Posted in

নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণকারী নাজমা আক্তার

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী:

নেত্রকোনা সদর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মনাং গ্রামের কৃষাণী নাজমা আক্তার (৪০)। স্বামী, ছেলে নিয়ে ৩ জনের সংসার তাঁর। বাড়ি ভিটাসহ মোট ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে তাঁর। সেই জমিতেই সারাবছর সবজি চাষ ও পুকুরের মাছ বিক্রি করে সংসার চালান ছেলেকে নিয়ে ২০ শতাংশ পুকুর পাড়ের ৩০০টি স্থানীয় জাতের কলা চাষ করেন। সবজি ছাড়াও তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে কোন টাকা খরচ না করেই কলা ও লেবু চাষ শুরু করেন। সবজি বিক্রির টাকায় তিনি ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালান।

নাজমা আক্তার লোকায়েত পদ্ধতিতে দু’দিনে কলা পাঁকাতে পারেন। তিনি লোকায়াত জ্ঞান ব্যবহার করে মাটিতে বড় গর্ত করে তার নিচে কলাপাতা বিছিয়ে কলার ছড়ি রাখেন এবং ছড়িগুলোর উপর শুকনো বন বা খড় দিয়ে ঢেঁকে তারপর উপরে আবার কলাপাতা দিয়ে জাঁক দিয়ে রাখেন। এতে করে দুই দিনের মধ্যেই কলা পেঁকে যায়। তিনি বলেন, ‘কলা মাটির মটকার ভেতরে রেখে ও কড়ই পাতা দিয়ে মটকার মুখ ঢেঁকে রাখলে কলা তাড়াতাড়ি পেকে যায় এবং রঙ ভালো হয়। কলতে তেলাকুচা পাতা দিয়ে বাজারের ব্যাগে রেখে দিলে কলা দুইদিনে পেকে যায়।’ তিনি ছোটরবলা মায়ের কাছ থেকে এগুলো শিখেছেন বলে জানান। এভাবে নাজমা আক্তার করোনার শুরু থেকে বিষ মুক্ত কলা পাকিয়ে গ্রামের ৫টি পরিবারে বিনামূল্যে ৫টি কলাছড়ি বিতরণ করেন এবং ২০০টি কলার ছড়ি বাজারের বিক্রি করেন।

নেত্রকোনা কাঁঠালে বিচি ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবার। তাই নাজমা আক্তার এগুলো লোকায়ত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেন এববং সারাবছর তরকারি হিসাবে খান। করোনার মহামারিতে বাজারের তেমন যেতে পারেন না। তাই এগুলো সংরক্ষণ শুরু করেছেন পরবর্তী খ্ওায়ার জন্য। তিনি শুকনো বিচিগুলো প্লাস্টিকের বোতলের মধ্যে রাখেন। এতে কাঠালের বিচি ভালো থাকে। মাটির হাড়িতে নিচে বালু দিয়ে উপরে কাঠালের বিচি দিয়ে হাড়ির মুখ মাটির দিয়ে লেপে দিলে সাত কিংবা আট মাস পর্যন্ত বিচিগুলো সংরক্ষণ করা যায়। কাঁঠালের বিচিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন আছে।নাজমা আক্তার করোনাকালীন সময়ে লেবু সংরক্ষণ বিষয়ে ১০টি পরিবারকে পরামর্শ দেন। তিনি নিজে কিভাবে লেবু সংরক্ষণ করেন সেটা তাদেরকে করে দেখান। তিনি মাটির নিচে বিশেষ পদ্ধতিতে লেবু পুঁতে রেখে সংরক্ষণ করেন-৩/৪ মাস পর্যন্ত। এতে করে লেবু নষ্ট হয় না।

নাজমা আক্তারের ৪টি গাভী আছে। তিনি তার নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাকি দুধ বাজারে বিক্রি করে প্রতিদিন ভালো অংকের টাকা আয় করেন। তিনি দুধ থেকে প্রতিমাসে মালাই সংগ্রহ করে সেই মাল্ইা মাটির হাড়িতে রেখে পাক দিয়ে খাটি ঘি তৈরি করেন। ঘি তৈরির পর যা অবশিষ্ট থাকে (মাঠা) সেটিও সুসাদু খাবার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামের আশেপাশে নাজমা আক্তার এই মাঠা বিক্রি করেন। সারাবছর লোকায়ত পদ্ধতিতে নিরাপদ খাদ্য ব্যবহার করে নিজের পরিবারের আয় বৃদ্ধি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক ও সংরক্ষকদের মধ্যে নাজমা আক্তার অন্যতম। বর্তমান সময়ে গ্রামীণ নারীদের সৃষ্টিশীলতার গুণাবলী চাপা পড়ছে বহুজাতিক কোম্পানির ছোট ছোট প্যাকেটে। আমাদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও পরিবেশসম্মত লোকায়ত পদ্ধতিগুলো আমাদেরকেই সচেতনভাবে ধরে রাখতে ও চর্চা করতে হবে। সম্প্রসারণ করতে হবে এলাকার অন্যান্য সকলের মধ্যে। না হলে একদিন হয়তো আমাদের অস্তিত্বকে আমরা হারিয়ে ফেলব। তাই আসুন গ্রামীণ নারীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সফল চর্চাগুলোকে সন্মান দিয়ে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিই।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.