সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন এখলাছ মিয়ার স্বপ্ন

:: নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমি

Untitবকledনেত্রকোনা জেলায় কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নের নগুয়া গ্রাম। নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া গ্রামে অবিস্থত এই গ্রাম। সেই গ্রামে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এখলাজ মিয়া। কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় ছোটবলা থেকেই তিনি কৃষি কাজের সম্পৃক্ত। জমিতে সবজি চাষ, মাচা তৈরি, সবজি ক্ষেতে যত্ন নেওয়া, ধান কাটা, চারা রোপণ, ধান তোলা ইত্যাদি কাজ বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন। দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে খুব বেশি পড়ালেখা করতে পারেননি। বাবার পেশা কৃষিকে বেছে নিয়েছেন তিনি। পরিবারের স্ত্রী ও ছেলেসহ তিনজনের সংসার তার। ভালোই কেটেছিলো এখলাছ মিয়ার জীবন। কৃষিকাজ করে যা আয় হতো তা দিয়েই চলতো পরিবারের ভরণপোষণ।
গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের মতো বেশি ফলন পাওয়ার জন্য তিনিও রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও অতিসেচনির্ভর কৃষি চর্চা করেছিলেন। প্রথমদিকে ভালো লাভ হলেও আস্তে আস্তে তিনি দেখতে পান তার উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে অথচ আগের মতো লাভ হচ্ছে না। উপরোন্তু সময়মতো সার-কীটনাশক ও ভালো মানের বীজ না পাওয়ায় কোন কোন সময় ফসল মার খেয়েছে, লোকসান গুণতে হয়েছে তাকে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। তার মনে পড়ে একসময় বাপ-দাদার লোকায়ত কৃষি চর্চার কথা। যে কৃষি চর্চায় এতো সমস্যা কখনও ছিলো না; ছিলো না সার-বীজ ও কীটনাশক জন্য সংগ্রাম করার কষ্ট। তিনি সেই কৃষিব্যবস্থার দিকেই ফিরে যেতে চান।

লোকায়ত কৃষি চর্চায় মনোনিবেশ
রাসায়নিক সার-বিষনির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার এক পর্যায়ে এখলাছ মিয়ার পরিচয় হয় বারসিক’র লোকায়ত কৃষি চর্চার বিভিন্ন কর্মসূচিগুলোর সাথে। বারসিক যেসব কৃষকদের সাথে কাজ করে তাঁদেরও সাথেও তার কথাবার্তা হয়, আলোচনা হয় এবং লোকায়ত কৃষি চর্চা সম্পর্কি বিভিন্ন তথ্য লাভ করেন। এভাবেই তিনি পর্যায়ক্রমে বারসিক’র সহায়তায় কৃষকদের আয়োজিত বিভিন্ন সভা, আলোচনা, কর্মশালা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে অংশগ্রহণ করেন। রাসায়নিক সার-বিষনির্ভর কৃষির বিভিন্ন নেতিবাচকতা সম্পর্কে অবগত হন। ফলশ্রুতিতে জৈব কৃষি চর্চা করেন এমন কৃষকদের পরামর্শে তিনি লোকায়ক কৃষি চর্চা করতে শুরু করেন। তার ৮০ শতাংশ জমিতে তিনি শুধু ধান নয় মৌসুমভিত্তিব বিভিন্ন শাকসবজি আবাদ করেন। জৈব কৃষি চর্চা করেন এমন কৃষকদের কাছ থেকে তিনি স্থানীয় জাতের বিভিন্ন ধান ও শাকসবজির বীজ সংগ্রহ করেন;জমিতে আবাদ করেন। ফসলের জমিতে জৈব সার দেওয়ার জন্য কেঁচো কম্পোস্ট সার, Untitledকুইক কমপোষ্ট, কেঁচো সার, কচুরিপানা দিয়ে জৈব সার তৈরি করেন। এসব জৈ সার তৈরি করার কৌশল তিনি অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকে শিখেছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরের মাধ্যমে। বেশি পরিমাণ কেঁচো সার তৈরির জন্য তিনি রাজেন্দ্রপুর গ্রামের কৃষক বাদশা মিয়ার খামার পরিদর্শন করে তার (বাদশা মিয়া) কাছ থেকে হাতে কলমে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরির কৌশল শিখে নেন। গ্রামে ফিরে নিজ বাড়িতে একটি পাকা ঘর করে নিয়মিত কেঁচো সার তৈরি করছেন এখন। নিজে জৈব সার তৈরি করেন বলে এখলাছ মিয়াকে এখন বাজার থেকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কিনতে হয় না। জৈব সার প্রয়োগ করে তিনি ভালো ফলন লাভ করেন। উৎপাদন খরচ কম বলে বাজারে ফসল বিক্রি করে তিনি আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছেন। এছাড়া রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করায় মাটির স্বাস্থ্যসহ প্রকৃতি-পরিবেশকে সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারায় তিনি গর্ববোধ করেন।

এখলাছ মিয়ার স্বপ্ন
এখলাছ মিয়া বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করতে পারছেন এখন। শীত মৌসুমে জৈব সার দিয়ে শসা, লাউ, ডাটা ও মূলা চাষ করছেন। দিন দিন তিনি সবজির জাত বৃদ্ধি করছেন। সবজি ক্ষেতের পাশাপাশি ধান ক্ষেতে ও শস্য ক্ষেতের জমিতে তিনি জৈব সার ব্যবহার করছেন। জমিতে পোকা ধরলে তিনি নিমপাতা, তামাক পাতা, এগড়া পাতা দিয়ে সবজি ও অন্যান্য ফসলে রোগ/পোকা দমন করেন। তিনি নিজে যা শিখেছেন অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকে সেটি তার গ্রামের অন্যান্য কৃষকদেরও শেখান, পরামর্শ দেন। ভালো বীজ থেকেই ভালো ফসল হয়। তাই ফসল চাষের অন্যতম দিক সঠিক সময়ে ভালো বীজ দিয়ে ফসল চাষ করা। এজন্য এখলাছ মিয়া স্থানীয় জাতের ৩ ধরনের শস্যবীজ, ৮ ধরনের সবজি বীজ, ৭ ধরনের ধানবীজ সংরক্ষণ করেন নিয়মিত। এসব বীজ তিনি তার গ্রামে ও অন্যান্য গ্রামের কৃষাণ-কৃষাণীদের সাথেও বিনিময় করেন। নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত উপায়ে সবজি চাষের এই দক্ষতা কৃষক এখলাছ মিয়া শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিজ গ্রামের কৃষকদেরও তিনি নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করেন লোকায়ত কৃষি চর্চা করার। এখলাছ মিয়ার সফলতা ও পরামর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নগুয়া গ্রামের ৮ জন কৃষক পতিত জমিতে জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করেছেন ইতিমধ্যে। এখলাছ মিয়া স্বপ্ন দেখেন তার গ্রামের সব কৃষকই পরিবেশস্মতভাবে ফসল উৎপাদন করবেন। তার গ্রামকে একটি বিষমুক্ত গ্রাম হিসেবে দেখতে চান। এজন্য যা করা দরকার তিনি তাই করবেন বলে জানান। এতে করে নগুয়া গ্রামকে প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনিসহ অন্যান্য কৃষকরাও অবদান রাখবেন। নগুয়া গ্রামকে যদি প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করা যায় তাহলে অন্যান্য এলাকার কৃষকরাও পরিবেশসম্মত উপায়ে ফসল আবাদ করতে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: