সাম্প্রতিক পোস্ট

জলবায়ুজনিত প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষক

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং

বাংলাদেশ একটি প্রকৃতিনির্ভর কৃষি প্রধান দেশ। দেশের মোট ভূ-খন্ডের ৬% হাওর। হাওরের জমি মূলত এক ফসলী এবং শুধুমাত্র বোরো মৌসুমে ধানের চাষ হয়। হাওরাঞ্চলে অবশ্য কিছু কিছু উঁচু কান্দা জমি রয়েছে যেখানে সামান্য পরিমাণে আমন মৌসুমে ধানের চাষ হয়। আবার কিছু জমি রয়েছে যেখানে বাদামসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি অল্প পরিমাণে চাষ হয়। তবে মূল হাওরের জমি মূলত এক ফসলী। হাওরে শুধুমাত্র বোরো ধান ও মাছের চাষ হয়। একমাত্র ফসল বোরো ধান ঘরে তোলা নির্ভর করে মূলত প্রকৃতির উপর। প্রতিবছর বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা করে হাওরাঞ্চলের কৃষকদেরকে বোরো ধান ঘরে তুলতে হয়। প্রতিবছরই কৃষকদেরকে খরা, আগাম বন্যা, ঢেউ, প্রচন্ড বাতাস (আফাল), শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, ফসলের রোগবালাই ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়। যে বছর তেমন কোন দূর্যোগ হয়না, সে বছর হাওরের কৃষকরা প্রচুর পরিমাণে ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হয়। ২০১৭ সালের বোরো মৌসুমে ধান কাটার আগাম মূহুর্তে হঠাৎ আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক ধান কাটতে পারেনি এবং ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে বছর বোরো ধান চাষ করে ঋণগ্রস্ত হয়নি এমন কৃষক ছিল না বললেই চলে। তবে ২০১৮ সালে বোরো মৌসুমে কৃষকরা ধানের বাম্পার ফলন ঘরে তুলে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। গত বছর বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সকলের মূখেই ছিল আনন্দ ও প্রশান্তির হাসি, কেননা ধানের ফলন হয়েছিল রেকর্ড পরিমাণে। কিন্তু বছর না ঘুরতেই চলতি বোরো মৌসুমে সে হাসি কৃষকদের মূখ থেকে মিলিয়ে গেছে। তবে এর কারণ কিন্তু আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি বা ফসলে রোগ-বালাইয়ের আক্রমণের জন্য নয়। এর অন্যতম কারণ হল হাওরাঞ্চলের বোরো ধানের অজ্ঞাত রোগ।

DSC01146-W600
চলতি বোরো মৌসুমে ধানের চাষ করে কৃষকরা আনন্দে বুক বেঁধে ছিল এবং মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করছিল আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে থেকে যেন ফসল রক্ষা পায়। সৃষ্টিকর্তার মহান কৃপায় অদ্যাবধি পর্যন্ত আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি না হলেও হাওরাঞ্চলের কৃষকরা মাঠের ফসল ঘরে তুলতে পারছেনা। কৃষকদের এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা না পারছেন মাঠের ফসল ঘরে তুলতে আবার না পারছেন ফসল মাঠে ফেলে রাখতে। অজ্ঞাত কারণে হাওরাঞ্চলের বোরো ধানের শীষে ব্যাপক চিটা হওয়ায় কৃষকরা মাঠের ধান কেটে আনতে পারছে না। হাওরের কোন কোন এলাকার জমিতে প্রতি শীষে এতটাই চিটার পরিমাণ যে, কৃষকরা ধান কাটার খরচের সমান ধান না পাওয়ার আশংকায় ধান কাটছেনা। আবার যাদের গরু রয়েছে তারা অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও বাধ্য হয়ে গো-খাদের (খড়) জন্য হলেও ধান কেটে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষকদের মতে, হাওরের অধিকাংশ জমির ধানের শীষের ৭০-৮০% ভাগই চিটা হয়েছে। ২০১৮ বোরো মৌসুমে হাওরের জমিতে যেখানে প্রতি একরে ৭০-৮০ মণ ধান হয়েছিল চলতি মৌসুমে কৃষকরা সেখানে প্রতি একরে মাত্র ১৫-২০ মণ ধান ঘরে তুলতে পারছে। আবার অনেক কৃষক একরে ১০ মণ ধানও তুলতে পারছেনা।

DSC01147-W600
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন ও মদন সদর ইউনিয়নসহ সকল ইউনিয়নের বোরো মৌসুমে ব্রি-২৮ ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে ব্রি-২৮ জাতের চেয়ে ব্রি-২৯ জাতে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি হয়েছে (প্রায় ৫০% ভাগ) বলে কৃষকরা জানায়। কৃষকদের মতে, হাওরের জমিতে চাষকৃত ব্রি-২৯ জাতের ধানে ৪০-৫০% চিটা হয়েছে। তবে এতে তারা খরচের টাকাটা অন্তত তুলে আনতে পারবে বলে আশা করছেন।

গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের খালাশিপাড়া, পশ্চিমপাড়া, নয়াহাটি, বারইঘড়িয়া, মাঝিপাড়া, কদমশ্রী গ্রামের কৃষক রইছউদ্দিন, পলাশ মিয়া, আব্দুল খালেক, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ রানা, আনিস মিয়া, আব্দুল হেলিম, বাবুল মিয়া, আনোয়ার মিয়া এবং মদন সদর ইউনিয়নের উচিতপুর ও কুলয়াটি গ্রামের কৃষক রকুনুদ্দিন ও আব্দুল কাদির (১০ জন কৃষক) চলতি বোরো মৌসুমে ৪৮.৯০ একর জমিতে ব্রি-২৮ (৪১.৫০ একর) এবং ব্রি-২৯ (৭.৪০ একর) জাতের ধান চাষ করেছেন। কৃষকরা জানায়, তাদের ৪১.৫০ একর জমির ব্রি-২৮ ধান ৭০-৯০% চিটা হয়েছে এবং ব্রি-২৯ জাতের ধান ৪০-৫০% চিটা হয়েছে। বিশেষ করে হাওরের ভিতরের দিকের জমির ধানে বেশি চিটা হয়েছে। গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক রইছউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘আমি ৮০ কাঠা (৮ একর) জমির ব্রি-২৮ জাতের ধান কেটে ৬৫ মণ ধান পেয়েছি। কাঠা প্রতি আমার এক মণেরও কম (০.৮১২ মন) ফলন হয়েছে। আমি যদি আগে জানতাম এমন হবে, তাহলে ক্ষেতের ধান কাটতামনা। এক কাঠা (১০ শতাংশ) জমির ধান কাটতে আমার মোট খরচ হয়েছে ৮৫০ টাকা (কাটা ৫০০ টাকা, পরিবহন ২৫০ টাকা এবং মাড়াই ১০০ টাকা)। ৮০ কাঠা জমির ধান কাটতে আমার খরচ হয়েছে ৮৫০ী৮০= ৬৮,০০০/- (চৌষট্টি হাজার), প্রতি মন ধানের বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ৫২০/-। ৮০ কাঠা জমির ৬৫ মণ ধানের বর্তমান বাজার মূল্য ৩৩,৮০০/- (৬৫ ী ৫২০), ধান কাটায় খরচ হয়েছে ৬৮,০০০/- (৮০ কাঠা জমির ধান কাটা বাবদ ক্ষতি ৬৮,০০০-৩৩,৮০০=৩৪,২০০ টাকা)। ৮০ কাঠা জমির ধান কাটার জন্য আমার যে খরচ হয়েছে একটি গরু বিক্রি করে সে খরচ আমাকে মিটাতে হবে। আশা করেছিলাম ১০ কাঠা জমির ব্রি-২৯ ধানের ফলন ভালো পাব, কিন্তু সে আশাতেও গুড়ে বালি। সরেজমিন মাঠ ঘুরে দেখলাম ব্রি-২৯ ধানেও ৪০-৫০% চিটা হয়েছে।’

DSC01176-W600
মদন সদর ইউনিয়নের কুলিয়াটি গ্রামের ৭০ বছর বয়স্ক কৃষক রকুনুদ্দিন তালুকদার ৩ আড়া বা ৪৮ কাঠা (৪.৮ একর) জমিতে বোরো চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৩৮ কাঠা (৩.৮ একর) জমিতে ব্রি-২৮ এবং ১০ কাঠা (১ একর) জমিতে ব্রি-২৯ ধান রোপণ করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি প্রায় ৩০ কাঠা জমির ব্রি-২৮ ধান কেটেছেন। প্রতি কাঠায় (১০ শতাংশ) তিনি এক মণ করে ধান হবে বলে জানান। ৮ কাঠা (৮০ শতাংশ) জমির ধান না কেচে ফেলে রেখেছেন। কৃষক রকুনুদ্দিনের মত উচিতপুর গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া ২০ কাঠা (২ একর), গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক আব্দুল হেলিম মিয়াও ১০ কাঠা (এক একর), কৃষক বাবুল মিয়া ৩০ কাঠা (তিন একর) জমির ধান না কেটে জমিতেই ফেলে রেখেছেন।

কুলিয়াটি গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদির ১০ কাঠা জমিতে ব্রি-২৯ জাতের ধানের চাষ করেছেন। তার ধানেরও একই অবস্থা। ২৫-৩০ ভাগই চিটা হয়েছে। তবে কিছুটা কান্দা জমি হওয়ায় রক্ষা। বাজারের বীজ দিয়ে চাষ করলেও তিনি বীজের কোন সমস্যা ছিল বলে মনে করছেন না। তার মতে, ফাল্গুন মাসের শুরুতে ধানের শীষ বের হওয়ার সময়ে এবং কাইছ থোরের সময়ে বৃষ্টি হওয়ার পর বেশ কিছুদিন ঠান্ডা ও কুয়াশা হওয়ায় ধানের এমন সমস্যা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

DSC01187-W600
কৃষক রইছউদ্দিন, রকুনুদ্দিন, আব্দুল হেলিম, রকুনুদ্দিন, জামাল মিয়ার মত কৃষক আব্দুল খালেক, জাহাঙ্গীর আলম, পলাশ মিয়া, মাসুদ রানা, আনিস মিয়ার মত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ধানের চিটা হওয়ার কারণ হিসেবে মনে করছেন ধানের কাইচ থোর অবস্থায় কুয়াশা ও ঠান্ডাজনিত কারণে এ অবস্থা হয়েছে। আবার কেউ কেউ এটি আল্লাহর গজব বা ভাগ্যে নাই বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বীজের সমস্যা বলে মনে করছেন। কেউ কেউ বেশি আগাম চাষ করার ফলে হয়েছে বলছেন। কিন্তু অনেক কৃষক এটি মানতে রাজি নয়, তাদের মতে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও একই সময়ে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ করেছেন, কিন্তু কোন বছর এমনটি হয়নি। কোন কোন কৃষকদের মতে, ধানের শীষ বের হওয়ার সময়ে পরাগায়ন না হওয়ায় (কৃষকদের ভাষায় ফুলের সোনা ধানের গর্ভে প্রবেশ করতে না পরায় চাল ভরেনি) চিটা হয়েছে। মদন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতে, কাইচ থোর ও শীষ বের হওয়ার মূর্হুতে ঠান্ডা ও কুয়াশার জন্য ধানের ফলনের এমন বিপর্যয়। ধান গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক টিম সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে মাঠে কোল্ড ইনজুরির প্রমাণ পেয়েছেন বলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান।

DSC01199-W600
কৃষক আব্দুল কাদির এ প্রতিবেদকের নিকট বিপ্লব ও ব্রি-৯ জাতের ধানের বীজ দিয়ে সহযোগিতার আহবান জানান। তার মতে, এই দু’টি জাত হাওরাঞ্চলের জন্য উপযোগি। এ ধরণের অপ্রত্যাশিত দূর্যোগ মোকাবেলায় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কৃষকদের চাহিদানুযায়ী ধান বীজ সহযোগিতা প্রদান এবং ধানের বিকল্প ফসলের জাত গবেষণার মাধ্যমে এলাকা উপযোগি ফসলের জাত নির্বাচন করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারী বিভাগসমূহ বিশেষভাবে কৃষি বিভাগ যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে আমরা আশাবাদী।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: