Posted in

লোকায়ত প্রাকৃতিক ঘটনার পূর্বাভাস

Exif_JPEG_420

কলমাকান্দা, নেত্রকোনা থেকে অর্পণা ঘাগ্রা

বর্তমান সময়ে মিডিয়ার বদৌলতে আমরা ঘরে বসেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ সব ধরনের তথ্য পেয়ে যাই। তথ্য প্রবাহে মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকার তথ্য অধিকার আইন প্রনয়ন করেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য প্রদান করে মানুষকে তথ্য সমৃদ্ধ করছেন। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগে বর্তমান সময়ের মতো মিডিয়ার রাজত্ব ছিলো না। তথ্য প্রবাহে প্রবেশের সুযোগ ছিলো না। কিন্তু তাই বলে থেমে ছিলো না প্রকৃতির ঈঙ্গিত জানা। এখনও প্রবীণদের মাঝে এই বিশ্বাস ও চর্চাগুলো রয়েছে। প্রকৃতিনির্ভর পল্লী জনগোষ্ঠী প্রকৃতির উপর শুধুমাত্র জীবিকার জন্যই নির্ভশীল নয়। প্রকৃতির সাথে তাদের রয়েছে আত্মিক সম্পর্কও। তাই প্রকৃতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তুর, জীবের গতিবিধি, আচরণ লক্ষ্য করে প্রাকৃতিক অবস্থা পূর্বানুমান করতে সক্ষম হন। তারা প্রকৃতির ঈঙ্গিত জানার চেষ্ট করেন প্রাকৃতিক অভিলক্ষণ দিয়েই। কখন খরা, রৌদ্র, ঝড়, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, ঢল নামবে তা প্রাকৃতিক ঈঙ্গিত দেখেই অনুমান করেন, বিশ্বাস করেন এবং তাদের বিশ্বাসগুলোও জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রতিষ্ঠিত ছিল, বর্তমানেও আছে। আর সেই অনুসারেই তারা প্রাকৃতিক বিরূপ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই লেখাটি তৈরি করা হয়েছে প্রবীণদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে:

কাঠঠোকরা, ঘুঘু  
কাঠঠুকরা সবার পরিচিত একটি পাখি। এটি তার শক্ত ঠোটের মাধ্যমে গাছ গর্ত করে নিজের জন্য বাসা তৈরি করে। সাধারণত আমরা একে সুন্দর ও ভিন্নধর্মী পাখি হিসেবেই দেখে আসছি। কিন্তু তখনকার সময়ে এটি শুধু সাধারণ পাখিই ছিলো না; এটি ছিলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাবার একটি মাধ্যম। এই পাখিটি যদি কোন সময় গাছের গোড়ায় গর্ত করে বাসা তৈরি করতো তখন লোকে জেনে নিতো এই সময় ঝড়, বৃষ্টি, ঢল বেশি হবে। আর যে সময় পাখিটি গাছের উপরের ডালগুলোতে বাসা তৈরি করতো তখন তারা জেনে নিতো এই সময় রৌদ্র বেশি হবে, খরা শুরু হবে। ঘুঘু পাখির বেলায়ও ঠিক তেমনিই।

সাপ, ব্যাঙ
সাপ ও সাপের স্বাভাবিক চলাফেরা সবার কাছেই অতি পরিচিত। সাপের রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতি। তার মধ্যে স্থানীয় ভাষায় পানি সাপ বলে পরিচিত সাপটি যদি নদীর এপার Exif_JPEG_420ওপার ঘন ঘন আসা যাওয়া করতো তাহলে তারা জেনে নিতো কদিনের মধ্যেই ঢল নামবে।  আর হতোও নাকি তাই। খনার বচনে আছে, ‘ব্যাঙ ডাকলে ঘন ঘন, শীঘ্র হবে বৃষ্টি যেন’। গ্রামাঞ্চলের প্রবীণ জনগোষ্ঠীদের অনেকেই খনার বচনের সাথে পরিচিত নয়। কিন্তু ব্যাঙ ডাকলে যে বৃষ্টি নামবে সেটা জানে এবং মানে।

পিপড়া, উইপোঁকা, ঝিঝিপোঁকা, ফরিং, সাতকামড়ি, করাইল্যা (মালকুমড়া), মৌমাছি  
প্রবীণরা অতীতে যদি দেখেন লাল পিপড়ে দল বেঁেধ গর্ত থেকে বের হয়ে অন্যত্র গেছে তাহলে তারা বুঝে নিতেন ঝড় বৃষ্টি হবে। Exif_JPEG_420আবার পাখাওয়ালা পিপড়ে উড়তে শুরু করলে রৌদ্র হবে, খরা হবে। উইপোঁকা যদি মাটির গর্ত থেকে বের হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে শুরু করে তখন তারা জেনে নিতেন কদিনের মধ্যে ঝড়, বৃষ্টি হবে। ঝিঝি পোকাঁ ডাকা শুরু করলে তারা জেনে নিতেন রৌদ্রময় দিন শুরু হতে চলেছে। খরা হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। উর্ধ্ব আকাশে ফরিং ঝাঁক বেঁধে উড়লে জেনে নিতো ক’দিন দিনের অবস্থা ভালো হবে, রৌদ্রময় হবে। আবার ফরিং মাটির সাথে লেগে উড়তে দেখলে তারা জেনে নিতেন ক’দিনের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে। গ্রীম্মকালে গ্রামাঞ্চলে ঘুরলে এখনও সাতকামড়ির কামড় খেতে হয়। এই পোকার কামড় খেলেও মানুষ তখন হিসেব করতো রৌদ্রের উত্তাপ বাড়বে। করাইল্যা পোকাঁ (মালকুমড়া) পোকাটি মাটির নীচে থাকে। খয়েরি রঙের এই পোকা বেশি পরিমাণে ডাকলে প্রবীণরা বুঝে নিতে খরা হবে। মৌমাছি মধু উৎপাদন করে সেটা সবাই জানে। কিন্তু খুব কম লোকই জানে যে মৌমাছি দক্ষিণ দিকে উড়লে ঝড় বৃষ্টি হবে এবং  উত্তর দিকে উড়লে খরা বা রৌদ্রময় দিন হবে।

আম, তেঁতুল, কাঁঠাল
Photo1868আম গাছে গাছপূর্ণ হয়ে যখন ফুল পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয় তখন এক মূহুর্তের জন্য হলেও মানুষের দৃষ্টি আটকে যায়। তখন আমরা এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করি। এর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রসালো স্বাদ আস্বাদনের প্রতিক্ষায় থাকি। কিন্তু তখনকার সময়ে মানুষ আম গাছের ফুলের দিকে তাকাতো দিনকালের হিসাব কষার জন্য। বেশি আম ধরলে জেনে নিতো এই বছর বেশি ঝড়, বৃষ্টি নামবে। আর কম হলে ঝড়, বৃষ্টির পরিমাণ কম হবে। ঠিক তেমনিই তেঁতুলের বেলাতের। তবে তেঁতুলের ফুলের দিকে মানুষের তেমন খেয়াল থাকেনা। তাছাড়া বর্তমানে তেতুলের গাছও কমে গেছে এলাকায়। তিন্তু তখনকার সময়ে তেঁতুলের ফলনের দিকে মানুষের নজর ছিল বছরের আবহাওয়া গণনা করার জন্য। তেতুল বেশি ধরলে জেনে নিতো এই বছর ঢল নামবে বেশি। অন্যদিকে কাঁঠাল প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যায়। কাঠালের ফলনও ছিল ফসল উৎপাদনের নির্দেশক। যে বছর কাঠাল বেশি ধরবে সেই বছরে ধানের ফলন বেশি হবে বলে প্রবীণরা ধরে নিতেন এবং হতোও তাই।
বুড়ি সুতা  
চৈত্র, বৈশাখ মাসে গ্রামাঞ্চলের ফসলের মাঠ, ঘাট ভরে যায় বাতাসের সাথে উড়ে আসা ধবধবে সাদা, নরম তুলতুলে সুতায়। স্থানীয় ভাষায় এর নাম বুড়ি সুতা। কথিত আছে যে, সাগরের ফেনা সুতারুপে বাতাসের সাথে উড়ে আসে। এই সুতার আগমন দেখে মানুষ অনুমান করতো রৌদ্রময় দিন হবে, খরা হবে।

মেঘ
আকাশে মেঘ দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘন ঘন শব্দ হতে থাকলে তখনকার মানুষ বুঝে নিতেন শিলা বৃষ্টি নামবে। উপরের আকাশে সাদা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ দেখা দিলে বিশ্বাস করতেন নদী, খাল, বিলে এই সময় ছোট আকারের অনেক মাছ ধরা যাবে। আর সাদা গুচ্ছ মেঘ আকারে বড় হলে বিশ্বাস করতেন বড় মাছ ধরা যাবে। সেই রকম প্রস্তুতি নিয়েই নাকি তখনকার সময়ে মাছ ধরার প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।

পল্লী লোক কাহিনী ও বিশ্বাসগুলো অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। তবে প্রত্যেক অঞ্চলেই কমবেশি এখনও এই সব বিশ্বাসের প্রচলন রয়েছে অলিখিতভাবে মানুষের সরল বিশ্বাসে ও মননে। যদি বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয় তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এগুলো সংরক্ষিত থাকবে এবং প্রকৃতিতে বিদ্যমান প্রত্যেকটি প্রাণীর প্রতি মানুষ নিজস্ব প্রয়োজনেই যতœশীল হবে বলে জনগোষ্ঠীর অভিমত। সেই সাথে এসবের লিখিত রূপ দান করা সম্ভব হলে সমৃদ্ধ হবে পল্লী লোকসংস্কৃতি এবং গুরুত্ব পাবে অযত্নে, অবহেলায় পড়ে থাকা পল্লী লোকগাঁথা, কাহিনী।

তথ্যদাতা: কালাপানি গ্রামের ছায়া নকরেক (৭০), হেরোদ রিছিল (৫৫), ফুলবাড়ী গ্রামের আব্দুর রহমান (৬৬), পাতলাবন গ্রামের সবিতা মানখিন, জুলিতা হাগিদক, সুদর্শন রংখেং, বরখাপন বিশারা গ্রামের হালিমা বেগম, কলমাকান্দা বিশার গ্রামের আয়েশা খানম, কাগজিপাড়া গ্রামের সুস্মিতা দাস, কলমাকান্দা বিশারা গ্রামের আয়েশা খানম প্রমূখ।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.