কৃষকের অধিকার রক্ষায় কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা

ঘিওর, মানিকগঞ্জ থেকে সুবীর কুমার সরকার
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। অথচ এই কৃষির ধরন নিয়ে আমাদের কোনো তর্ক নেই। দিনকে দিন বদলে যাচ্ছে কৃষির সামগ্রিক চেহারা। আমাদের কৃষি কেমন হবে? কৃষিজীবন কেমন হতে পারে এ নিয়েও আমাদের কোনো গল্প নেই। দিন দিন বদলে ফেলা হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, যেখানে জন্ম নিয়ে টিকে আছে সনাতন পদ্ধতির কৃষি। বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে কৃষি কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এদেশের মানুষের হাজার বছর ধরে কৃষির দর্শন ও সংস্কৃতি রয়েছে। এদেশের কৃষিপদ্ধতি মূলত গ্রাম জনপদ ও পরিবারনির্ভর। এক একটি গ্রামে ভিন্ন ভিন্ন কৃষিধারা আছে। কৃষিজমির ধরন, গ্রামীণ জীবন, শস্যফসলের বৈচিত্র্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি সবকিছু মিলেই আমাদের নানা অঞ্চলের নানা পদ্ধতির কৃষি। আর বৈচিত্র্যময় কৃষিজীবনের সম্ভার নিয়েই দেশের কৃষিপরিবেশ। আমাদের জমি-জলাভূমি আজ বিষের ভাগাড়, আমাদের বীজ ভান্ডার আজ শূন্য। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে আমরা এত বেশি বিষ ও প্লাস্টিক ব্যবহার করছি যে, আজ আমাদের খাদ্যশৃঙ্গল বিষাক্ত। আমরা মানুষ বা কোনো প্রাণ-প্রজাতির খাবারকেই নিরাপদ রাখিনি। আমরা কেবল চেয়েছি উৎপাদন আর উৎপাদন, কারণ আমরা সবকিছুই বাজারে বিক্রি করতে চেয়েছি। মুনাফার পাহাড় বানাতে দিশেহারা হয়েছি।


আজ প্রমাণিত হয়েছে, বিশ্বব্যাপী রোগশোক, অসুস্থতা আর মহামারীর কারণ হচ্ছে প্রতিবেশগত বিশৃঙ্গল ও অনিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা। আজ বিশ^জুড়ে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে সত্য কিন্তু এই খাদ্যব্যবস্থায় মানুষসহ গৃহপালিত প্রাণীর শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা খরচ ও ভোগান্তি বেড়েছে অনেকগুণ। আগে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, গ্যাস্টিক ও রক্তচাপের কথা খুব একটা শোনা যেত না। আজ এসব অসুস্থতা সব পরিবারের নিত্যসঙ্গী। মহামারী করোনার মতো সংকটে আজ মানুষের টিকে থাকাই যেন এক প্রশ্নের সম্মুখীন। জীবাশ্ম জ্বালানির নির্মম ব্যবহার ও কার্বন ব্যবহারে দুনিয়ার জলবায়ু উল্টে যাচ্ছে। আজ আমাদের রাসায়নিক কৃষি এই জলবায়ু সংকট সামাল দিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। প্রমাণিত হচ্ছে এখনো গ্রাম দুনিয়ায় কোনোমতে টিকে থাকা দেশি শস্যফসলের জাত আর গ্রামীণ কৃষিকারিগরিই জলবায়ু সংকট সামাল দিতে সক্ষম। কিন্তু এমন সব নির্দয় সংকট সামনে রেখেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কিছুই মানছে না।
গত এক যুগে আমাদের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, কিন্তু আমাদের মাটি এমনই উর্বর যে অকৃপণ হাতে ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত ফসল ফলিয়ে যাচ্ছে। এই উৎপাদনে কোথাও কোনো কমতি নেই। যেখানেই বীজ ছিটানো হয়, সেখানেই যেন সোনা ফলে। আমাদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, কৃষকও ভালো দাম পেয়ে খুশি হচ্ছেন। কিন্তু এতসব প্রাপ্তির আর সম্ভাবনার পরও আমরা সবাই একটা বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগি, তা হলো বাজার থেকে যে ফসল আমরা কিনে আনছি, তা সম্পূর্ণ নিরাপদ তো!


অনেকেই আজকাল ‘বিষমুক্ত সবজি’ কথাটি ব্যবহার করেন। ‘বিষ’ কথাটি শুনলেই বুকের মধ্যে কেমন ধক করে ওঠে। বাজার থেকে সবজি কিনে খাচ্ছি, তা ‘বিষাক্ত’ হবে কেন? কিন্তু সত্যিই আজকাল এ বিষয়টি আমাদের সবাইকে ভীষণ ভাবায়। এই বিষাক্ততার অন্যতম কারণ হলো অধিক লাভের আশায় ফসলের ক্ষেতে নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা আর সবজিকে টাটকা রাখতে বা দ্রুত ফল পাকানোর জন্য বিষাক্ত ফরমালিনের মতো ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার করা। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া ভালো ফলন পাওয়া যায় না এমন বিশ্বাসে চাষিরা ও এসবের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রায় সব মৌসুমে ব্যবহার করেন। এতে করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, মাটির গুণগতমান নষ্ট হচ্ছে, উদ্ভিদ ও ফসলের ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে জীববৈচিত্র্যর ভারসাম্যহীনতা।


খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষির স্বার্থেই আমাদের এমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যা একই সঙ্গে কৃষক ও পরিবেশবান্ধব। কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা মূলত বিজ্ঞান সম্মতভাবে স্থানীয়জ্ঞান ও চর্চাকে প্রাধান্য দিয়ে চাষাবাদের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ও চক্রকে সমুন্নত রেখে খাদ্যসার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিপদ্ধতি ও খাদ্যব্যবস্থাপনা যা কৃষক, কৃষি-শ্রমিক, প্রান্তিক উৎপাদক জনগোষ্ঠি এবং ভোক্তার নিজস্ব খাদ্য-সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ খাদ্যউৎপাদন ও খাদ্যগ্রহণের অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব প্রদান করে। একই সাথে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিকল্প কৃষিচর্চা প্রকৃৃৃৃতি পরিবেশ সুরক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য পরিচালিত সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ও বটে যা প্রান্তিক ।


তবে আশার কথা হলো বিষমুক্ত আর নিরাপদ খাদ্যের খাদ্য যোদ্ধা হয়ে কাজ করছেন নি¤œঅঞ্চল ও সমতল অঞ্চলের কৃষকরা। আজও সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে যাচ্ছেন যার যোদ্ধারা হলো কুন্দুরিয়া গ্রামের কৃষক সুবোল সরকার, রবি বিশ^াস, সুশীল বিশ^াসরা। দিঘুলিয়া গ্রামের কৃষক মোঃ চানঁ মিয়া (৫৫) বলেন, ‘আমি বাব দাদার সাথে কৃষি কাজে দেখতে দেখেতে কৃষি কাজ শিখেছি। এখনো তাদের পদ্ধতিতেই কৃষিকাজ করে যাচ্ছি। আমরা জমিতে গোবর প্রয়োগ করি, সারাবছর গোবর শুকিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার করি। এ ধরনের জৈবসারের উৎস হচ্ছে আবর্জনা সার, বাঁশেরা গোরা করে গোবর সার, উদ্ভিদ ও জৈব উৎস থেকে পাওয়া অন্যান্য বর্জ্য, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, সবুজ সার, ছাই, ধূপ ইত্যাদি। অনেক প্রকার গাছগাছড়া আছে যেগুলো পশুপাখির নানা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।’


তিনিন জানান, আমন মৌসুমে গভীর জলের ধানের জাত ভ্যাওয়্যালা, দিঘা, ড্যাপো, হিজুলদিঘা, হেচি বরণ, আর রবি মৌসুমে কলই (খেশারি) ও রাই সরিষা, মাঘি সরিষা , পেয়াঁজ, রসুন, ধনিয়া সজ, কালিজিরা, রাধুঁনী সজের চাষ করে যাচ্ছি আমরা। আমরা এখনো কোম্পানির উপর নির্ভর নই। কোম্পানির বিজ্ঞাপনে অনেক কৃষক কোম্পানির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।’


অন্যদিকে কৃষাণী সেলিনা আক্তার (৪৫) বলেন, ‘আমরা আলু, পেঁয়াজ, রসুনে গোবরের সাথে অল্প পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করি। কলই ও আমন মৌসুমের গভীর জলের ধানে কোন সার ব্যবহার করিনা। আমাদের সমস্যা হচ্ছে বর্ষা ঠিক সময় হয় না। গবাদি পশুর খাদ্য কলইয়ের ভূষি ও আমনের খৈয়ের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি।’ কুন্দুরিয়া কৃষক সংগঠনের সভাপতি সুবোল সরকার (৭০)বলেন, ‘কৃষক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে নানাভাবে সম্পৃক্ত করে, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বারসিক’র উদ্যোগগুলোর মধ্যে জৈব কৃষি নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করে যাচ্ছে, দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো জৈব কৃষি আন্দোলন।’

happy wheels 2

Comments