সাম্প্রতিক পোস্ট

কার্বন নিসরণ কমাতে অবদান রাখছেন কবুলজান

তানোর, রাজশাজী থেকে অমৃত সরকার
কবুলজান বেগম (৫৫)। বসবাস করেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামে। পড়াশোনা তেমন না করলেও অর্জন করেছেন পরিবেশ রক্ষা করার মতো অমূল্য জ্ঞান। তিনি নিজের জ্ঞ্যান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এমন একটি চুলা আবিষ্কার করেছেন, যা পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখে। ধোয়া উৎপাদন কমিয়ে এর ব্যবহারকারীকে চোখ জ¦ালাপোড়া থেকে রক্ষা করে। তাঁর স্বামী মোঃ মোবারক মিয়া পেশায় একজন কৃষক।


তাঁর আবিষ্কার করা চুলার নাম তিনি দিয়েছেন ‘পরিবেশ বান্ধব চুলা’। এ চুলা তৈরি করতে তেমন টাকা পয়সার প্রয়োজন হয় না। এঁটেল মাটি একটি পাইপ ও ৪টি ইট দিয়ে এ চুলা তৈরি করা যায়। তিনি এ কাজ শুরু করেন ২০১৩ সাল থেকে। এ কাজে তিনি পারদর্শী হয়ে এখন গ্রামে গ্রামে নারীদের চুলা তৈরির কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করেন। চুলা তৈরি সম্পর্কে জানতে চাইলে কবুলজান বেগম বলেন, ‘আমি ২০১৩ সালের দিকে এক আত্মীয়র বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেখানে বন্ধু চুলা বিক্রয় করতে দেখে মনে হয়েছিল এত দাম দিয়ে এ চুলা ক্রয় না করে আমি দেখি এমন চুলা তৈরি করতে পারি কিনা। প্রথমে ভালো না হলেও আস্তে আস্তে চুলা তৈরির কাজটি সমৃদ্ধ করতে পেরেছি। এ চুলার জ¦ালানি খরচ অনেক কম আবার রান্নাও তারাতারি হয় বিধায় ধোয়া কম উঠে। সকল ধরনের জ¦ালানি দিয়েই এ চুলায় রান্না করা যায়।’


চুলা এখন গ্রাম থেকে গ্রামে
কবুলজান বেগম বারসিক’র কাজের সাথে যুক্ত হন ২০১৪ সালে। তাঁর কাজটি পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় এ কাজটি গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তানোর উপজেলার ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে আগ্রহী নারীদের নিয়ে পরিবেশ বান্ধব চুলা তৈরি ও ব্যাবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। তানোর, নাচোল ও পবা, গোদাগাড়ী উপজেলা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের আরবান পর্যায়ে এ পর্যন্ত ২৫৩টি এমন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। নিজ গ্রামের আশে পাশে তিনি বিনামূল্যই চুলা তৈরি করে দিয়ে সহযোতিা করেন। কোন আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গেলেও তিনি চুলা তৈরি করে দিয়ে থাকেন। এখন পর্যন্ত তিনি ১০ হাজারের বেশি পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করেছেন।

তাঁর বাড়িটিও সবুজ
বাড়ির সকল পাশেই শোভা পাচ্ছে দেশীয় ফলের গাছ। একপাশে সুনসুনি, গীমা, সানচি, কলমী, কানসিসা, হেলেঞ্চা, বথুয়া, থানকুনির মতো অচাষকৃত খাদ্য ও ঔষধি উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি করেছেন আচাষ কৃত উদ্ভিদ কর্নার। এর এক পাশে মৌসুমী শাকসবজির বাগান। অপর পাশটিতে তৈরি করেছেন দুধরাজ, কুচ, তুলসি (৩জাতের), ঘৃত কাঞ্চন (৪ প্রকার), পাথরকুচি, গুইয়া বাগুন, গুইয়া রসুন, চন্দন, শতমূল, নীল কন্ঠ, সাদা কন্ঠ, যষ্টিমধু, তালমিছরী, মহাতিতা, সাদা কুচকরির মতো ঔষধি গাছ দিয়ে ঔষধি গাছের কর্নার। যেখানে মানুষসহ গবাদি পশুর ঔষধ পাওয়া যায়।

বীজ ব্যাংক থেকে নিয়মিত বীজ বিনিময়
কবুলজান বেগম যেমন নানা জাতের বীজ সংগ্রহ করে আনন্দ পান তেমনই আনন্দ পান তা বিনিময় করতে। প্রায় প্রতিদিনই তাঁর বাড়ি থেকে কেউ না কেউ নানা জাতের বীজ নিয়ে জান। তাঁর কাছে মোট ১০৮ ধরনের শাকসবজি, ঔষধি, রবিশস্য ও ধানের বীজ সংগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ বিনামূল্য বীজ নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতে বপন ও রোপণ করেন। সকলের স্বার্থে এবং সকলকে বীজ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে আমি আমার গ্রামের নারীদের উৎসাহিত করেছি। এখন তাঁরাও একে অপরের সাথে বীজ বীনিময় করেন।’ তিনি গ্রামের অন্য নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘হরিদেবপুর নারী সংগঠন’। এ সংগঠনের সভাপতি বানী রানী সূত্রধর তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামের অনেক উন্নয়ন করেছি এ সংগঠনের মাধ্যমে। আগে সবাই অল্প পরিসরে সবজি চাষ করলেও এখন সবাই অনেক বেশি সজি চাষ করে। আমরা নিজেদের মধ্য সবজি ও সবজির বীজ নিনিময় করি। বেশিটুকু এনে কবুলজান বেগমের বীজ ব্যাংকে দিয়ে যাই যেন অন্যকে দিতে পারেন।’
চুলা তৈরি করে দেওয়ার পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ‘প্রতি ইঞ্চি মাটি গড়ব সোনার ঘাটি’ মোতাবেক নিজ গ্রাম এবং পাশের গ্রামগুলোর নারীদের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন। এ বিষয়ে পাশের দেউল গ্রামের মোছাঃ সাহানা বেগম বলেন, ‘আমার বাড়িতে আগে কোন সবজি চাষ করতাম না জায়গা ছিল না বলে। কিন্তু কবুলজানের কথায় শুরু করে এখন ১০ শতাংশ জমি লীজ নিয়ে সবজি চাষ করছি পাশাপাশি বিক্রয়ও করতে পারি।’

করোনা বাধা হতে পারেনি
গোটা বিশ^ যখন করেনা মহামারীতে অস্থির। সবাই লকউাউনে বন্দঅ তখন এর মাঝেও কবুলজান বেগম থেমে না থেকে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। সবাইকে করোনা মহামারী মোকাবেলা করার জন্য বেশি বেশি সবজি উৎপাদন করতে উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন বীজ দিয়েও। তিনি করোনা মহামারী চলাকালীন সময়ে নিজ গ্রামের ৫৬০ জন এবং পাশের অন্য গ্রামের ৪৫০ জন নারী পুরুষকে ২৬ জাতের সবজির বীজ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।


তার এ গুণের কথা বিবেচনা করে ২০১৬ সালে তানোর উপজেলা পর্যায় থেকে জয়িতার সন্মাননায় ভূষিত করা হয় তাঁকে। তিনি একজন নারী হিসেবে তাঁর কাজের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় যে অবদান রেখে চলেছেন তা গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর প্রতিটি কাজই কম কার্বন নিসরণ করে এবং অন্যদেরকেও উৎসাহ প্রদান করে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: