Posted in

একজন লতিফার আলোকিত জীবনের গল্প

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

কত অজানা জীবনের গল্পইনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশের আনাচে কানাচে। নীরবে জীবনের সফলতার গল্প তৈরি করে দেশের উন্নয়নের পাটাতনকে করছেন মজবুত। তেমনি একজন গল্পের নারী নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার নরেন্দ্রনগর গ্রামের লতিফা আক্তার (৬০)।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান লতিফা আক্তার কোন রকমে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনার করতে পেরেছেন। ১৩ বছর বয়সে বাল্য বিয়ে হয় আটপাড়া উপজেলার ঘাগড়া গ্রামের দরিদ্র আলী ওসমানের সাথে। বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি গেলেও অভাব তার পিছু ছাড়েনি। অভাবের মধ্যেই তিনি পাচঁ সন্তানের মা হয়েছেন। স্বামী আলী ওসমান গ্রাম থেকে বাঁশ কিনে অন্যত্র বিক্রি করে যে আয় করেন তা দিয়ে সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে অতি কষ্টের সংসার লতিফার।

স্বামীর আয় রোজগার খুবই কম হওয়ায় এবং স্বামী তাদের ভরণপোষণ করতে না পরায় ও সংসারের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে লতিফা সন্তানদের নিয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। বাবার বাড়িভিটা মাত্র ৫ শতাংশ হওয়ায় লতিফা অন্যের হাসঁ-মুরগি, গরু ও ছাগল বর্গা পালন, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে শাকসবজি ও ধান চাষ করতে থাকেন। মাঝে মাঝে বাবা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে বিভিন্ন সহযোগিতা নিয়ে কোন রকমে সংসার চালাতে থাকেন এবং সন্তানদের স্কুলে পাঠান।

লতিফা আক্তার অল্প শিক্ষিত হলেও তিনি জানতেন শিক্ষার কদর। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া জীবনে সফলতা লাভ করা সম্ভব নয় বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই অনুধাবন করতে থাকেন। তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এবং গ্রামের অন্যদের সাহায্য ও সহযোগিতা নিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে থাকেন। বড় সন্তান মাধ্যমিক (এসএসসি) পাশ করার পর নেত্রকোনা সদর উপজেলার বাঘড়া গ্রামের মাওলানা মো. শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে লজিং থেকে নেত্রকোনায় উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। দ্বিতীয় ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে সিলেটের একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। সেখান থেকে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাইকে পড়াশুনার খরচ দিয়ে সহযোগিতা করে।

20170605_101754
লতিফা আক্তার একাকী অনেক কষ্টে পাচঁ সন্তানকে পড়াশুনা করাচ্ছেন। একসময় লতিফা সন্তানদের পড়াশুনা ও সংসারের খরচ চালিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু দমে যাননি। ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি সন্তানদের শিক্ষার আলো দিতে পেরেছেন। তার কষ্টের ফল তিনি পেয়েছেন। কেননা তাঁর বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে এখন সেই বিশ^বিদ্যালয়েরই প্রভাষক। বড় ছেলে এখন দুই বোনকে ঢাকায় নিয়ে কলেজে পড়াচ্ছেন। বড় মেয়ে অনার্স পাস করার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরি করছেন। মেজ মেয়েকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তার ছোট মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিষয় নিয়ে অনার্স পড়ছে। লতিফা বেগম তার সন্তানদের অন্য পিতামাতার মতো পড়াশুনার পাশাপাশি সংসারের বিভিন্ন কাজও শিখিয়েছেন। তার স্বপ্ন ছিল সন্তানদের তিনি মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন এবং তিনি সফল হয়েছেন।

লতিফা বেগম এর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার স্বপ্ন সফল হয়েছে, আমার সন্তানেরা মানুষের মত মানুষ হয়েছে। আমার কুঁড়েঘরে এখন অনেক বড় পাঁকা বাড়ি হয়েছে। আমার ছেলে এখন গাড়ি দিয়ে বাড়ি আসে। আমার খুশিতে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। সারা গ্রামবাসীর কাছে সে এখন উজ্জল নক্ষত্র”।

লতিফা বেগম অতি দরিদ্র হলেও এবং আর্থিক অনটনের সাথে সর্বক্ষণ যুদ্ধ করে গেলেও শিক্ষার গুরুত্ব মন থেকে কখনো মুছে যেতে দেননি। শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেই তিনি পাঁচ সন্তানকে খেয়ে না খেয়ে লেখাপড়া করিয়েছেন। লতিফার প্রবল ইচ্ছা ও সন্তানদের ঐকান্তিক পরিশ্রমের ফলে সন্তানরা আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামের সকল নারী যদি লতিফা বেগমের মতো তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে এগিয়ে আসেন, পাশাপাশি গ্রামের সকল পুরুষ (ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে) লতিফার মতো নারীদের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী একদিন নিশ্চয়ই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে এবং গ্রাম থেকে দারিদ্রতা চিরতরে দূরীভূত হবে। দেশ হয়ে উঠবে সত্যিকারের সোনার বাংলায়।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.