সাম্প্রতিক পোস্ট

করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় গাছগাড়য়া যুব সংগঠনের গৃহীত উদ্যোগ

নেত্রকোনা থেকে শংকর ম্রং:
মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বর্তমানে একটি বৈশ্বিক দুর্যোগ। পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই, যে দেশে কম-বেশি করোনা সংক্রমণ ঘটেনি। বাংলাদেশে চলতি বছরের ৮ মার্চ প্রথম বিদেশ ফেরত একজন লোকের শরীরে করোনা পজিটিভ চিহ্নিত হয়। দিনে দিনে বাংলাদেশেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধি ও করোনায় মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে মহামারী আকার ধারণ করেছে। করোনা সংক্রমণ রোধে তাই বাংলাদেশ সরকার দেশের সকল পরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বাধ্যতামূলক বন্ধ ঘোষণা করে। বন্ধ হয়ে যায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশনও। অতপর সকল কর্মজীবীরা নিজ নিজ গ্রামের বাড়ি চলে যায়। বিশেষভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গ্রামে গিয়ে অঢেল অবসর সময় পার করছেন। কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাশ ও পরীক্ষা গ্রহণ করলেও অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই কোন ক্লাশের ব্যবস্থা না থাকায় এবং পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কোন সম্ভাবনা না থাকায় শিক্ষার্থীরা অনেক অবসর সময় যাপন করছে। এখন তাদের না আছে কোন পড়াশোনা, না আছে কোন কাজ। কিন্তু তাই বলে সকল শিক্ষার্থীরাই যে গ্রামে গিয়ে বসে বসে অলস সময় পার করছে তা কিন্তু নয়। তারা গ্রামের সমমনা, সমবয়সি ও সহপাঠিদের নিয়ে গড়ে তুলেছে গ্রামভিত্তিক যুব সংগঠন। করোনা মোকাবেলায় তারা নিয়েছে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের এমনই একটি সংগঠন গাছগড়িয়া যুব সংগঠন। সংগঠনের মোট সদস্য সংখ্যা ১৫ জন। সংগঠনটির অধিকাংশ সদস্যই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। করোনাকালীন সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংগঠনের সকল যুব সদস্যরা গ্রামে চলে আসে। গ্রামে এসে যুবরা শুধু সংগঠিত হয়েই বসে নেই, তারা করোনাকালীন সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করছে। গাছগড়িয়া যুব সংগঠনের গৃহীত ব্যক্তিগত ও যৌথ উদ্যোগগুলো নিম্নে তুলে ধরা হল:

১. গ্রামবাসীদেরকে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে এবং এ থেকে রক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে চলেছে। বাজারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্থানীয় বাজারে (দেওপুর বাজার) ব্যবসায়ীরা ও কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত সবজিসহ সকল শস্য বেচাকেনা করে সেজন্য বাজার কমিটির সাথে আলোচনা করে বাজার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করেছে।
২. করোনাকালীন সময়ে করোনা প্রতিরোধে যুবরা ব্যক্তি ও যৌথ উদ্যোগে বসতভিটায় বৈচিত্র্যময় সবজি যেমন-পুইশাক, করলা, চালকুমড়া, মরিচ, ডাটা, টমাটো, পেঁপে, ঝিঙ্গা ইত্যাদি চাষ করেছে। আবার ২/৩ জন করে যুবক মিলে যৌথভাবে পুকুরের পাড়ে পেঁপে, পুইশাক ও মরিচ চাষ করেছে। আবার কেউ কেউ একক উদ্যোগে প্রথমবারের মত গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করেছে। উৎপাদিত সবজি তারা পরিবারের সকল সদস্যদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত্ব সবজি বাজারে বিক্রি করে করোনাকালীন সংকটে পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। গ্রামের অন্যরাও তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সবজি চাষ করে নিজ নিজ পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারছে। পুকুরের পারে সবজি চাষ করায় বর্ষা মৌসুমে বৈচিত্র্যময় সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়েছে।
৩. সংগঠনের যুব সদস্যরা গ্রামের কৃষক সংগঠনের সদস্যদের সাথে যৌথভাবে নিচু ধানের ক্ষেতে বড় আইল দিয়ে মাছের পোনা উৎপাদন ও বৈচিত্র্যময় মাছের চাষ করেছে। ফলে এলাকার সাধারণ মৎস্য চাষিদের নিকট বৈচিত্র্যময় মাছের পোনার সহজলভ্যতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সকলে গ্রাম থেকেই ভালো মাছের পোনা সংগ্রহ করতে পারছেন।
৪.সংগঠনের তিনজন যুব সদস্য একত্রে ২৫০টি এক দিনের হাঁসের বাচ্চা কিনে আড়াই থেকে তিন মাস পর্যন্ত পালন করে বিক্রি করে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হয়েছে। বোরো ধান কাটার সময়ে হাঁসের বাচ্চা পালন করায় হাঁসের জন্য বাড়তি তেমন খাবার দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। মাঠে ঝড়ে পড়া ধান পোকামাকড় খেয়ে বাচ্চাগুলো বড় হয়েছে, ফলে খরচ কম হয়েছে। এভাবে যুবকরা করোনাকালীন সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছে।
৫. সংগঠনের চারজন সদস্য যৌথভাবে করোনাকালীন সময়ে এলাকার পরিবেশগত উন্নয়নে বৈচিত্র্যময় গাছের চারা উৎপাদনের জন্য নার্সারি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে নার্সারিতে তারা ২০০টি গর্জন, ৩০০টি কৃষ্ণচুড়া, ৩০০টি জামের বীজ রোপণ করেছে। এছাড়া স্থানীয় জাতের আমের চারাতে আ¤্রপালি ও অন্যান্য উন্নত জাতের আমের কলম চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বনাথপুর কৃষাণী সংগঠনের সদস্যরা যুবকদেরকে কাঁঠালের চারা উৎপাদনের জন্য বীজ দিয়ে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। এছাড়াও যুবকরা ধারাবাহিকভাবে নার্সারিতে নিম, পেয়ারা ও পেঁপেসহ এলাকার চাহিদার ভিত্তিতে সকল ধরণের (কাঠ, ফল, ঔষধি, মরিচ ও সবজি জাতীয়) চারা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাজার থেকে সবজি ও ফলের চারা কিনে চাষ করে অনেক সময়েই কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছে, তাই তারা নার্সারিতে ভালো জাতের মানসম্মত চারা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানায়।
৬. যুব সংগঠনের সকল সদস্যরাই কৃষকের সন্তান, কৃষি তাদের রক্তের সাথে মিশে রয়েছে। তাই করোনাকালীন সংকটে যুবকরা এলাকার কৃষির উন্নয়নে এলাকায় ধানের জাত বৈচিত্র্য উন্নয়ন এবং গ্রামের কৃষক ও কৃষাণীদের গড়ে তোলা কৃষি তথ্য কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করতে আমন ২০২০ মৌসুমে ২২টি স্থানীয় জাতের ধান নিয়ে ১০ শতাংশ জমিতে এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনে প্রায়োগিক কৃষি গবেষণা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা ২২টি জাতের ধানের বীজ বীজতলায় বপন করেছে। উদ্যোগগুলো গ্রহণের বিষয়ে যুব সংগঠনের নেতৃ স্থানীয় যুবক আবু নাঈম বলেন, ‘আমার বাবা করোনা সংকট শুরুর মূহূর্তে মারা গেলে আমার ময়মনসিংহ পলি টেকনিক্যালে ডিপ্লোমা পড়ার খরচসহ গোটা পরিবারের খরচ চালানোর দায়িত্ব পড়ে আমার বড় ভাইয়ের উপর। আটো চালিয়ে যে সামান্য রোজগার হয় তা দিয়েই আমার ও আমার ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচসহ অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়। তাই করোনাকালীন সংকটে বাড়ি এসে আমি উঠানের খালি জায়গায় সবজি চাষ করেছি এবং অন্য এক বন্ধুর সাথে যৌথভাবে পুকুরের পাড়ে পেঁপে ও সবজি চাষ এবং ২৫০টি একদিনের হাঁসের বাচ্চা কিনে পালন করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আড়াই মাস পালনের পর এখন হাঁসগুলো বিক্রি করছি। পূঁজি না থাকায় হাঁসগুলো ডিম উৎপাদন পর্যন্ত পালন করতে পারিনি। এছাড়াও চারজনে মিলে গ্রামে একটি বৈচিত্র্যময় গাছের চারা উৎপাদনের জন্য নার্সারি স্থাপনের কাজ করছি। আমাদের যৌথ প্রয়াস সফলতা পাবে বলে আমরা আশাবাদী।’


অপর একজন যুব সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘গ্রামের একটি কৃষক সংগঠন ও নারী সংগঠনের পরিচালনায় একটি কৃষি তথ্য কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। কৃষি তথ্য কেন্দ্রটি সমৃদ্ধ করতে আমরা যুবকরা এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচনে ২২টি জাতের ধান নিয়ে প্রায়োগিক গবেষণা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। গবেষণাটি সম্পন্ন হলে আমরা কৃষি তথ্য কেন্দ্রে ২২টি ধানের বীজ দিয়ে কেন্দ্রটি সমৃদ্ধ করতে পারবো। গবেষণা থেকে কৃষকদেরকে এলাকা উপযোগি ধানের জাত নির্বাচন করে দিতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়াও আমরা বাবা-মাকে পরিবারের বিভিন্ন কাজে (মাছ ও সবজি চাষ) সহযোগিতা করে পরিবারের খরচ কমাতে এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করছি।’ অপর এক যুব সদস্য বায়োজিত অন্যদের সাথে যুক্ততার পশাপাশি বড় ভাইয়ের সাথে গ্রীষ্মকালীন টমাটো চাষের উদ্যোগ নিয়েছে। বড় ভাইয়ের একটি হাতের সমস্যা থাকায় শুধুমাত্র এক হাতে সকল ধরণের কাজ করতে পারেন না। সে বড় ভাইকে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে বেড তৈরি, চারা রোপণ ও চালা তৈরিতে সহযোগিতা করেছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশের সকল শ্রেণী, পেশা ও বয়সের সকল ধরণের কার্যক্রমে দীর্ঘকালীন সময়ের জন্য স্থবিরতা সৃষ্টি করলেও গ্রামীণ জীবন ও কৃষি কার্যকে স্থবির রাখতে পারেনি। বরং বলা যায় যে, করোনাকালীন সংকটে কৃষির অনেকটা উন্নয়ন হয়েছে। গ্রামের যেসব জমি বেশির ভাগ সময় পতিত পরে থাকত, সেসব জমি করোনাকালীন সংকটে চাষের আওতায় এসেছে। গ্রামে লোকবল বেশি থাকায় কৃষি শ্রমিকের কোন সংকট হয়নি। বোরো মৌসুমে ধানকাটা ও মাড়াই বাবদ খরচ অনেকটা সাশ্রয় হয়েছে। করোনাকালীন সংকটে শিক্ষার্থী যুবদের গ্রামে অবস্থানের ফলে বৈচিত্র্যময় উদ্যোগ গ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের ফলে যুবকদের মধ্যে ঐক্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় বৈচিত্র্যময় ও নিরাপদ খাদ্যের যোগান সুনিশ্চিত হয়েছে। সকলে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় সাশ্রয় করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পরিবারকে সহযোগিতা করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে যুবকরা। করোনাকালীন সংকটে যুবকরা নিজ নিজ পরিবারে বৃক্ষ রোপণ করে এলাকার পরিবেশ উন্নয়নেও বেশ ভূমিকা রেখে চলেছে।

happy wheels 2
%d bloggers like this: