Posted in

জলবায়ু পাঠশালা ও বরেন্দ্র অঞ্চলের তরুণ

বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে শহিদুল ইসলাম

ভূমিকা
বাংলাদেশের যে অঞ্চলে খরায় পুড়ে যায় ফসলের মাঠ। দুপুরের তপ্ততায় পশু, পাখি প্রাণীকুল ছটফটিয়ে খোঁজে একফোটা শীতল জল। বিঘায় বিঘায় বিল ধ্বংস করে সৃষ্টি করে পুকুর খনন করা হয়। যে অঞ্চলে দেশীয় মাছের আধার খাড়িগুলো শুকিয়ে যায়, প্রাকৃতিক বন উজাড় হয়ে যায়। যে অঞ্চলে দখল, দূষণে আর অবহেলায় নদী মরে যায়, বিপন্নতার শিকার হয় সারা বিশ্বের মধ্যে ঘড়িয়ালের এলাকা বিবেচিত পদ্মা নদী। যে অঞ্চলে পানির আকাল খুবই ঘনীভূত, আবার সেখানেই হঠাৎ করে বৃষ্টির জলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যে অঞ্চলের পানি চলাচলের পথগুলো নানাভাবে বন্ধ বা ধ্বংস করা হয়েছে। যে অঞ্চলের মানুষগুলো নানা বৈরীতা আর সংকটের মধ্যেও টিকিয়ে রাখছে নিজেদের, সমৃদ্ধ করছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এই বহুমূখী সঙ্কট, সমস্যা ও সম্ভাবনার অঞ্চলটির নাম বরেন্দ্র ভূমি। বিশাল এই ভূখন্ডকে একসময় বলা হতো আর্শীবাদ ভূমি। কতো ইতিহাস আর বৈচিত্র্যে ভরা ছিলো এই অঞ্চল।

জলবায়ু পাঠশালা-2ইতিহাসের পাতা আর প্রবীণজনের স্মৃতিতে জানা যায়, এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যের আভিজাত্যের কথা। পরিবেশ, প্রতিবেশের এক সম্মিলনীর কথা। আশাজাগানিয়া তরুণরা সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস জানতে চায়। কেননা দিনে দিনে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে হাত মিলিয়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিপর্যয় ও সঙ্কট নিদারুণভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে সবাইকে। স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্থায়িত্বশীল জীবন ও জীবিকা ও প্রাণবৈচিত্র্য, যে প্রাণবৈচিত্র্যই টিকিয়ে রাখবে সমভাবে সকলকে, সকল প্রাণকে। বরেন্দ্র অঞ্চলের স্বপ্নবাজ আগ্রহী তরুণরা এই প্রাণবৈচিত্র্যকে টিকিয়ে ও সমৃদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

তারুণ্যের বৈচিত্র্যময় স্বপ্ন
তারুণ্য দুর্বার। উদ্যম আর চাঞ্চলতায় ভরপুর। তারুণ্য কোনকিছুতেই হার মানে না। তরুণরা জানেনা পিছু হটতে। সংকট মোকাবিলা ও দূর্যোগে তারা এগিয়ে আসে। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক সংকট এবং আঞ্চলিক অভিঘাত মোকাবেলায় তারা ভূমিকা রাখতে চায়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যকে পতনের বিরুদ্ধে তরুণরা আওয়াজ তুলতে চায়। কিন্তু নানা কৌশলেই তারুণ্যের এই রোদ্রউজ্জ্বল শক্তিকে ঢেকে দেওয়া হয় কালো চাঁদরের এক অশুভ প্রলেপনে। এখন প্রয়োজন শুধূ সেই অশুভ কালো প্রলেপন সরিয়ে নিজের নিজস্বতাকে উদ্ভাবন করা, নিজের শক্তিকে জানা। তরুণদের নিজের প্রকৃতি, নিজের শিক্ষা, নিজের সংস্কৃতি, নিজের ঐতিহ্য, নিজের ইতিহাস আর ঐশ্বর্যকে চিনিয়ে দিলেই তারুণ্য জেগে উঠে। বৈষম্য আর নানামূখী সহিংসতাকে প্রতিরোধে নিজেই এগিয়ে আসবে তারা। নিজের সমাজ, নিজের প্রকৃতি, নিজের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে জয়ের স্বপ্নে প্রতিষ্ঠিত করাই তারুণ্যের স্বপ্ন।

জলবায়ু পাঠশালা ও তারুণ্য
পাঠশালা শব্দটি শুনলেই মনে ভেসে উঠে আমাদের বিদ্যালয়ের কথা। যেখানে একজন শিক্ষক জ্ঞানের শিক্ষা দেন। লেখাপড়া শেখান। জলবায়ু পাঠশালাও তেমনি একটি পাঠশালা। এখানে একজন অভিজ্ঞজন তাঁর জীবনের পরতে পরতে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেন। একজন কৃষক তার সফলতা, অভিজ্ঞতা ও লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। একজন প্রবীণ এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। একজনজলবায়ু পাঠশালা-5 গবেষক তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্যের দিক তুলে ধরেন। একজন শিক্ষক নৈতিকতা আর শিক্ষার কথা তুলে ধরেন। একজন সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব সেই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। একজন ঐতিহাসিক তার নিজস্ব অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন। এভাবেই এজন নারী তাঁর সফলতা এবং সমস্যার কথা এবং একজন তরুণ তার বর্তমান সময়ের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন এই পাঠশালায়।। এক কথায় জলবায়ু পাঠশালায় এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়। এই পাঠশালায় সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যের কথা, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো, জলবায়ু পরিবর্তনে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইত্যাদি নিয়ে অভিজ্ঞ ও সফল ব্যক্তিগণ সহভাগিতা করেন তরুণদের সাথে। এছাড়া এই পাঠশালায় জলবায়ু পরিবর্তনে কেন সমস্যাগুলো দেখা দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে কারা বেশি দায়ি এবং কেনইবা জলবায়ু পরিবর্তন অপ্রত্যাশিতভাবে হচ্ছে সেই বিষয়টিও আলোচিত হয়। এই জলবায়ু পাঠশালায় আলোচনায় অংশ নেন লেখক, গবেষক, শিক্ষক ও অভিজ্ঞজন।

তরুণদের দায়িত্বশীলতা
জলবায়ু পাঠশালায় একজন তরুণ শুনেন তার নিজের অঞ্চল তথা দেশের সমৃদ্ধির কথা। সে জানতে পারে, কেমন ছিলো তার অতীত, কি কারণে সংকট বয়ে আসছে এবং কি কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে? এই পাঠশালায় একজন তরুণ জানতে পারে, কি কারণে সহিংসতা বেড়ে যাচ্ছে, কি কারণে তার আপন সংস্কৃতি ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে? পাঠশালায় এই তরুণরা শুধুমাত্র কারণগুলোই জানতে পারে তা কিন্তু নয় বরং এ সঙ্কট মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল ও উদ্যোগ সম্পর্কেও অবহিত হয়। পাঠশালায় একজন সফল কৃষক বর্ণনা করেন তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় খাদ্য উৎপাদন করার কৌশল, একজন প্রবীণ পরিবেশ সুরক্ষায় তাঁর কৌশল ও সফলতার কথা সহভাগিতা করেন। জলবায়ু পাঠশালা-3এসব অভিজ্ঞ ও সফল মানুষের কথাগুলো শোনে এবং কৌশলগুলো জেনে তরুণরা প্রাণদীপ্ত ও প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে এসব শিক্ষা ও কৌশলগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করার। তারা প্রত্যয়ী হয়ে উঠে নিজের পাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে সুরক্ষা করার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণে তারা উৎসাহি হয়ে উঠে। এভাবে ধীরে ধীরে নিজের ভূমিকা ও শক্তি সম্পর্কে তারা অবহিত হয়, অনুধাবন করে তাদের দায়িত্ব এবং দায়িত্ব সম্পাদনে সক্রিয় হয়ে উঠে। দায়িত্বশীলতায় আবদ্ধ হয়ে তারা ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং এগিয়ে আসে নিজের সমাজ, দেশ তথা সবুজ বিশ্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার। এভাবে তরুণরা নিজের গ্রামকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা, গ্রামে পাখি শিকার বন্ধে পোস্টার প্রকাশনা, উপজেলা চত্বরকে পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা করা, বৃক্ষরোপণ করে গ্রামকে সবুজ গ্রাম ঘোষণাসহ নানান পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। নিজের উদ্যোগে বাস্তাবায়িত এসব কর্মসূচি একদিকে যেমন প্রশাসনসহ সমাজের প্রশংসা কুড়িয়েছে ঠিক তেমনি এসব কর্মসূচির সফলতায় অন্য তরুণরাও ‘দায়িত্বশীল তরুণ’ এর তালিকায় যুক্ত হয়। এভাবে দায়িত্বশীলতার মোলাটে আবদ্ধ হয়ে তরুণরা পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি ছাড়াও নানান সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে একটি নির্মল ও সবুজ সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

উপসংহার
বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলের তরুণরা নিজেদের পাঠশালায়, প্রকৃতির পাঠশালায়, অভিজ্ঞজনের পাঠশালায় শিখে জেনে নেয় তাদের দায়িত্ব। এভাবে নিজেদের দায়িত্ব জেনে রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, পবা, নাচোল, নওগাঁর তরুণরা নিজের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে অবদান রাখছে। তরুণদের এই স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে তানোরে গাছের পাঠশালা তৈরি, তানোরের গোকুল মথুরা গ্রামকে সবুজ গ্রাম ঘোষণা, রাজশাহীর স্কুল ও কলেজকে গ্রীণ ক্যাম্পাস ঘোষণা, পবা ও গোদাগাড়ি উপজেলায় বৃক্ষরোপণ, খাল, খাড়ি এবং নদী রক্ষায় প্রচারণা ইত্যাদি একই সাথে তারা সমাজের মানুষগুলোকেও সচেতন করছে এবং সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়নে অবদান রাখছেন।

একটি দেশর উন্নয়নে তরুণরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলের তরুণরা সেটা প্রমাণ করেছে। তাই বলা যায়, সবুজ বরেন্দ্র অঞ্চল তৈরিতে একদিন এই তরুণরাই মূখ্য ভূমিকা রাখবে, নাড়িয়ে দিবে বিশ্বকে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.