সাম্প্রতিক পোস্ট

চলনবিলের নারী শুটকী শ্রমিকেরা মজুরি বৈষম্যের শিকার

চলনবিলের নারী শুটকী শ্রমিকেরা মজুরি বৈষম্যের শিকার

চাটমোহর থেকে ইকবাল কবীর রনজু

ভর দুপুর বেলা। বানায় শুকাতে দেওয়া আধা শুকানো মাছগুলো বাছাই করে আকার অনুযায়ী আলাদা করছিলেন পাতনী নেছা। বয়স কত আপনার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও মুখাবয়ব দেখে ধারণা করা যায় ষাটের কাছা কাছি বয়স তার। বাড়ি চলনবিলের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত তাড়াশের সাঁকোয়া দিঘী গ্রামে। কাজ করেন চলনবিলের তাড়াশের মহিষলুটি এলাকায় মোফাজ্জলের শুটকী চাতালে।

mas basai pic-1

স্বামী পরান প্রাং। মারা গেছেন অনেক বছর আগে। তিন ছেলে তিন মেয়ে তার। মেয়েদের অনেক কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন এ বিধবা নারী শ্রমিক। তিন ছেলেকে ও বিয়ে দিয়েছেন। সবাই পৃথক। যার যার সংসার নিয়ে সে সে ব্যস্ত। পাতনী নেছা এ ছেলেগুলোকে পেটে ধরলেও, বড় করে তুললেও এখন তারা মায়ের দায়িত্ব নিতে নারাজ। পেটের খাবার, ওষুধ পত্র, কাপড় চোপর এগুলোর যোগান দেওয়ার মতো কেউ নাই তার। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে প্রায় ২৫ বছর যাবত বছরের ৬ মাস কাজ করেন চলনবিলের শুটকী চাতালে। অন্য সময় মাটি কাটা, ধানের চারা তোলাসহ যখন যে কাজ পান তাই করতে হয় তাকে। শুটকীর চাতালে কাজ শুরু হয় ভোড়ে। প্রথমে রান্না বান্নার কাজ। পরে আড়ত থেকে মাছ আসলেই ব্যস্ত হয়ে পরতে হয় তাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। বিনিময়ে প্রতিদিনের পারিশ্রমিক বাবদ মালিক তাকে একশ টাকা করে দেন।

একই এলাকায় পরাণ সাধুর শুটকীর চাতালে কাজ করেন তারা খাতুন (৪০)। বাড়ি সাঁকোয়া দিঘী গ্রামে। ছিলেন গৃহবধু। স্বামীর উপার্জনে চলতো সংসার। বছর পাঁচেক আগে স্বামী আব্দুল জব্বার মৃত্যুবরণ করলে সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় সংসারের চাকা সচল রাখতে হাল ধরতে হয় তাকেই। জমা জমিও নেই। mas sukano pic-2এক ছেলে এক মেয়ে তার। কি করে সংসার চালাবেন এ চিন্তায় যখন হিমশিম খাচ্ছিলেন এমন সময় শটকীর চাতালে কাজ করার কথা মাথায় আসে তার। পাঁচ বছর যাবত কাজ করছেন শুটকীর চাতালে। মজুরী বাবদ প্রতিদিন পান একশ টাকা। এই দিয়ে কোন মতে টানছেন সংসারের ঘানি।

সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার সেকেন্দাসপুর গ্রামের মৃত ইসমাইল প্রাং এর ছেলে দেলবার প্রাং এর মহিষলুটির শুটকীর চাতালে কাজ করেন মহিষ লুটি গ্রামের কলিমুদ্দিন এর স্ত্রী আমেনা খাতুন (৩৯)। এ চাতালে আসমা, আসিয়াসহ আরো চার নারী শ্রমিক কাজ করেন। আমেনা খাতুন জানান, রান্না বান্নাসহ পুরুষের পাশাপাশি মাছ শুকানো ও বাছাইয়ের কাজ করেন তারা। পুরুষ শ্রমিকেরা আড়ত থেকে মাছ আনার বাড়তি কাজটুকু করেন। এসময় নারী শ্রমিকেরা রান্নার কাজ করেন। একজন পুরুষ শ্রমিককে প্রতিদিনের মজুরি আড়াইশ টাকা দেওয়া হলেও নারী শ্রমিককে দেওয়া হয় একশ টাকা। এ নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই নারী শ্রমিকদের। কিন্তু কে শোনে কার কথা। অন্য কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা এসময় কাজ করেন শুটকীর চাতালে।

mas sukano pic-3কেবল নারী শ্রমিক নয় পুরুষ শ্রমিকদের পারিশ্রমিকও খুব কম। শুটকী চাতালে কর্মরত শ্রমিক আফজাল হোসেন, আমিরুল ইসলামসহ অন্যরা জানান, শ্রমিকের দক্ষতা ও বয়স অনুযায়ী মাস হিসেবে তিন হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয় তাদের।

শুটকী চাতাল মালিক দেলবার, পরাণ সাধু ও মোফাজ্জল হোসেন জানান, এলাকায় মাছের দাম বেশি এবং সৈয়দপুর নিলফামারীসহ অন্যান্য শুটকীর আড়তে দাম কম হওয়ায় আমরা লাভ করতে পারছি না। ভাদ্র থেকে মাঘ এ ছয় মাস মাছ শুকানোর কাজ চলে। ভাদ্র আশি^ন সীমিত আকারে কাজ হয়। এসময় কখনো কখনো কয়েকদিন যাবত বৃষ্টি হয়। কাজ না থাকলেও শ্রমিকদের বেতন ও খাবার দেওয়া হয়।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: