সাম্প্রতিক পোস্ট

২৫ শে মে'র সেই দিনে!

২৫ শে মে’র সেই দিনে!

সাতক্ষীরা থেকে বিজয় মন্ডল::

সেদিন সকাল থেকেই ওয়াপদা রাস্তার উপরে ছিলাম আমরা কয়েকজন বন্ধু। খোলপেটুয়া নদী তখনও স্বাভাবিক! একটু বৃষ্টি ছিলো। কিন্তু অস্বাভাবিক ছিলো না।

সময় যত গড়াতে লাগলো বৃষ্টি ততোটা বাড়তে লাগলো সাথে নদীর ঢেউ এবং উচ্চতা বাড়তে লাগলো।  উপকূলীয় এলাকার নদী তীরে বসবাস করা মানুষদের কাছে এটা তখনও স্বাভাবিক। কারণ এরকম ঘটনা তাদের কাছে চির চেনা। সংগ্রাম তারা কম করে না।

যাহোক খোলপেটুয়া নদী হঠাৎ-ই যেন তার চিরচেনা রূপ পাল্টালো, বাতাসের গতিবেগও বাড়তে শুরু করলো, বৃষ্টিও রূপ পাল্টাতে শুরু করলো। তখনও গ্রামের নারীরা রান্নায় ব্যস্ত। অনেকের রান্না শেষ হয়েছে সবে, কিন্তু খাওয়া হয়নি।

আমাদের বাড়ির পাশেই ছোট একটা কেউড়া বন ছিল। কিছু বহিরাগত জেলে সেখানে নৌকায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করতো। আর নদীতে মাছ ধরতো। সেদিন আকাশ মেঘলা দেখে, নদী তীরেই অবস্থান নেয় তারা। দুপুরের রান্না তাদেরও চলছিল।

30408e38be53217ebdf8a04766462e2b

পুরুষতান্ত্রিক রান্না! ঝড়েও তাদের সহজে দমাতে পারে না। কারণ এটাই তাদের জীবন।

কিন্তু সেদিন তারা হার মানতে নেহাৎ-ই বাধ্য হলো। দুপুরের নাওয়া খাওয়ার মূহুর্তে সেই নৌকায় ভাসমান জেলেদের চিৎকার শুনতে পেলাম হঠাৎ!  বাঁচাও! বাঁচাও!  নদীতে তখন পানি বেড়েছে অনেক। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে নদী তীরে।

ক্ষণিক মূহুর্ত দেরি না করে ছুটে গেলাম আমরা কয়েকজন বন্ধু। গ্রামের কিছু মানুষও আসলো। সবাই মিলে তাদের মালামালগুলো আগে হেফাজত করি পাশের একটি বাড়ি। নৌকা শক্ত করে তীরে বেঁধে আপাতত রাস্তায় আশ্রয় নেয় জেলেগুলো।

এমন সময় রাস্তার দক্ষিণ দিক থেকে গ্রামের এক কাকা দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে আর চিৎকার করে বলছেন, “রাস্তা ভেঙে গোলো!  তোমরা সবাই চলো। তাহলে হয়তো ঠেকানো যাবে।”

বৃষ্টি তখন অঝোরে হচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত জোরে গায় এসে পড়ছে। তা সত্বেও ক্ষণিক মূহুর্ত দেরি না করে আমরাসহ অনেকেই ছুটে যাই একটি ঘেরের সুইচ গেট সংলগ্ন উক্ত স্থানে।

ঝোড়া কোদাল নিলো অনেকেই। প্রাণপণ চেষ্টা চলছে বেঁড়ীবাধ রক্ষার জন্য।
ঢেউয়ের মাত্রা তখন, নদী তীরের গ্রামটির প্রবীণ মানুষ গুলোকেও অবাক করতে শুরু করলো।

এমন ঢেউ, এমন ঝড়, এমন জোয়ারের পানি বৃদ্ধি, এমন বৃষ্টিপাত আমরা তো দূরের কথা আমাদের প্রবীণরাও দেখিনি। এসব কিছুকে জয় করে অন্তত বেঁড়বাধটি রক্ষা করে এলাকাকে বন্যার হাত রক্ষা করতে, নিজেদের জানমাল রক্ষা করতে সেদিন আমাদের চেষ্টা ছিলো শতভাগ।

গ্রামে তখন দূর্যোগ সচেতনতা খুব একটা ছিলো না। সতর্কবার্তা বা সংকেত সম্পর্কে মানুষের খুব একটা ভ্রক্ষেপ ছিলো না। তবুও  যারা জানার জন্য আগ্রহী ছিলো তাদের হয় রেডিও না হলে শুধুমাত্র একটি টিভি চ্যানেল বিটিভির উপর ভরসা করতে হতো।

মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যাও তখন খুব বেশি নয়। তাই তখনও অনেক মানুষ বাড়িতেই অবস্থানরত থাকে। গ্রামে বেশির ভাগ বাড়িঘর-ই কাঁচা ছিল।

আমরা বহু মানুষ আবহাওয়ার প্রচন্ড বৈরিতা উপেক্ষা করে তখনও আমাদের রাস্তাটি রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু একটা সময়, দুপুর গড়িয়েছে তখন। আমাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে, রাস্তাটি ভেঙে গেলো। গ্রামের মানুষগুলোর কাছে নতুন ইতিহাস রচিত হলো।

অবর্ননীয় গতিতে নদীর পানি আমাদের গ্রামে প্রবেশ করতে লাগলো। মূহুর্তেই শতবর্ষী সুপেয় পানির পুকুরটা ভরে গেলো। এলাকার অন্যান্য পুকুর, মৎস ঘের, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট প্লাবিত হলো।

আমাদের গ্রামটিতে এখোনো পর্যন্ত কোন সাইক্লোন সেল্টার না থাকলেও একটিমাত্র দ্বিতল প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। সেখানে ধারন ক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ মানুষ আশ্রয় নিলো। আর কিছু মানুষ গ্রামের কিছু দুইতলা পাকা বাড়িতে আশ্রয় নিলো। আর অল্প কিছু মানুষ মরলে বাপ দাদার বাড়িতেই মরবে এই চিন্তা করে, নিজ বাড়িতেই রয়ে গেলো। বহু গৃহ পালিত পশু আশ্রয়হীন হয়ে পড়লো।

বিকাল থেকে সন্ধ্যা নাগাত আঘাত হনলো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা। এতে আমাদের গ্রামের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মৎস ঘের, সাধু পানির পুকুর, গাছপালা প্রভৃতির ব্যাপক ক্ষতি হলেও, সৃষ্টিকর্তার কৃপায় কোন প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু বিশ্ববাসিকে বাকরুদ্ধ করে আইলায় বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদের বহু মানুষ নিহত হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ধ্বংস হয়। ২৫ শে মে ২০০৯ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানার সেই দিন থেকে এখনও বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদের মানুষগুলো তাদের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় সংগ্রাম করে চলেছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: