সাম্প্রতিক পোস্ট

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এবারের বৃষ্টি একটি আর্শীবাদ

রাজশাহী থেকে অমৃত সরকার

“কার্তিক মাসে বৃষ্টি হলে ধানেতে মতি জন্মে” এখানে মতি মানে সম্পদ বুঝানো হয়েছে। কার্তিক মাসে বৃষ্টি হলে ধানের ফলন অনেক ভালো হয় বলে এই প্রবাদ বাক্যটি সৃষ্টি হয়েছে অনেক আদিকালে। অতীতে কার্তিক মাসে ধানে থোর হতো তবে সময়ের পরিবর্তনে এবং জলবায়ুগত প্রভাবের কারণে ফসল চাষের মৌসুমগুলোর সময়েরও পরিবর্তন ঘটেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই অঞ্চলে ফসল চাষ মৌসুম বলতে ছিল শুধুমাত্র বৃষ্টি নির্ভর আমন চাষ। কারণ এই অঞ্চলে অতীত থেকেই পানির সমস্যা ছিল প্রকট। আস্তে আস্তে কৃষির পরিবর্তন, সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিক সেচ ব্যাবস্থার প্রচলনের কারণে এই অঞ্চলে সেচনির্ভর বোরো ধান, সেচনির্ভর আলুসহ অনেক সবজি আবাদ শুরু হয়।

IMG_20171003_144021
এই অঞ্চলে আমন চাষ পুরোটাই বৃষ্টিনির্ভর হলেও বিগত বছরগুলোতে কৃষকরা বৃষ্টির আর্শীবাদ পাননি পুরোপুরি। কোন বছরে সেচ দিয়ে ধান রোপণ করতে হয়েছে আবার কোন বছরে বৃষ্টির পানিতে ধান রোপণ করা গেলেও থোর অবস্থায় পানি না থাকায় সেচের জন্য হাহাকার পড়েছে। কৃষকরা গভীর নলকূপে লাইন দিয়ে সেচ নিয়েছে। চাহিদা মতো সেচ না পাওয়ায় ধানের ফলন কমেছে। সেচ চাহিদা বেশি থাকায় বৈদ্যুতিক লোডসেটিং পৌঁছেছে চরম মাত্রায়।

গত পাঁচ বছরের ধান চাষের অভিজ্ঞতায় রাজশাহীর তানোর উপজেলার কন্দপুর গ্রামের কৃষক মো. রেজাউল ইসলাম (৫৫) বলেন, “আমাদের এলাকায় আমন ধান প্রধান ফসল। কারণ এ সময়ে ধানের ফলন বেশি হয় পাশাপাশি চাষ খরচ অনেক কম। তবে বিগত বছরগুলোতে আমাদের সেচ দিয়ে ধান চাষাবাদ করতে হয়েছে। কারণ শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি এসেই বৃষ্টি আর হতো না। তখন আমরা বাধ্য হয়ে ডিপ থেকে সেচ নিতাম যার প্রভাব পরত ধানের উৎপাদন খরচে। তিনি আরও বলেন, “চলতি আমন মৌসুম সম্পর্কে তানোর উপজেলার উঁচাডাঙ্গা গ্রামের আ. জলিল (৫৬)বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলের জমিগুলো উঁচু নিচু ও মাটির গঠনের কারণে এই মাটিতে পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। এবার নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উঁচু জমিগুলোতেও পানি থাকার কারণে আশ্বিন মাসের শেষে এসেও কোন সেচের প্রয়োজন হয়নি। ধানও থোর পর্যায়ে চলে এসেছে। আর অল্প কিছুদিন এ অবস্থায় থাকলে আর পানির প্রয়োজন হবে না।”

IMG_20171003_140406
এ সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের ধানের জমির আশেপাশে দিয়ে হেটে গেলে উপর থেকে নিচে পানি পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে প্রতিনিয়তই। কারণ নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে সে বৃষ্টির পানি উঁচু জমি থেকে নিচু জমিতে পরার সময় শব্দের সৃষ্টি করছে। উক্ত বিষয়ে গোদাগাড়ি উপজেলার বরশিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. বাচ্চু মিয়া (৪৬) বলেন, “এবার বৃষ্টি বেশি তাই ফসলের মাঠে পানিও বেশি। আর পানি থাকার কারণে অনেক মাছের প্রজনন হয়েছে। তাই দুই জমির আইলে পানি প্রবাহের রাস্তায় মাছ ধরার কোন কিছু পেতে রাখলেই অনেক মাছ পাওয়া যাচ্ছে।”

বিগত কিছু বছরের আমন ধান চাষের অভিজ্ঞতা থেকে তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের কৃষক মো. মfজাহারুল ইসলাম (৫২) বলেন, “গত পাঁচ বছর যাবত আমি সাত বিঘা করে আমন ধানের চাষাবাদ করি। প্রত্যক বছরই আমাকে পানি নিয়ে রোপণ করতে হয়। IMG_20171003_144001থোর অবস্থায় পানি সেচ নিয়ে ধানের আবাদ করতে বাধ্য হই। কারণ কোন বৃষ্টি ছিল না। শুধু গত বছরেই আমার সাত বিঘা জমিতে আট হাজার টাকার বেশি পানি কিনতে হয়।” তিনি আরও বলেন, “কিন্তু এবার নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ার কারণে এখন কোন পানি কিনতে হয়নি। বর্তমান সময়ের মতো যদি বৃষ্টি আর অল্প কিছুদিন হয় তাহলে আর পানি সেচের জন্য কোন চিন্তা করতে হবে না।

ধান চাষের ক্ষেত্রে জমিতে পানি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কৃষকদের ধানের জমিতে পানি চাহিদা মেটে বৃষ্টি ও সেচের পানির দ্বারা। তাই এই অঞ্চলে এবার বৃষ্টির পানিতেই ধানের সেচের চাহিদা মেটাচ্ছেন কৃষকরা। জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে চলতি বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলে এবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি । আর এই বৃষ্টিই এই অঞ্চলের কৃষকদের কাছে আর্শীবাদ হয়ে ঝরে পড়ছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: