Posted in

কুড়িয়ে পাওয়া “দুধশাক”: গ্রামীণ খাদ্য তালিকায় নতুন সংযোজন

সাতক্ষীরা থেকে জেসমিন আরা ও ছন্দা মন্ডল::

গাছটি স্বচ্ছ এবং হালকা সবুজ রঙ বিশিষ্ট। দেখতে অনেকটা টক পালং এর মতো। উচ্চতা এক থেকে দেড় ফুট। পাতার উপরের অংশ গাঢ় সবুজ নিচের অংশ হালকা সবুজ। তবে বালি বালি হওয়ার কারণে একটু সাদাটে। কান্ড এত বেশি স্বচ্ছ যে, অনেকটা কাচের গ্লাসের রং ধারণ করে মনে হবে। ফুল হয় ছোট ছোট। মূল শেকড় নরম এবং পার্শ্ব শেকড়গুলো কচুরিপনার শেকড়ের মতো। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম হচ্ছে “পেপেরোমিয়া (Peperomia)”। অনেকে এই পেপেরোমিয়া নামটির সাথে পরিচিত। কেননা এই উদ্ভিদটি বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়। নবম ও দশম শ্রেণীর মাধ্যমিক সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ে উদ্ভিদ কান্ডের জাইলেম টিস্যুর যে মূল থেকে পানি ও খনিজ লবণ পাতায় পরিবহন করে তার খুব সাধারণ একটা পরীক্ষণ দেখানোর জন্য পেপেরোমিয়া উদ্ভিদটি ব্যবহার কর হয়। পেপেরোমিয়ার জন্ম স্থান পুরাতন ইটের প্রাচীর এর গায়ে অথবা পোড়োবাড়ি বা পুরাতন বিল্ডিং বা ইটের দেয়ালে ও পতিত জায়গায়। এছাড়া ক্ষেতের মধ্যে যেখানে দোঁআশ মাটির আধিক্য বেশি যে জায়গায় অন্যান্য লতা, পাতা ও ঘাসের সাথে জন্মে থাকে। বর্ষাকালের মাঝ থেকে শীতকালের শেষ সময় পর্যন্ত উদ্ভিদটি পাওয়া যায়। এই উদ্ভিদটির নাম ও ব্যবহার গ্রামের মানুষের কাছে প্রায় অজানা ছিল।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ইসমাইলপুর গ্রামে কৃষক নজরুল ইসলামের বাড়ির উঠানে আয়োজিত কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের রান্না প্রতিযোগিতা, স্বাদ ও খাদ্য শিক্ষা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া এই উদ্ভিদ বৈচিত্র্যটি গ্রামের সবার কাছে “দুধ শাক” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গাছটি অত্যধিক স্বচ্ছ হওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রামের মানুষ একে দুধ শাক বলে। শাহিদা বেগম প্রথম শাকটির ব্যবহার জেনেছেন পাশের বাড়ির ময়না ও মজিদ’র বাড়ি থেকে। এর পূর্বে গাছটি দেখলেও ব্যবহার জানা না থাকায় কখনও গুরুত্ব দেননি অনেকে। ছেলেমেয়েদের খেলনাবাটিতেও শাকটি খেলনা সামগ্রী হিসেবে দেখা যায় বহুবার। কিন্তু শাকটির ব্যবহার জানার পর থেকে একজন থেকে অন্য জনের মাঝে জানাজানি হওয়ার পর থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক বড়িতে শাকটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। শাহিদা বেগম রান্না প্রতিযোগিতায় ব্যতিক্রম কিছু উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে এই শাক রান্নার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শাকটি রান্নার পদ্ধতি অন্যান্য সব শাকসবজির মতই। খাদ্য হিসেবে এর কান্ড ও পাতা ব্যবহার করা যায়। রান্না প্রতিযোগিতায় এই দুধ শাক ব্যবহারের পূর্বে তিনি নিজের পরিবারের খাদ্য হিসেবে কয়েকবার রান্না করেছেন। শাকটি খেতে খুব সুস্বাদু এবং অন্যান্য সবজির মতো পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। নিজের খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই শাহিদা বেগম প্রতিযোগিতায় এই ব্যতিক্রমধর্মী নতুন একটি শাক রান্না করেন। তার রান্নার মধ্য দিয়ে খাদ্য তালিকায় যুক্ত হলো নতুন একটি অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য, যা দুধশাক বা পেপেরোমিয়া নামে পরিচিত। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এলাকা তথা সমগ্র মানুষের মাঝে অব্যবহৃত এই উদ্ভিদের ব্যবহার, উৎপত্তি ও গুনাগুণ সম্পর্কে ধারণা প্রকাশ পেল

ভিন্ন ভিন্ন কৃষি প্রতিবেশ ও জীবন-জীবিকার বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের কৃষি ভূগোল এবং ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য দিনে দিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। শত পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার মাঝে এখনও দেশের অঞ্চল ভিন্নতায় গ্রামীণ জনগণই প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া ও  জীবন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.