Posted in

বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ বাঁচাতে কাজ করে যাচ্ছে সাতক্ষীরার জাকির হোসেন

আসাদ রহমান, সাতক্ষীরা থেকে

বিলুপ্তপ্রায় চ্যাং (টাকি), শোল, কই, চিতল এবং রুই মাছের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে সাতক্ষীরার জাকির হোসেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স জাকির হোসেন কোন চাকরির পিছনে না ছুটে বাণিজ্যিকভাবে দেশী মাছ চাষে সাফল্য পেয়েছেন।

satkhira zakir fish photo (1)

জানা গেছে, এক কাঠা এবং মাত্র পাঁচ কাঠা আয়তনের দুটি পুকুরে দেশি জাতের শোল মাছের চাষ করেছেন তিনি। কম খরচে এক বছরে পাঁচ কাঠা জমিতে একটন শোল মাছ উৎপাদন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। দেশি জাতের মাছ যেখানে হারিয়ে যেতে বসেছে সেখানে শহরের পুরাতন সাতক্ষীরার জাকির হোসেন শোল মাছ চাষ করে সবার নজর কেড়ে নিয়েছেন। তার শোল মাছ চাষে সাফল্য দেখে সাতক্ষীরা জেলার অনেক বেকার যুবক বিলুপ্ত প্রায় কই, শোল, চিতল, ফলুই মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

satkhira zakir fish photo (2)

দেশীয় মাছ চাষ সম্পর্কে জাকির হোসেন বলেন, “কিটনাশক ও সার ব্যবহারের ফলে কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চেলা, শাল চোপরা, শোল, বোয়াল, আইড়, বাইন, খলিসা, চিংড়ি, গজার, চেং, টাকি, চিতলসহ দেশীয় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কৃষক পরিবারের জন্ম হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালিন সময় থেকে কৃষি আমাকে টানতো। লেখাপড়া শেষ করে ধানের বীজের ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসা ভালো চলছিল। ২০১৫ সালে এসে ধানের বীজের জন্য চাতাল বানাতে গিয়ে দুটি তৈরি হয়ে যায়। সেখানে কি মাছ চাষ করবো সেই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বই পড়তে থাকি।” তিনি আরও বলেন, “অধিকাংশ বইতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অচাষকৃত রাক্ষুসে মাছ নিধন করুন। সহজে না মরলে বিষ দিয়ে নিধন করুন। আর নিধন করার কথা বলা হয়েছে দেশী মাছগুলো। মাছে ভাতে বাঙালির প্রিয় মাছগুলো নিধন করে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া নাইলোটিকা চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমার মধ্যে জিদ হলো বিলুপ্ত মাছ চাষ করে সবাইতে দেখিয়ে দেব। সেই থেকে শুরু শোল মাছের চাষ শুরু করি।”

তিনি বলেন, “এই দেশের মতো মাটি এবং পানি কোথাও নেই। তাহলে আমি কেন মাছ চাষ অন্য দেশের কাছ থেকে টেকনোলজি ধার নেব। দেশী চ্যাং, শোল এবং বোয়াল মাছ যদি রাক্ষস হয় তাহলে অন্যগুলো হাঙ্গর। শোল, চ্যাং, বোয়াল মাছগুলোকে আমি খুব ভালোবাসি। মমতা দিয়ে দেশী মাছ চাষ করে সাফল্য পেয়েছি। প্রথমে অনেকে আমাকে পাগল বলে আখ্যা দিয়েছিল। এখন অনেকে এই দেশী মাছ চাষে ঝুকে পড়ছে। দেশী মাছ চাষে খরচ কম লাভ বেশি। মানুষের কাছেও প্রিয় এই মাছগুলো।”

শোল মাছ চাষ সম্পর্কে জাকির হোসেন আরও বলেন, “এই অঞ্চালের মাছ চাষিরা যেসব মাছ চাষের প্রতি ঝুঁকছে তাতে ঝুঁকি আছে এবং খরচও বেশি। কিন্তু তারা বোঝেনা দেশীয় মাছ চাষে বেশী কষ্ট করা লাগে না। মানুষ যাকে পুকুরের অন্যান্য মাছের জন্য শত্রু মনে করেন আমি তাকে বন্ধু মনে ভেবে নিয়েছি। এর নার্সিং কিংবা একটু বড় হলেই পোনা লালনের দায়িত্ব মা মাছটির। এজন্য বাড়তি কোনো কাজেরও দরকার নেই।”

তিনি আরও জানান, দেশীয় মাছ চাষ করতে পুকুরে কোনো সার দেওয়া দরকার হয়না। চুন কিংবা কোনো রাসায়নিক খাবারও নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে মাছগুলো বেড়ে উঠেছে। বাজারের ছোট মাছই এর প্রধান খাদ্য। জাকির রোজ সকাল বিকাল খাবার দেন তাদের। গত বছরের জুলাই ডিম ছাড়ে মা মাছটি। তারপর পোনা বের হয়। এই পোনাই তার পুকুরে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন এক একটি শোল মাছের ওজন হয়েছে সর্বনিম্ন ৯শ’ গ্রাম থেকে এক কেজি ছাড়িয়ে গেছে।

জাকির হোসেন বলেন, “রাক্ষুসে মাছ হিসাবে সবাই এড়িয়ে চলেন শোল মাছকে। আর আমি এটাকে বেছে নিয়েছি। অনেকে বলে ‘এরা অন্য সব ছোট মাছ খেয়ে ফেলে’। আমি শোল মাছের সাথে চিতল, রুই, কাতলার চাষও করেছি। তাদের বৃদ্ধিও নজর কাড়ার মতো।”

satkhira zakir fish photo (4)

জাকির তার বাড়িতে গড়ে তুলেছেন গুড়পুকরের রিসার্চ ইনস্টিটিউিট। পুকুরে শোল মাছের চাষ এরই অধীনে বলে জানান তিনি। ধীরে ধীরে বোয়াল, আইড়, গজারসহ সকল দেশী মাছ চাষ করবেন বলে জানান তিনি।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে সব ধরনের মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে গত কয়েক বছর ধরে চিংড়ি ঘেরের সাথেও সাদা মাছ চাষ করছেন চাষিরা। তাছাড়াও পৃথকভাবেও সাদা মাছ উৎপাদন হচ্ছে সাতক্ষীরাতে। চলতি মৌসুমে সাদা মাছের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে উৎপাদন তার অনেক বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “দেশীয় মাছ রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সদরের জাকির হোসেন ব্যক্তি উদ্যোগে শোল মাছ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। তার সাফল্য দেখে জেলার অনেক যুবক কৈ, চ্যাং, শোল, চিতলসহ বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় মাছ চাষে উদ্ভুদ্ধ হয়েছেন।”

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.