সাম্প্রতিক পোস্ট

বাঁশের শিল্পী গীতা রানী দাস

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

শ্যামনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ঋষিদের বসবাস। এখানে প্রায় ২০০টি ঋষি পরিবার আছে তার মধ্যে প্রায় ১২০টি পরিবার তাদের ঐতিহ্যিক পেশা বাঁশ-বেতের বিভিন্ন উপকরণ তৈরি ও জুতা মেরামতের কাজ করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা। স্থায়িত্বশীল গ্রামীণ জীবনযাত্রায় কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, তাতী, করিরাজ, বনজীবী, আদিবাসীদের মতো ঋষিদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের তৈরি বিভিন্ন উপকরণের উপর নির্ভর করে অন্যান্য সম্প্রদায়ের পেশা এবং ছন্দময় করে গ্রামীণ জীবনযাত্রা।

pic
গোপালপুর গ্রামের গীতা রানী এক ঋষি সম্প্রদায়েংর মানুষ। গীতা রানীর বয়স ৬৩ বছর। স্বামী যদুনাথ দাস। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে এবং দু ছেলে পৃথক। স্বামী যদুনাথ দাশ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালিসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে কাটাতে বছর পাঁচেক আগে মারা যান। গীতা রানী শ্বাশুড়ির কাছ থেকে বাঁশ বেতের কাজ শিখেছেন। তিনি কুলা, ডোল, চাচ, চাঙ্গারী, ঝুড়ি, ঝাকা, খারা, চালন, চালটুকনা, ঢাকনা ইত্যাদি তৈরি করতে পারেন। তিনি বলেন, “এক সময় স্বামীর সাথে রাত জেগে বাঁশ থেকে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করতাম। দুজনের আয় দিয়ে সংসার চলতো। স্বামী এলাকার নঁওয়াবেকী, হরিনগর, নকিপুর, মুন্সিগঞ্জ হাটে ঐ সমস্ত জিনিস বিক্রি করতো। ঐ সময় সংসার চালানোর পরও সঞ্চয় করে ৮ শতক জমি কিনি।”

গীতা রানী অন্য নারীদেরকেও বাঁশ বেতের কাজ শিখান। তিনি জানান, বিলতি, ঋষিকা, হরি, অনাথ, লক্ষ্মী, আরতি তাঁর কাছে শিখেছে। তারাও বাড়ি বসে আয় করে। গীতার রানী জানান, বাঁশ থেকে বিভিন্ন জিনিস তৈরীতে পারদর্শী এবং কাজকে আরো গতিশীল করা এবং পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বারসিক ২০০৯ সালে আমাকে সহায়তা করে ৮০টি তল্লা বাঁশ। আর এ সহযোগিতার মাধ্যমে বাঁশ বেতের কাজে আবার নিজেকে নিয়োগ করার সুযোগ লাভ করি।

pic2
গীতা রানী যে সমস্ত জিনিস বানান তা হলো-ডোল, কুলা, বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি, বাজরা, খারা, ধামা, মাছের হোঞা, খাচা, চাচের তৈরি বেড়া, পালি, ফুলদানি ইত্যাদি। আর এ কাজে তার দু’ ছেলে, ছেলের বৌ সবাই সহায়তা করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাজারে এসব জিনিসের ভালো চাহিদা আছে। বাড়িতে দু ছেলে, ছেলে বৌ এবং নিজে পণ্যসামগ্রী তৈরি করেন। এতে কওে তাঁর পরিবারের স্বচ্ছলতা আসছে। গীতা রানীর ভাষ্য, “আমি এখন প্রতিমাসে ৫০ টাকা সঞ্চয় করি। সবসময় ৩/৪ হাজার টাকা আমার কাছে থাকে। প্রতিমাসে ৪/৫ হাজার জিনিস বিক্রি করি। এতে করে প্রায় ২ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। লাভের টাকা দিয়ে এক ছেলেকে একটি ভ্যান ও অন্য ছেলেকে সাইকেল কিনে দিয়েছি। গ্রামের অন্য নারীদের এভাবে কেউ সাহায্য করলে, তারাও ঘরে বসে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে আয় করতে পারবে।”

এভাবে বাঁশ বেতের কাজে লাভবান হওয়ায় গীতা রানী নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও মূলধন দুটোই লাভ করেন। ফলশ্রুতিতে আগের যে কোন সময়ের তুলনায় তার পরিবার বেশ ভালোই আছে বলে তিনি জানান। তার মতে, ‘ইচ্ছে করলে একজন মানুষ কাজ করে তার ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সামান্যতম সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: