সাম্প্রতিক পোস্ট

ঝিনুক নিধন রোধে সচেতন হওয়া প্রয়োজন

ঝিনুক নিধন রোধে সচেতন হওয়া প্রয়োজন

চাটমোহর, পাবনা থেকে ইকবাল কবীর রনজু

সহসা বুঝবার উপায় নাই। মাঝ বয়সী থেকে শুরু করে প্রবীণ অসহায় নারীরাও নদীর জলের মধ্য থেকে কিছু একটা খুটে হাতে তুলে আবার পাশেই জলের তলে রাখছেন। পাবনার ভাঙ্গুড়া-অষ্টমনিষা সড়কের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গুমানী নদীর তলদেশে নারীদের এহেন কার্যক্রম গভীরভাবে না দেখলে দেখার অপূর্ণতা থেকে যেত। রাস্তা থেকে নেমে ক্রমশই তাদের মুখোমুখী হলে দেখা যায় তারা নদীর তলদেশের ঝিনুক খুটে পানির নিচে রাখা বাঁশের ডালি (পাত্রে) রাখছেন।

jhinuk pic-1

পানির মধ্যে এভাবে কি করছেন জানতে চাইলে ভাঙ্গুড়া উপজেলার উত্তর কলকতি (কাছিছেড়া) গ্রামের রজব আলী খাঁ’র স্ত্রী ৭০ বছর বয়ষ্ক ছোমেলা খাতুন বলেন, “বাড়িআলা (স্বামী) বুড়ো মানুষ। কাম কাজ করবার পারে না। জমা জমি ও নাই। খাতি পড়তি তো টেকা পয়সা লাগে। তাই ঝিনুক তুলত্যাছি। পতি বছর আগুন থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত তুলি। বাড়িত সাতটা হাঁস আছে। হাঁসের ও খাওয়া হচ্ছে ঝিনুকের খোল গুলো বিক্রি করে বাড়তি কিছু আয় ও হয়।” তিনি আরও বলেন, “ভাই নাই আমারে। তিন বুন। বাপের এক বিঘা দশ কাঠা জমি পাইছিল্যাম। তিন মিয়্যাক বিয়্যা দিতি এক বিঘা জমি বেঁচছি। বাঁকী দশ কাঠার উপর বাড়ি কর‌্যা আছি। শ^শুর কুলির কিছুই পাই নাই। কাছেই দড়ি পাড়া গায়ে স্বামীর বাড়ি আছিল। সেও আমার বাপের বাড়িতি থাকে। তিন ছাওয়াল নজরুল, জাফর আর ছানোয়ার যার যার মতো খায়। ছোট ছাওয়াল হযরত কলেজে পড়ে। নিজিই কাম কাজ কর‌্যা লেখাপড়ার খরচ চালায়।” ঝিনুক তুলে প্রতিদিন কত টাকা আয় হয় আপনার জানতে চাইলে ছোমেলা বলেন, “অন্যরা পরায় সারা দিন তোলে। আমি কয়াক ঘণ্টায় দিন দুই তিন ডালি পাই। তিন দিন ঝিনুক তুললি এক বস্তা খোল হয়। ঝিনুকির শ^াস হাঁসেক খাওয়াই। খোল গুলো বেচ্যা দেই। এক বস্তার দাম দেয় ১শ’ ৮০ টাকা। এ হিসেবে দিন ৬০ টাকা বাড়তি আয় হয়। চাল ডালের পাশাপাশি তরিতরকারী সব কিন্যা খাওয়া। এছাড়া কাপুর চুপুর ওধুধ পত্র ও লাগে। ঠান্ডা লাগে। তার পর ও কাম না কর‌্যা কি উপায় আছে।”

jhinuk pic-2
বয়স কত আপনার? “কত যে হইছে তা কই ক্যাবা কর‌্যা।” নিজের বয়স সম্পর্কেও অসচেতন পঁয়ত্রিশোর্ধ ফিরোজা খাতুনের স্বামীর নাম আব্দুল মালেক। বাড়ি উত্তর কলকতি গ্রামে। স্বামী পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক। কাজ না থাকলে ভ্যান গাড়ি চালান। মাঝ নদীর কোমড় পানিতে বসে ঝিনুক তুলছিলেন। দুই ছেলে এক মেয়ে তার। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ভাঙ্গুড়ায়। দুই ছেলেসহ চার জনের পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয় স্বামীকে। তাই স্বামীকে সহায়তার জন্য প্রতিবছর এ সময় নদীর পানি যখন কমে যায় তখন নদী থেকে ঝিনুক উত্তোলনের কাজ করেন। ফিরোজা বলেন, “বড় ছাওয়াল ছোট বিশাকোল হাই স্কুলে সিক্সে পড়ে। ছোট ছাওয়াল জিহাদ পাশের প্রাইমারী স্কুলে ফোরে পরে। খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি ওগারে পড়া লেখার জন্যিও টেকা লাগে। বাড়িত দশটা হাঁস আছে। ঝিনুক তুল্যা সিদ্ধ কর‌্যা ভিতরের নরম শ্বাস হাঁসেক খাওয়াই। ঝিনুক খাওয়ালি হাস বেশি ডিম পারে। ঝিনুকির খোল (আচড়া) গুলো বেচি।”

jhinuk pic-3

সচেতনতার অভাবে বিশাকোল কলকতিসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের শতাধিক নারী প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গুমানী নদী থেকে ঝিনুক উত্তোলন করছেন। এভাবে গৃহপালিত হাঁসগুলোর খাবার যোগানের পাশাপাশি কিছু বাড়তি আয় করছেন তারা। নদী থেকে এভাবে অবাধে ঝিনুক উত্তোলণে কেউ কখনো তাদের বারণ করেনি। এটি যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ ধারণা ও তাদের নেই। কেবলমাত্র হাঁসের খাবার জোগান ও অভাবী পরিবারকে সহায়তা করতে তারা নদী থেকে ঝিনুক নিধন করে চলছে।

জলজ প্রাণী ঝিনুক প্রোটিন সমৃদ্ধ। ঝিনুকের শ্বাসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে। মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে খাদ্য হিসেবে জলজ প্রাণী ঝিনুক খেয়ে থাকে। হাড় মজবুত করতে, দাঁত ও হাড় সংলগ্ন টিস্যু শক্ত করতে, বাতের ব্যাথা দুর করতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, স্নায়ুরে বিকাশে কোষকে চাঙ্গা করতে অনেকে রান্না করে সিদ্ধ করে ভেজে অথবা পুড়িয়ে ঝিনুক খেয়ে থাকেন।

jhinuk pic-4

মাছের খাবার তৈরিসহ ঝিনুকের বহুবিধ ব্যবহারে এক শ্রেণীর মানুষ এসব ঝিনুকের খোল তিন চার টাকা কেজি দরে পাইকারী কিনে পাঠাচ্ছেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। লাভের আশায় চাটমোহরেও স্থানীয় দুএকজন ব্যক্তি গড়ে তুলছেন ঝিনুক চূর্ণ করার অনুমোদনবিহীন মিল। সেখানে বাধাহীনভাবে ঝিনুক চূর্ণ করে মাছের খাদ্য হিসেবে বাজার জাত করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে, পরিবেশবিদরা জানান, অবাধে ঝিনুক নিধন করা হলে খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙ্গে যাবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন অনেক জলজ কীটপতঙ্গ ঝিনুক খেয়ে ফেলে এবং এভাবে পানি পরিশোধনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার এমন অনেক প্রাণী আছে যাদের অন্যতম খাদ্য ঝিনুক। নদী বা জলাশয়ে পর্যাপ্ত ঝিনুক না থাকলে সেসকল জলজ প্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দিবে। সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঝিনুক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিধায় পরিবেশের বিপর্যয় রোধ কল্পে অবাধে ঝিনুক নিধন রোধ করা প্রয়োজন। যারা এ কাজে সম্পৃক্ত তাদের কাউন্সিলিং করলে; ঝিনুক নিধনের ক্ষতিকর দিকগুলো বুঝাতে পারলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: