Posted in

একাশিতে আঠারো!

নেত্রকোনা থেকে ইছাক উদ্দিন

সে বসে থাকাটা ঠিক পছন্দ করেন না। বয়স ৮১। তাতে কি? এরপরও তিনি কাজ করে যান আপন মনে। এই বয়সেও তাঁর কাজ করতে খারাপ লাগে না, তবে কাজ করতে না পারলেই বরং শরীর খারাপ করে তাঁর। বলছিলাম নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামের অসীতিপর প্রবীণ কৃষক হেলাল উদ্দিনের কথা। তাঁর কথা শুনে মনে হয় যেন তিনি একজন আঠারো বছরের যুবক! যাঁর কথায় প্রাণচাঞ্চল্যতা, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে স্পষ্টভাবে! একাশি বছরের শরীর থাকলেও তাঁর মনটাও এখনও ১৮ বছরের যুবকের সমতূল্য। তিনি কাজ করতে চান, কাজ করেন এবং অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল থাকতে চান না। তিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চান তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে। তিনি তাঁর মতো প্রবীণদের মনে আশার আলো জাগাতে চান। তাঁরা যেন হতাশ না হয়। নিজের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে আত্মবিশ্বাসীভাবে কাজ করে যান নিজের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। হেলাল উদ্দিন তাই একজন ৮১ বছরের প্রবীণ নন; তিনি একজন আঠারো বছরের যুবক।
333
সংসার জীবনে হেলাল উদ্দিন তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক। সন্তানদের সকলেরই বিয়ে দিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীন সময়ে তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই পরিবারের হাল ধরতে হওয়ায় পড়াশুনা আর হয়ে উঠেনি। বিআরডিবি সেচ প্রকল্পে মাস্টার রোলে চাকুরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। বিআরডিবি প্রকল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথে চাকুরিও শেষ হয়ে যায়। এরপর তিনি মনোনিবেশ করেন কৃষিকাজে। ধানসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সারাবছর তিনি বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ করেন। তাঁর চাষবাসে শসা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ঝিঙ্গা, ডাটা, কচু, চাল কুমড়া, পেঁপে, মরিচ, আলু ইত্যাদি।

এই প্রসঙ্গে হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি এ বয়সেও কাজ ছাড়া থাকতে পারেন না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রখর রোদ ও বৃষ্টিতেও সবজি ক্ষেতের পরিচর্যা করি। প্রায় প্রতিদিন বিকালে গ্রামের হাটে, পার্শ্ববর্তী কাটাখালি, পাঁচকাহনিয়া ও দুগিয়া বাজারে উৎপাদিত সবজি ফসল বিক্রি করি।” শস্য ফসল বিক্রির টাকায় তিনি পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনেন। হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি এই বয়সেও অর্থ উপার্জন করি বলে এলাকার অন্যান্য প্রবীণের তুলনায় পরিবারে আমার কদর অনেক বেশি, সবাই আমাকে আদর যতœ করে। আমার বয়সের অজুহাত দিয়ে ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগেনা। কাজ করলে দু’পয়সা আয় যেমন হয়, তেমনি আমার মন ও স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।”

2222
এই প্রবীণ বয়সে প্রখর রোদের মধ্যে কাজ করছেন কেন, শরীর খারাপ করবে না? জানতে চাইলে বলেন, “কাজ না করলে আমার ভালো লাগে না, কাজ করলে শরীর ভালো থাকে। আর না করলে নানা রকম অসুখ বিসুখ হয়। আমি অনেক কাজ করি বলে আমার তেমন কোন অসুখ হয় না। আর সাধারণ অসুখ বিসুখ হলে গাছ গাছড়ার ঔষধ খেলেই ভালো হয়ে যায়।” বেশকিছু দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ঔষধি গাছও তাঁর বাড়িতে রয়েছে বলে তিনি জানান। বাড়ির সমস্ত গাছগাছালি তিনি নিয়মিত পরিচর্যা করেন।

প্রবীণ কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, “প্রত্যেক কর্মক্ষম প্রবীণদের যদি কাজের সুযোগ থাকে এবং রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মক্ষম প্রবীণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়, তাহলে প্রবীণরা যেমন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হবে, তেমনি পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্রবীণদের অসহায়ত্ব হ্রাস পাবে এবং প্রবীণ নির্যাতন বন্ধ হবে। পাশাপাশি প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োগ নিশ্চিত হবে, উন্নত হবে দেশ।”

হেলাল উদ্দিনের এই কথা কী রাষ্ট্রের কাছে পৌছাবে?

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.