সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাদের সম্পদ আমরা টিকিয়ে রাখবো

সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে বাবলু জোয়ারদার

নিম পাতা বীজ তেল,
খৈল বা আগাছার ছাল,
সবকিছুই ধংস করে রোগ পোকাদের হাল,
তার চেয়ে ভালো বীজ বীজের গুড়া দ্রবণ,
শত্রু পোকা তাড়িয়ে দিয়ে ভরায় চাষির মন
-শেখ সিরাজুল ইসলাম।

প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল লবণাক্ত। দিন দিন লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আগে প্রকৃতিতে সব কিছুই পাওয়া যেত কিন্তু কালের বিবর্তনে বর্তমানে প্রকৃতিতে অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না বা কম পাওয়া যাচ্ছে। একসময় দক্ষিণাঞ্চলকে প্রকৃতির ভান্ডার বলা হতো। লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি ও ফসল উৎপাদনে মানুষ অতিরিক্ত মাত্রায় নানান ধরনের রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে প্রকৃতির অনেক উপাদান হারিয়ে যেতে বসেছে। এর মধ্যে অন্যতম অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য।প্রকৃতিতে এক সময় প্রচুর পরিমাণে অচাষকৃত বা কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদ পাওয়া যেত যা এখন কম পাওয়া যায়। এই অচাষকৃত বা কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিকাশে বারসিক’র সহায়তায় এসএসএসটি মুন্সিগঞ্জ ইউনিট কুলতলি ১৫৩ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পাড়া মেলার আয়োজন করে। পাড়া মেলা আয়োজনের মাধ্যমে অচাষকৃত বা কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের গুনাগুণ ও উপকারিতা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

মেলায় অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষের সংগৃহীত ও প্রদর্শিত গাছের নাম, প্রাপ্তিস্থান, ব্যবহার, গুনাগুণ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি মেলার বিষয়বস্তু হিসেবে আলোচিত হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পতিত জায়গা কমে যাওয়া ও লবণাক্ততার প্রভাবে অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বাজার নির্ভরশীলতায় এ উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে ব্যবহার কমে যাচ্ছে ফলে নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের মধ্যে এ উদ্ভিদ সম্পর্কে ধারণা কমে যাচ্ছে। তাই স্থানীয়দের মধ্যে বৈচিত্র্যময় এ উদ্ভিদের ব্যবহার বাড়িয়ে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে অচাষকৃত উদ্ভিদের ব্যবহার, প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করতে মেলাটি আয়োজন করা হয়।
মেলায় অংশগ্রহণকারী নারীরা তাদের সংগৃহীত অচাষকৃত উদ্ভিদের একটি করে স্বতন্ত্র দোকান দেন। তারপর তারা এক একজন করে তাদের সংগ্রহ করা উদ্ভিদগুলো দেখিয়ে তার নাম, প্রাপ্তিস্থান ও ব্যবহার সম্পর্কে উপস্থিত সকলকে অবহিত করেন।
অচাষকৃত বা কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদের মেলা সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের মন্তব্য জানতে চাইলে তাদের মধ্যে থেকে নতুন প্রজন্মের ছন্দা মন্ডল (১৮) মেলা সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা বাড়িতে খাবার হিসেবে অনেক শাক ব্যবহার করি, আমার জীবনে কাজে লাগাবো, আমি আমার বাবা মা ঠাকুরমাদের কাছ থেকে এই শাকের গল্প শুনেছি, আমি অন্যদেরকে জানানোর চেষ্টা করবো এবং চিকিৎসায় প্রাথমিক ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করবো ,বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের (কৃষি মেলা, বৃক্ষ মেলা, পিঠা মেলা) মেলার কথা শুনেছি এবং দেখেছি কিন্তু এর আগে আমরা এ ধরনের শাক ও ঔষধি গাছের পাড়ামেলা করতে দেখিনি। প্রকৃতির প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ সম্পর্কে জানার জন্য এই ধরনের মেলা আমাদের দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই মেলা থেকে আমারা নতুন নতুন অনেক কিছু জানতে পেরেছি। এই মেলা থেকে আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক জ্ঞান উপস্থাপিত হয়েছে। প্রকৃতির প্রয়োজনীয় এসব উদ্ভিদ বৈচিত্র্য আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করবো ও সংরক্ষণ করবো। এর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করবো, জানাবো।’


ইউপি সদস্য উৎপল জোয়ারদার মেলা সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা স্থানীয়রা ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিলে সংগ্রহে রাখতে পারব এই উদ্ভিদগুলো। আবার ছেলেমেয়েদেরও জানাতে পারব। আমাদের আবার পূর্ব জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে হবে।’ ১,২,৩ নং ওর্য়াডের নারী ইউপি সদস্য নীপা রানী চক্রবর্তী মেলা সর্ম্পকে বলেন, ‘বারসিক’র এই উদ্যোগ ব্যতিক্রমী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা বৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলছি গাছগুলো আমাদের বাড়িতে সবজি ক্ষেতের পাশাপাশি সংরক্ষণ করতে হবে। সবজি চাষের সাথে সাথে যদি আমরা এ ধরনের উদ্যোগ নিই তাহলে তা আমাদের খাদ্য চাহিদা পূরণে যেমন বৈচিত্র্যতা নিয়ে আসবে তেমনি ঔষধের প্রয়োজন পূরণেও ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি আমাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ধারনা সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে। পরিবার থেকে জানার ক্ষেত্রটা তৈরি হবে।”
স্থানীয় কৃষক-কৃষাণী, যুব শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে ১৭টি দোকানের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীগণ ১৩৩ প্রকার উদ্ভিদ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে অচাষকৃত উদ্ভিদের ব্যবহার, প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে ধারণা ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। মেলায় অংশগ্রহণকারী ১৭টি দোকানের মধ্যে ২টি দোকান ছিল নতুন প্রজন্মের। পাড়া মেলায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে ১৩৩ ধরনের অচাষকৃত উদ্ভিদ নিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন ছন্দা মন্ডল (১৮), ৯১ ধরনের অচাষকৃত উদ্ভিদ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন প্রশান্ত কুমার সরদার (৬৪) এবং ৩৬ ধরনের অচাষকৃত উদ্ভিদ নিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন লতা রানী মন্ডল (৩১)।

প্রাকতিক সম্পদে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও উন্নয়নে লোকায়ত জ্ঞান ও চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা রাখতে বারসিক কাজ করে চলেছে। মেলার মাধ্যমে অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের ব্যবহার ও বিকাশ সম্পর্কে সকলের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও সংরক্ষণে উদ্যোগী করা। অচাষকৃত উদ্ভিদের ব্যবহার বৃদ্ধিতে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হবে। সকলের সম্পৃক্ততায় প্রকৃতি সম্পর্কে জানা ও গ্রাম পর্যায়ে এই মেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: