সাম্প্রতিক পোস্ট

দুবলার চরের রাস উৎসবে সুন্দরবন সুরক্ষার প্রচারাভিযান

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

বঙ্গোপসাগরের পাড়ে সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে অগ্রহায়ণ মাসের ভরা জোয়ারের পূর্ণিমা তিথিতে সম্প্রতি শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব ২০১৮। দুবলার চরের এই রাস উৎসব প্রায় ২০০ বছরের পুরানো একটি ঐতিহ্য। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তিন দিনব্যাপী আলোর কোলের এই উৎসবকে ঘিরে কয়েক লাখ দেশী বিদেশী দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

p (1)

সুন্দরবনের আলোরকোলের এই রাস উৎসব নিয়ে কথিত আছে, ১৯২৩ সালে ঠাকুর হরিচাঁদের অনুসারী হরি ভজন নামে এক হিন্দু সাধু এই মেলা শুরু করেছিলেন। তিনি চব্বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনে গাছের ফল-মূল খেয়ে অলৌকিক জীবন-যাপন করতেন। অন্য একটি মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবতার শ্রীকৃষ্ণ শত বছর আগের কোনো এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপমোচন এবং পূণ্যলাভে গঙ্গাস্নানের স্বপ্নাদেশ পান।। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলার। আবার কারও কারও মতে, শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে রাসনৃত্যে মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। এ উপলক্ষেই দুবলার চরে পালিত হয়ে আসছে রাস উৎসব। আবার আব্দুল জলিলের সুন্দরবনের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ফরিদপুর জেলার ওড়াকান্দি গ্রামের জনৈক হরিচাঁদ ঠাকুর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে পূজা পার্বণাদি ও অনুষ্ঠান শুরু করেন দুবলার চরে গিয়ে। তারপর থেকে মেলা বসছে।

লোকালয়ে এই মেলা নীল কমল নামে পরিচিত। সবশেষে মুক্তিযোদ্ধা মেজর অব জিয়াউদ্দিন এই রাস উৎসবকে পুর্নাঙ্গভাবে ও বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করেন। বনের ভেতরের আটটি পথ দিয়ে মেলায় এসেছে বিভিন্ন ধর্মের উৎসুক লোকজন। এই রাস মেলাকে ঘিরে গোটা সুন্দরবনে নেওয়া হয়েছে নিছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুবলার চরের রাস মেলার রূপকার মুক্তিযোদ্ধা মেজর অব জিয়াউদ্দিনের জীবনী নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনী করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাস উৎসব। পরের দিন শ্রী কৃষ্ণের রাসলীলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠিত হয়।

p (1)

গত ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর তিন ব্যাপী এই রাস উৎসবের প্রথমদিনে নিকটবর্তী ফরেষ্ট ক্যাম্প থেকে বন বিভাগের নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পাশ পারমিট গ্রহণ করে কয়েক লক্ষ পূণ্যার্থী ও দেশি-বিদেশি পর্যটক আলোরকোলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। বনের ভেতরের আটটি পথ দিয়ে মেলায় যাচ্ছে বিভিন্ন ধর্মের উৎসুক লোকজন। এই রাস মেলাকে ঘিরে গোটা সুন্দরবনে নেওয়া হয়েছে নিশ্রিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা, সাংস্কৃতিক সুরক্ষা ও সমাজের সকল স্তরের জনগণ এবং প্রাণ-প্রকৃতির ভেতর শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে এক বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে। এ ধারবাহিকতায় সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম, উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি এবং বারসিক যৌথভাবে ‘সুন্দরবন উপকূল-বৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রবীণ-নবীন সংহতি’ শীর্ষক এক কর্মসূচির আয়োজন করছে। এ সময়টাতে সুন্দরবনের দুরবলারচরে রাসমেলায় আগত পূণ্যার্থী, দর্শনার্থী, পর্যটক, বনবিভাগ, গণমাধ্যম, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য পেশাজীবী জনগণের কাছেও কর্মসূচির মূলসূর পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

p (3)

বারসিক ২০১০ সাল থেকে সুন্দরবনের দুবলারচরের রাস উৎসবে এই জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচিতে উপকূল অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ সংহতি জানিয়েছেন, যুক্ত করেছেন নিজেদের ভালোবাসা। এ বছর দেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলের নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা মানিকগঞ্জ জেলার নবীন-প্রবীণদের একটি দল সুন্দরবন সুরক্ষা কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে অংশ নিচ্ছেন। বারসিক মনে করে দেশের এই অনন্য বনভূমি সুরক্ষায় দেশব্যাপি সকলের ভেতর জনসচেতনতা তৈরি হবে। তিনদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কখনও মতবিনিময়, আন্ত অভিজ্ঞতা বিনিময়, উপকুল সুরক্ষায় তারুন্যের শপথ, সুন্দরবনের নদীতে বজ্য না ফেলার দাবিতে মানববন্ধন, নবীন প্রবীন প্রীতি ফুটবল ম্যাচ, লুডু খেলার প্রতিযোগিতা, আবার কখনও নাচ, গান, কৌতুক, আবৃতি, অভিনয় ও যাদু প্রদর্শনীতে মেতে ওঠে ভ্রমন পিপাশু অংশগ্রহনকারীবৃন্দ। এক অনাবিল প্রশান্তি ও নির্মল আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দুবলার চরের রাস উৎসব। এসময় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে আনান্দের মাত্রা বেড়ে আরো একগুণ।

p (5)

সুন্দরবন স্টুডেন্ট সলিডারিটি টিম, উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি এবং বারসিক যৌথভাবে রাস উৎসব ২০১৮ উপলক্ষে যে কর্মসূচি আয়োজন করে তার সমন্বয়কারী বারসিক কর্মকর্তা মননজয় মন্ডল বলেন, ‘সুন্দরবনের দুবলার চরের রাস উৎসবে কয়েক লক্ষ দেশী বিদেশী পর্যটকের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে। পবিত্র এই আলোর কোলের বুকে বঙ্গপসাগরের লোনা পানিতে পূণ্যস্নানের মাধ্যমে পাপ মোচনে মেতে ওঠে নারী পুরুষ সকলেই। সকলের সচেতনতা ও আন্তরিকতায় উৎসবটি টিকে থাকবে হাজার বছর সুরক্ষিত থাকবে আমাদের সুন্দরবনের বৈচিত্র্য।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: