সাম্প্রতিক পোস্ট

দেশী প্রজাতির মাছগুলোকে রক্ষা করি

:: মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম ::

মানুষ প্রকৃতির বন্ধু নয়, ‘‘প্রকৃতিই মানুষের আসল বন্ধু”। প্রকৃতি মানুষের বেঁচে থাকার সকল উপকরণের যোগান দিয়ে যাচ্ছে নিরন্তর অথচ মানুষ কিনা সেই প্রকৃতিকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে দিনকে দিন। দেশী মাছের কথায় ধরা যাক, আমাদের দেশের নদ-নদীতে, জলাশয়ে, নালাতে, হাওরে, এমনকি সমুদ্রে, সাগরে একসময় মাছে সমৃদ্ধ ছিলো। মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদ বাক্যটির জন্ম মাছের প্রাচুর্যতা থেকেই। কিন্তু নদী-নালা দখল, জলাশয় ধ্বংস, দখল, অবকাঠামো নির্মাণ, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং জলাভূমি তথা নদ-নদী, জলাশয়ের ওপর অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে আজ মাছে অভয়াশ্রম বলতে আর কিছুই নেই। এছাড়া, বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ, পুকুরগুলোকে প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দেওয়া কিংবা পেশীশক্তি জোরে সেগুলো দখল করা, বিদেশি ও আগ্রাসী মাছ চাষসহ নানান কারণে আজ আমাদের দেশি মাছের বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অনেক দেশি মাছই এখন আর দেখা যায় না!

নদীমাতৃক দেশ বাংলা হলেও এদেশে শুধু নদী নয়, খাল-বিল, হাওর-বাওর ডোবা-নালা ইত্যাদি নানা ধরনের প্রাকৃতিক জলাশয়ে পরিপূর্ণ ছিল। নদ, নদী, খাল সব ধরনের জলাধার জলজ উদ্ভিদ এবং  মাছ আমাদের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ। আমাদের দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য আমিষের সহজলভ্য উপাদান ছিল মাছ। শুধু আমিষ নয় রসনা বিলাসে এর জুড়ি ছিল না। আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হলেই বিল বাওর থেকে পুটি কই, শিং, খলিসা, ডানকিনা ইত্যাদি মাছ ঢলের স্রোতে বেয়ে উঠে আসত মাঠে। খাল, নালা, খন্দক, সেখানে তারা ঠিম ছাড়ত। ডিম থেকে রেণু সৃষ্টি হয়ে বৃষ্টির পানিতে ছড়িয়ে পড়তো দেশের আনাচে কানাচে সবখানে। রুই প্রজাতির সকল মাছের ডিম নদী থেকে খালে, নালা দিয়ে প্লাবণভূমিতে এসে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তৈরি করতো। কিন্তু আজ সেগুলো অতীত। অথচ মাত্র দু’দশক আগেও দেশের ৮৪ হাজার গ্রামের মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হত উন্মুক্ত নদ নদী জলাশয়ের থেকে। দেশের কমবেশি প্রায় সব কৃষক পরিবারই উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ শিকার করে আমিষের চাহিদা মিটাত। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলা  বিশেষতঃ গোপালগঞ্জের চান্দার বিলে একসময় প্রচুর মাছ ছিলো। এই চান্দার বিলের মাছ দিয়েই ঢাকার মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হতো বলে শুনেছি। কিন্তু বর্তমানে সেখানেও হাহাকার, সেখানেও মাছের অভাব প্রকট। জেলেদের হাহাকার সর্বত্রই শোনা যাচ্ছে। কেননা তারা আগের মতো মাছ ধরতে পারছেন না বিধায় তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই আছে।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশি প্রজাতির মাছ? নানান কারণে আজ দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত শ্যালো পাম্প দিয়ে পানি সেচে মশারি জাল দিয়ে ছেঁকে মাতৃমাছ তো বটেই রেণু পোনা পর্যন্ত নিধন করে চলেছি আমরা। দ্বিতীয়তঃ এক শ্রেণীর ক্ষমতাশালীর হাতে উন্মুক্ত জলাশয়গুলোকে বা মাছের অভয়ারণ্য সৃষ্টির নামে দীর্ঘ মেয়াদী বন্দোবোস্ত দেওয়া। এসব প্রভাবশালী মানুষেরা প্রকৃত জেলে নয়; তারা মূলত মুনাফা করার জন্য এসব জলাশয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত নিয়েছেন। ফলে তারা দেদারসে মাছের পোণা ধ্বংস করেছেন এবং দেশি মাছের পরিবর্তে দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির মাছ চাষ করে ওই জলাশয়ে। তৃতীয়তঃ নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে প্রধান প্রধান নদ-নদীর বুকে অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ। এছাড়াও কৃষিতে রাসায়নিক সার, কীটনশাক ব্যবহার এবং সেই বিষ বৃষ্টির পানির সাথে চুইয়ে নদীতে, পুকুরে, ডোবা, নালাতে প্রবেশ করে এসব জলাশয়ের পানিকে দূষিত করে। ফলশ্রুতিতে বিষক্রিয়ায় অনেক মাছ মারা যায়। অন্যদিকে মাছের পোণা নিধন, ডিমওয়ালা মাছ ধরাসহ নানান কারণে আজ প্রাকৃতিক মাছের যোগান কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি বড় জাতের বোয়াল, চিতল, শোল, গজার, বাইম, টাকি, বেলে টাকি, সিং, মাগুর, রয়না, পুটি/সড়পুটি, খলিষা, টাটকিনী, মলা, ঢ্যালা, চ্যালা, গুতুম, ট্যাংরা, আইরসহ দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এছাড়াও পাবদা, চিংড়ি, চান্দা, চাপিলা, বাচা, কালিবাউস ইত্যাদি বিলুপ্ত বলা চলে।

জলাশয়ে, নদ-নদীতে, হাওড়ে, বাওড়ে এবং ডোবাগুলোতে আবার মাছে পরিপূর্ণ করতে গেলে নিন্মলিখিত বিষয়গুলো করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি-

প্রথমতঃ কৃষিকাজে কীটনাশক ব্যবহার না করে পোকামাকড় দমনের জন্য জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ উন্মুক্ত জলাশয় অর্থাৎ বিল, বাওর, নদী, খাল যেগুলো সরকারি সম্পত্তিগুলোকে কোন ব্যক্তি বিশেষকে বা নামমাত্র কোন সংগঠনকে লিজ বা বন্দোবস্ত না দিয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে লিজ দেওয়া।

তৃতীয়তঃ নদী-নালা বা জলাশয়ের ওপর কোন অবকাঠামো নির্মাণের আগে সেটি পরিবেশ বা নদী-নালার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে কি না তা যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণ।

চতুর্থত: মাছের পোনা নিধন এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে অন্য কেউ পোণা নিধন বা ডিমওয়ালা মাছ শিকার করতে সাহস পাবে না।

পঞ্চমতঃ ভরাট নদীনালা, ডোবা, জলাশয় পুনঃখনন করে দেশের সব নদ-নদীকে মাছের অভয়াশ্রম কিংবা প্রতিটি জেলা বা উপজেলায় নিদির্ষ্ট কোন জলাশয়কে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা।

সর্বোপরি মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ এবং মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে আমাদের দেশের নদী-নালা, খালবিল, পুকুর, ডোবা, হাওড়-বাওড়ে আবার দেশি প্রজাতির মাছে পরিপূর্ণ হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: