সাম্প্রতিক পোস্ট

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি মজুদক্ষমতা ১ কোটি টনে উন্নীত করার দাবি

ঢাকা থেকে ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল:

কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য এলাকাভিত্তিক শস্য সংরক্ষণাগার ও ক্রয় কেন্দ্র খোলার দাবি জানিয়েছেন “ধানের ন্যায্যমূল্য : সংকট ও প্রস্তাবনা” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা। আজ ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ বৃহস্পতিবার, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, সকাল ১১ টায়, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও বারসিক আয়োজিত নাগরিক সংলাপে পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান-এর সভাপতিত্বে ও পবা’র সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জলের সঞ্চালনায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করবেন বারসিক’র পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস। সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষকনেতা ও সাবেক সাংসদ ছবি বিশ্বাস। আলোচনা করেন পবার সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আব্দুস সোবহান, কৃষক সমিতির উপদেষ্টা জামাল হায়দার মুকুল, হাওর অঞ্চলবাসীর সমন্বয়ক ড. হালিম দাদ খান, কৃষিবিদ এবিএম তৌহিদুল আলম, মো. জাহাঙ্গীর আলম, বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, কবি লিলি হক, কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এ এস এম বদরুল আলম, প্রকৌশলী আনোয়ার, শিক্ষার্থী প্রমূখ। মূল প্রবন্ধে বারসিক’র পরিচালক সৈয়দ আলী বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশের কৃষকদের শ্রমে ঘামে উৎপাদিত ধানের বাজারমূল্য কম থাকায় কৃষকরা বর্তমানে দিশেহারা। প্রতিবছর লোকসান গুনে গুনে কৃষির উপর দিনদিন আস্থা হারিয়ে ফেলছে এদেশের কৃষককূল। সেমিনারে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কৃষকদের অবদান, উৎপাদিত ধানের নায্যমূল নিশ্চিত করার জন্য ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানান তিনি।

01সেমিনারে বক্তারা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা শুধুমাত্র কৃষকের জীবন জীবিকার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের আপামর জনগণের জন্য প্রয়োজন। এই খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে শহরমূখী জনস্রোত বন্ধকরে গ্রাম উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে এবং তা অপরিহার্য। বক্তারা আরো বলেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ন, শিল্পায়ন আর নানাবিধ কারণে কৃষি জমির হ্রাস, কৃষি উপকরণের নানা সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বিভিন্ন অভিঘাত মোকাবেলা করে এদেশের কৃষকরা দেশের চাহিদা অনুযায়ী ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৪.২৩% যেখানে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০% জড়িত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ধান উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে শীর্ষে। ২০১৮ সালে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৬৭ শতাংশ, পূর্বাভাস অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে। যদিও এই সাফল্যের অংশীদার কৃষক, সরকার, কৃষি গবেষণা ও কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহ। কিন্তু এই সাফল্যের সুবিধা থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন এদেশের কৃষকরা। ধানের উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক মূল্য পাচ্ছেন কৃষকরা। বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতি কেজি ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয় ২০-২২টাকা আর বর্তমানে কৃষকের বিক্রি করতে হচ্ছে ১২-১৩ টাকায়।

পৃথিবীর সবচে বড় ব-দ্বীপ নদীমাতৃক বাংলাদেশের মোট আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগ হাওর এলাকা। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড এর হিসাব মতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশের সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই ৭টি জেলার ৬০টি উপজেলার ৫৩৯টি ইউনিয়নে মোট ৪২৩টি ছোটবড় হাওর রয়েছে, যেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। হাওর জনপদের মানুষের সেই সার্বভৌমত্বের হাওর-জীবন আজ নানা মাত্রায় বিপন্ন, যার অন্যতম ক্ষেত্র কৃষি। ভোগাই, সুমেশ্বরী, উমিয়াম, নয়াগাং (খাসিয়ামারা), জালুখালি (চলতি), নিতাই, চিতল, যাদুকাটা-রক্তি, সুরমা, কুশিয়ারা, ধলা, সারী-গোয়াইন, পিআইন, সোনাই-বরদল, মনু, ধলাই, জুড়ী, লংলা, খোয়াই, সুতাং, সোনাই, কোরাঙ্গী ভারতীয় এলাকা থেকে উৎপন্ন এই ২২টি নদী ও সীমান্তবর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা নানা পাহাড়ি ছড়ার জলধারা হাওর ও বিলে পানি জমা হয়ে এবং হওরের বিভিন্ন নদী, ছড়া, খাল দিয়ে তা আস্তে আস্তে মেঘনা নদী দিয়ে নিস্কাশিত হয়। কিন্তু বর্তমানে পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা বালির ফলে এসব নদী খাল হাওর ও বিলগুলো ভরাট হয়ে এখানকার কৃষিপ্রতিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। সেই সাথে প্রয়োজনীয় সংস্কার না থাকায় হাওরের পানি নিস্কাশন হতে সময় লাগছে অনেক বেশি। এর ফলে বোরো মৌসুমে ধান চাষে দেরি হচ্ছে, যার ফলে হাওরে আগাম বন্যার ঝুকি বাড়ছে। এমনিতেই কৃষি শ্রমিক সংকট, কৃষি উপকরণের চড়া মূল্য ও মানসম্মত কৃষি উপকরণের অভাব, ধান প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা, উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য না পাওয়া প্রভৃতি কারণে হাওরের কৃষি ও কৃষকরা নানা মাত্রায় বিপর্যস্ত। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে একক কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল হিসেবে হাওরেই সব চেয়ে বেশি ধান উৎপাদিত হয়, শুধু বোরো মৌসুমেই যে ধান উৎপাদন হয় তা দেশের মোট ধান উৎপাদনের ১০%। ফলে চলমান সমস্যাগুলোর কারনে হাওরে ধানের উৎপাদন কমে গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তা হবে এক বড় হুমকি। এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করা জরুরী।

02সেমিনার থেকে নিন্মোক্ত সুপারিশসমূহ তুলে ধরা হয়:
১. ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের মজুদক্ষমতা ১ কোটি টনে উন্নিত করা। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এমনকি ক্ষেত্রভেদে কৃষক ও স্থানীয় পর্যায়ে ধানসহ কৃষিপণ্য মজুতকরণের শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
২. কৃষকদের মতে কমপক্ষে মোট উৎপাদন খরচের ২৫% লাভে ধানের বাজার মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের আর্দ্রতা, রাসায়নিকের উপস্থিতিসহ পণ্যের মানযাচাইয়ের নামে কৃষক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। মানযাচাইসহ পণ্যের বাজার উপযোগিতার বিষয়গুলো চাষের পূর্বেই কৃষককে সরকারিভাবে অবহিত করতে হবে।
৩. হাওরের কৃষিজমির শ্রেণীবিভাগ করে একক ফসল নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প মেয়াদী রবিশস্য চাষে প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে কৃষকদের সম্পৃক্ত করে প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে উপযোগি ফসল চাষে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। হাওরের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে হবে। হাওর এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে উৎপাদিত শস্যফসল সংরক্ষণ ও নায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য শস্য গুদাম, সংরক্ষণাগার এবং উপজেলা ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
৪. প্রতি কৃষি মৌসুমের শুরুতেই কৃষি প্রতিবেশ, কৃষকের সামাজিক পরিস্থিতি, ক্রেতা-ভোক্তার চাহিদা এবং চলমান জীবনযাত্রাকে বিবেচনা করে মওসুম ভিত্তিক ধানসহ কৃষিপণ্যের একটি সুনির্দিষ্ট মূল্যতালিকা নির্ধারণ করতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. সরকারি মূল্যে ধানসহ কৃষিপণ্যের ১/৩ অংশ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য একটি সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষকের নিজস্ব কৃষিকার্ড (পরিবারের সদস্যসহ) এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটার আইডি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিজন কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের সীমা বাড়াতে হবে (কৃষক যত পরিমাণ ধান বিক্রি করতে চান)। সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
৬. বিশেষ পরিস্থিতি ও দুর্যোগকালীন সময়ে শহর ও গ্রামের নিন্ম আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহ করে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে সরকারিভাবে কৃষক থেকে ক্রয়কৃত ধানসহ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করণও রপ্তানি করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৭. কৃষিতে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বাড়াতে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষির উৎপাদন, মজুতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন ও বহুমুখীকরণের নানা স্তরে নানাভাবে তরুণদের আগ্রহ, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার নিরিখে যুক্ত করতে বিশেষ প্রণোদনামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। ফসল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে।
৮. কৃষির সাথে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে জড়িত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসূচি সমূহের তথ্য নিয়মিত পাবলিক করা জরুরি এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আরো দায়িত্বশীল ও দায়বদ্ধকরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে কত দামে কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে এবং প্রতিটি মৌসুমে কী ধরণের কৃষিপণ্য কতটুকু উৎপাদন ও মজুত হয়েছে এবং ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে এসবের সামগ্রিক তথ্য সরকারিভাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্রে হালনাগাদ থাকতে হবে।
৯. হাওরসহ দেশের সকল এলাকায় কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণসহ শস্য বীমা চালু করতে হবে এবং ঋণগ্রহনের ক্ষেত্রে কৃষক যেন হয়রানি শিকার না হয় তা মনিটরিং করতে হবে।
১০. হাওরের ফসল ঘরে তোলার জন্য হাওরের সাথে গ্রামের সংযোগ রাস্তাগুলোকে কংক্রিট দিয়ে ডুবো রাস্তা তৈরি করতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: