Posted in

মাসকলাই চাষে কৃষাণীদের মুখে হাসি

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রাম ভুগিয়া। ভূগিয়া গ্রামের নারীরা মিলে তাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের মাঝামাছিতে গ্রামভিত্তিক একটি নারী সংগঠন গড়ে তোলেন, যার নামকরণ করে ‘শাপলা শালুক কৃষাণী সংগঠন’। সংগঠনটির বর্তমান বয়স প্রায় ৩ বছর ৬ মাস। সংগঠনটি এলাকার প্রাণ সম্পদে (মাটি, পানি, বীজ, মাছ, বন) অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার সমমনা সংগঠনগুলোর সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। সংগঠনের নারী সদস্যরা ঘরে বসে নক্শী কাথা, কুটির শিল্প পন্ন তৈরি, বসতভিটায় মিশ্র ফসল চাষ, সীমের জাত নিয়ে গবেষণা, স্থানীয় জাতের মুরগির জাত নিয়ে গবেষণা, লোকায়েত পদ্ধতিতে সবজি চাষ, পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও গ্রামের বিভিন্ন সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে আসছে।

Dhonia (2)

সংগঠনের প্রত্যেক সদস্য প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে সঞ্চয় করছে। জমাকৃত সঞ্চয় তারা ব্যাংকে প্রতিমাসে ২০০০ টাকার ৩ বছর মেয়াদী একটি ডিপিএস স্কীম খুলেছেন। ৩ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তারা ব্যাংক থেকে সুদ-আসলে মোট ৮৪,২০০ (চুরাশি হাজার দুইশত) টাকা পায়। ডিপিএস এর টাকা দিয়ে তারা সংগঠনর নামে ৬ কাঠা (৬০ শতাংশ) জমি বন্ধক রাখে।

সংগঠনের সভায় আলোচনা করে তারা ৮ শতাংশ জমিতে মূলা, লালশাক, ডাটা, পালং শাক চাষ এবং বাকি জমিতে মাসকলাই চাষ করেন। মাসকলাই চাষের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় ৮ কেজি বীজের। বারসিক থেকে তারা পাঁচ কেজি মাসকলাই বীজ সহযোগিতা পান এবং নিজেরা ৩ কেজি বীজ ক্রয় করেন। ৮ কেজি মাসকলাই বীজ তারা বন্ধকী জমির ৫২ শতাংশ জমিতে বপন করে। মাসকলাইয়ের ফলন মোটামুটি ভালো হয়। সংগঠনের সকল সদস্যরা মাসকলাই ক্ষেত থেকে তুলে রৌদ্রে শুকিয়ে মাড়াই করে শুকানোর পর প্রায় ২ মণ মাসকালাই পাওয়া যায়। কৃষাণীরা মাসকলাই ডালের উচ্ছিষ্ট অংশ গরু খাবার হিসাবে ব্যবহার ও রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন। মাসকলাই চাষ করলে জমিতে হালচাষ করতে হয় না, কোন ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিতে হয়নি। মাসকলাই চাষে জমি চাষ করতে হয় না, তাই গ্রামের বেশির ভাগ কৃষক তাদের বাড়ির চারপাশের পতিত উচু জমিতে মাসকালাই চাষ করে থাকেন।

Dhonia

কৃষানি সখিনা আক্তার তার অনভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা নিজেদের (সংগঠনের) টাকা দিয়ে জমি বন্ধক রাখতে পারছি এবং সেই জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে শুধু জৈব সার দিয়ে অল্প খরচে মাসকালাই ও সবজি চাষ করছি। আমি মাসকলাই চাষ করে খুব খুশি।” তিনি আরও বলেন, “এভাবে সকলে একত্রে কাজ করার ফলে গ্রামের সকলের মধ্যে মিল মহবত বেশি থাকে এবং আমরা একসাথে আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি। মাসকলাইয়ের ডাল নেত্রকোনা মানুষের খুবই প্রিয় ডাল। মাসকালাই ডাল মাছের মাথা দিয়ে রান্না করে বিয়েসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানে সুস্বাদু খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়।”

কৃষাণী হেপি আক্তার বলেন, “আমার খুব ভালো লাগছে যে আমরা গ্রামের নারীরা কিছু করতে পারছি। আমরা গ্রামের নারীরা মিলে মাসকলাই চাষ করতে পেরে খুবই আনন্দিত। কিছু মাসকলাই ভালোভাবে রৌদ্রে শুকিয়ে পরবর্তী মৌসুমে জন্য বীজ হিসেবে রেখে দেব, যাতে আগামী মৌসুমে আমাদের মাসকলাই বীজ বাজার থেকে কিনতে না হয়।”

মাসকলাই ডাল খুবই পুষ্টিকর ও হাই প্রোটিনসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। গ্রাম বাংলার রাস্তার পাশে ও উঁচু পতিত জমিগুলো ফেলে না রেখে বিনা চাষে ও বিনা খরচে মাসকলাই চাষ করে পুষ্টির চাহিদা যেমন মিটানো সম্ভব তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যায়। শাপলা-শালুক কৃষাণী সংগঠনের সকল সদস্য ভবিষ্যতে সংগঠনের কার্যক্রম আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন, যাতে তারা নিজের ও পরিবারের আয়ের/উপার্জনের অংশীদার হতে পারেন। শাপলা-শালুক কৃষাণী সংগঠনের নারীরা সবজি ও ডাল ফসল চাষের এই সফল উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

 

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.