Posted in

মোহর গ্রামের লোক ক্রীড়ার দল

:: রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম
Untitledমানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো বিনোদন। মানুষ শুধু কাজ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। বিভিন্ন উদ্যাপনকে সামনে রেখে অথবা কখনো কখনো কোন কারণ ছাড়াই মানুষ নিজের কর্মক্লান্তিকে ঝেড়ে-মুছে ফেলতে একত্রিত হয়, একটু ভিন্নতা খুঁজে দেখতে উদগ্রীব হয়, একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে, আলিঙ্গন করে, কাছে টানে-এভাবেই মানুষের মধ্যে ঐক্যের জন্ম হয়। আর মানুষের এই একত্রিত হবার উপলক্ষই হলো বিনোদন। মোটাদাগের বিনোদন শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অজস্র-অসংখ্য উপাদান। বিনোদনের এই উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাধুলা। সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে খেলাধুলার কি ভূমিকা থাকতে পারে তা সহজেই বোঝা সম্ভব অলিম্পিক গেমস্ এর ইতিহাসটুকু জানা থাকলেই। প্রাচীন বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় যে, বিভিন্ন নগর রাষ্ট্রের মধ্যে দ্বন্দ বা যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলেও এই প্রতিযোগিতা চলাকালীন সময়ে তা স্থগিত থাকত। এই যুদ্ধ এবং দ্বন্দ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে “অলিম্পিকের যুদ্ধবিরতির নীতি” বলা হত। এই রীতিটি অলিম্পিয়ামুখী তীর্থযাত্রীদের বিভিন্ন যুদ্ধরত নগর রাষ্ট্রের মধ্যে দিয়ে অবাধে চলাচল করতে সাহায্য করত।

খেলাধুলার মাধ্যমেই জাতির মধ্যে ঐক্যের সৃষ্টি হয়, দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। কোনো জাতির অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা যায় তাঁর নিজস্ব খেলাধুলার ধরণ থেকে। ধারণা পাওয়া যায় তাঁদের সাহস ও বীরত্ব সম্পর্কে। কোন ভূখন্ডের মানুষের আচার-আচরণ, চলাফেরা, পেশা, শারীরিক কাঠামো, ভূপ্রকৃতি ইত্যাদির উপর নির্ভর করেই ঐ ভূখন্ডের নিজস্ব খেলার সৃষ্টি হয়। ফলে যে কোন দেশের যে কোন সমাজের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই খেলাধুলা। আমাদের দেশেও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে বাহারি সব খেলা। লাঠি খেলা, দাড়িয়া বান্দা, বৌছি, কলস দৌড়, হাড়ি ভাঙা, নৌকা বাইস ইত্যাদি। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ সমাজে এইসকল খেলা আর বিভিন্ন ধরনের গানই ছিলো বিনোদনের মাধ্যম।

বর্তমানে আমাদের দেশে খেলাধুলার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আমরা আমাদের নিজস্ব লোকজ খেলাধুলা ভুলতে বসেছি। এ কারণে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। শহরাঞ্চল তো বটেই এখন গ্রামের ছেলেমেয়েরাই গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ভুলতে বসেছে। একটি খেলাকে কেন্দ্র করে সেখানে জড়ো হতো অনেকগুলো মানুষ, খেলার ছলে কথা হতো- নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়সহ আরো কতো কি! এখন ছেলেমেয়েরা কম্পউটার কিংবা মোবাইলে বসে বসে খেলাধুলা করেন। ঘরনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে উঠবার কারণে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের প্রতি মানুষের প্রত্যক্ষ নৈতিক দায়িত্ববোধ হারিয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে কমে যাচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের ঐক্য, মেলামেশা এবং সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের দৃঢ়তা। দেহের কসরত দিয়ে যে খেলাগুলো চর্চা করতো মানুষ, দিনে দিনে তা বিলীন হতে চলেছে। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্যগত বিষয়ের উপরেও প্রভাব পড়ছে। তাই এই বৈরীতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমাদের নিজস্ব খেলাগুলো চর্চার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে এর বিস্তার ঘটানোর উদ্দেশ্যেই রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর নামক গ্রামে গড়ে উঠেছে “স্বপ্ন আশার আলো” নামের সংগঠনটি।

Untitlwvedরাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ ই্উনিয়নে ২৩টি ছোটবড় পাড়া নিয়ে মোহর গ্রামটি অবস্থিত। গ্রামটির নামের সাথে জড়িয়ে আছে নানা ঐতিহ্য আর ইতিহাস। তানোর উপজেলার সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাবিদ শ্রী নারাণ চন্দ্র বলেন, “মোহর থেকে মোহর গ্রামটির সৃষ্টি।” তাঁর মতে, এখানে মাটি খুঁড়লে মাটির নীচে মানুষ মোহর পেতো বলেই এই গ্রামটির নাম মোহর হয়েছে। অনেক পুরাতন গ্রামটির রয়েছে অনেক ঐতিহ্যিক সাক্ষী। গ্রামটিতে আদিবাসী, সনাতন, খ্রীস্টান এবং মুসলমানরা মিলে মিশে বসবাস করেন। সবাই এক হয়ে সার্বিক বিষয়ে সমস্যা সমাধানে উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় গ্রামটির তরুণরা সবাই মিলে তৈরি করেন “স্বপ্ন আশার আলো” সংগঠনটি। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই নানা সময়ে এলাকার নানা উন্নয়নমূলক কাজ করে আসছে। একই সাথে “স্বপ্ন আশার আলো” গ্রামের প্রবীণ এবং নবীনের মধ্যে গড়ে তুলেছে এক সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক। নবীণ এবং প্রবীণ মিলিতভাবেই নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রসারে নানা ধরনের কার্যক্রম পালন করে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর (২০১৪) বারসিক এর সহায়ক ভূমিকায় আয়োজন করে লোকজ ক্রীড়া উৎসব। প্রবীণদের পরামর্শ নিয়ে মধ্যবয়সী এবং নবীণরা গতবছর গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া নানা ধরনের খেলার আয়োজন করেন। খেলাগুলোর মধ্যে ছিলো লাঠি খেলা, ইমাম চুরি, মাসনা ভরণ খেলা, রাক্ষস খেলা, ট্রেন গাড়ি খেলা, ঘোড়া খেলা, চেয়ার খেলা, লাঠি খেলা, হার্ডিন্জ ব্রীজ খেলা, দাড়িয়া বান্দা, বৌছি, কলস দৌড়, হাড়ি ভাঙা ইত্যাদি।

বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে মোহর গ্রামের নবীন-প্রবীণরা মিলে তৈরি করেছেন একটি ক্রীড়া দল। ১৫ সদস্যের এই ক্রীড়া দলের দলনেতা মো. আমিরুদ্দিন মিয়া (৫৫) গত এক বছরে গ্রামের ঐতিহ্যিক খেলাগুলো নবীনদের চর্চার মাধ্যমে রপ্ত করাতে সক্ষম হয়েছেন। এবার (২০১৫) তিনি তার দল নিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের নানা প্রান্তে লোক খেলা দেখিয়ে সুনাম কুড়াচ্ছেন এবং একই সাথে শারীরিক কসরতে ভরপুর লোক খেলাগুলো প্রসারেও অবদান রাখছেন। তানোর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, হাট বাজারে খেলা দেখিয়ে তাঁরা নানা ধরনের সম্মানীও পাচ্ছেন। নবীনদের মধ্যে মো. আলমগীর (২৪) বলেন, “এই সময়টাতে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাঠে তেমন কোন কাজ থাকে না। তাই খেলার দলটি নিজের গ্রামে খেলাধুলার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানেও খেলা দেখিয়ে অনেক সম্মান ও সম্মানী অর্জন করেছে।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.