঘনাঘাট, এলাকায় আমড়া চালান করা হয়। সেখানের আড়তদাররা বিভিন্ন মোকামের খুচড়া বিক্রেতা ও পাইকারদের কাছে আমড়া বিক্রি করে।

আমড়ার আড়ত

আমড়ার আড়ত

জানা যায়, পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমড়া কেনাবেচার জন্য রয়েছে একদল বেপারী। তারা চৈত্র বৈশাখ মাসে গৃহস্থদের অগ্রীম টাকা দিয়ে আমড়ার গাছ কিনে থাকেন। এরপর শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত তারা পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করেন। পরে বস্তায় ভরে বস্তা হিসেবে তারা পিরোজপুর জেলায় আমড়া কেনাবেচার সবচেয়ে বড় মোকাম কাউখালীতে বিক্রি করেন। সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমড়ার চালান পাঠিয়ে দেয়া হয়। পিরোজপুর জেলার আমড়া আকারে বড় এবং সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক।

কাউখালী এলাকার আমড়া চাষী মহিদুল জানান, মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফার কারণে আমড়া উৎপাদনকারী গৃহস্থরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেপারীরা গৃহস্থদের কাছ থেকে এক বস্তা আমড়া ৮/ ৯শ’ টাকায় কিনে কাউখালী মোকামে বিক্রি করে থাকেন ১৮’শ থেকে ১৯’শ টাকা করে।  কাউখালীর ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, একটি আড়ৎ থেকে ঢাকা, চাঁদপুর বা মুন্সিগঞ্জ এক বস্তা আমড়া পৌছাতে খরচ হয় ২১০ থেকে ২১৫ টাকা। এরপর আড়তে  বিক্রয় মূল্যের শতকরা ১০ ভাগ আড়তদারী দিতে হয়। প্রতিটি বস্তায় বর্তমানে ১৫০০ আমড়া বোঝাই করা হয়। বর্তমানে কাউখালীতে এক বস্তা আমড়ার দাম ১৫ শত থেকে ১৬ শত টাকা। ঢাকায় বিক্রি হয় ১৮’শ  থেকে ২ হাজার টাকায়।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আমড়া বাংলাদেশের একটি সু-পরিচিত ফল। এটি ছেলে মেয়েদের অতি প্রিয়। আমড়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। খাদ্যপোযোগী প্রতি ১০০গ্রাম আমড়ায় রয়েছে ১.১ গ্রাম প্রোটিন, ১৫গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম স্নেহ, ০.২৮ মিঃ গ্রামঃ ভিটামিন-এ, ০.০৪ মিঃ গ্রাম ভিটামিন বি, ৯২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৫ মিঃ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩.৯ মিঃ গ্রাম লৌহ এবং ৮০০ মাইক্রোগ্র্রাম ক্যারোটিন। এ ছাড়া প্রতিটি আমড়ায় ৬৬ কিলোক্যালোরি খাদ্য শক্তি রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান আমাদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন। ফলে একদিকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করছে এবং অন্যদিকে আমড়া আর্থিকভাবে লাভবান করছে কৃষকদের।

এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা  কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অপূর্ব লাল সরকার বলেন, “আমড়া উপকূলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকারী ফসল। এ বছর কাউখালী ও স্বরূপকাঠিতে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে। এর বাগান করা বা চাষ করা খুবই সহজ। রোদেলা স্থানে উচু আইল করে সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করার ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। লাভজনক চাষ বিধায় এ দিকে চাষীদের নজর বেশি। রোগবালাই কম।” তিনি আরও বলেন, “এ অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া আমড়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। আমড়ার চারা লাগানোর জন্য উৎসাহিত করা এবং ফলন বৃদ্ধি ও রোগ-বালাই দমনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এখানে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে।”

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: