Posted in

‘মাডি (মাটি) কোনো সময় বেঈমানি করেনা’

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
গ্রামীণ জনগোষ্ঠী অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাঁরা দু’বেলা খাবার খেতে পারলে অনেক খুশি থাকে। সারাদিন নিজের সংসারের কাজ আর অবসরে প্রতিবেশিদের খোঁজ খবর রাখা তাঁদের নৈমিত্তিক কাজেরই একটা অংশ। প্রতিবেশিদের সাথে সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়ার পাশাপাশি চলে বিভিন্ন উপকরণ আদান প্রদান, সহযোগিতা, পরামর্শ। এভাবেই তাঁদের সারাদিন কেটে যায়। তবে সারাদিনের অন্যান্য কাজের মধ্যে গ্রামীণ নারীদের সবজি চাষ, হাঁস, মুরগি পালনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
পরিবারের পুরুষ ব্যক্তিটি যখন সারাদিন মাঠে কাজ করেন, বাড়িতে থেকে নারী সদস্য তখন তাঁর নিজের আঙিনায় সবজি চাষে ব্যস্ত থাকেন। নিজের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী সবজির বীজ সংগ্রহ, রোপণ, পরিচর্যা, বিক্রি ও বীজ সংরক্ষণ তাঁরা একাই করে থাকেন।


লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের কৃষাণী মালা আক্তার। এই গ্রামে গড়ে উঠা সমতা কৃষক কৃষাণী সংগঠনের একজন সদস্য তিনি। সংগঠন গঠিত হওয়ার শুরু থেকেই তিনি একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন। মূলত বাড়ির আঙিনায় স্থানীয় জাতের সবজির চাষে কৃষাণীদের যুক্ত করার জন্য এই সংগঠন গড়ে তুলতে সহযোগিতা করা হয়েছিল। যে কারণে গত ২০১৯ সালে উক্ত সংগঠনের কৃষাণী সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু সবজি বীজ যেমন চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, শশা, চালকুমড়া, করলা ইত্যাদি বীজ তাঁদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছিল।


অন্যান্য সদস্যদের সাথে মালা আক্তারকেও উক্ত প্রকারের বীজ প্রদান করা হয়। তিনি অতি যত্ন সহকারে প্রত্যেক জাতের বীজ নিজের বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন। যা তিনি প্রায় তিন বছর যাবৎ চাষ করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর বাড়িতে ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, চালকুমড়া, শশা, পাটশাক ও ডাটা আছে। এর আগের মৌসুমে চাষকৃত সবজির মধ্যে শিম (আইশনা ও কাইক্যা), মরিচ, মিষ্টিকুড়া, ডাটা, ঢেঁড়স ইত্যাদির বীজ তিনি সংরক্ষণ করেছেন।


গত বছরের খরিফ-১ মৌসুমে তিনি ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গার চারা দিয়েছেন প্রায় ২০ জনকে। কাকরলের বীজ দিয়েছেন ৬ জনকে। এছাড়া চালকুমড়া, শসা ইত্যাদির বীজ দিয়েছেন ৫জনকে। চলতি বছরে এসকল সবজির বীজ ও চারা দিয়েছেন আরো ১৪ জনকে।
এবছর তিনি বীজ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য মরিচ ও মিষ্টিকুমড়া ঘরে রেখেছেন। এছাড়া চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, ঝিঙ্গা, শশা, পাটশাক ইত্যাদি পুষ্ট করার জন্য গাছে রেখে দিয়েছেন। গত এক মাসে তিনি চালকুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল বিক্রি করেছেন প্রায় ৭ হাজার টাকা। এছাড়া তাঁর বাড়ির উঠোনে আছে একটি পেঁপে গাছ। এই গাছ থেকে ৫ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। সবজির বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি তাঁর ছেলে মেয়ের খাতা কলম কিনে দিয়েছেন। আর বাকি টাকা সঞ্চয় করছেন গরু কেনার জন্য।


চাষকৃত সবজি দিয়ে তিনজনের সংসারে খাওয়া খরচ বেশ ভালোই চলে যায়। বাকি সবজি তিনি বিক্রি করেন। তাছাড়া প্রতিবেশি ও আত্মীয়স্বজনের মাঝেও বিতরণ করতে পারেন। সবজি চাষে তিনি কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। তাঁর বাড়িতে গরু আছে দুইটি। এই গরুর গোবর, বাড়ির আবর্জনা ইত্যাদি তিনি গাছের গোঁড়ায় ব্যবহার করেন। মালা আক্তারের স্বামীও একজন কৃষক। তবে বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাই সংসারে কাজের তেমন কোনো ঝামেলা না থাকায় তিনি সারাদিনের অধিকাংশ সময় সবজি বাগানের পরিচর্যা করেন। তাছাড়া তাঁর বাড়িতে হাঁস, মুরগিও আছে। এগুলো পালনের পাশাপাশি তিনি অবসর সময়ে দর্জির কাজও করেন।


তিনি বলেন, ‘একটু সময় আর যতœ লইয়া ফসকৃষি (সবজি চাষ) করলে কোনো দিন লস (লোকসান) নাই। মাডি (মাটি) কোনো সময় বেঈমানি করেনা। আমরা কাজ না কইরা মাডিরে দোষ দিলে লাভ অইবো ? আগে আমরার নিজের কাজ করন লাগবো, পরে মাডি তার ফল দেহাইবো। একসময় আমার কাছে কোনো ফসকৃষির আলি (বীজ) আছিলনা। অহন আছে। আমি একশ’জনরেও আলি দিতে পারমু। তারপরেও শেষ হইতোনা’। দৃঢ় প্রত্যয় আর অনেকটা গর্বের সাথেই কথাগুলো বলছিলেন মালা আক্তার। একসময় তাঁর কোনো বীজ ছিলনা। এখন তিনি স্বাবলম্বী। মৌসুমভিত্তিক বীজ তিনি সংগ্রহ করে চাষ করছেন এবং বীজ সংরক্ষণ করছেন।


নিরাপদ, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষাণী মালা আক্তার বাজারের উপর নির্ভরশীল নয়। উপরোন্তু তিনি এলাকার অনেক নারীদের সবজি উৎপাদনে যুক্ত করতে উৎসাহিত করছেন। তিনি তাঁর প্রতিবেশিদের মাঝে বীজ বিতরণ করেন এবং তিনি মনে করেন কাউকে কোনো কিছু দিলে সেই জিনিস কমে যায় না। বরং বাড়ে। তাই তিনি এলাকার যে সকল নারী তেমনভাবে সবজি চাষের সাথে যুক্ত নয়, তাঁদেরকে যুক্ত করতে নিজের আগ্রহে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কখনো সবজির চারা বা কখনো বীজ দিয়ে আসেন। সেই সাথে বিভিন্ন পরামর্শ। তাঁর মতো এমন অসংখ্য নারী আছেন যারা আমাদের চাষ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছেন এবং সমৃদ্ধ করছেন বৈচিত্র্যময় বীজ ভাণ্ডার।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.